জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সামরিক বর্বরতা শুরুর জন্য কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল ২৫ মার্চ

স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চ রাত ‘কালরাত্রি’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় জীবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিয়েছিল ১৯৭১ সালের এই রাত। এর আগ অবধি স্বাধীনতা কিভাবে অর্জিত হবে তা নিয়ে জাতীয় জীবনে ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। বিষয়টি উঠে এসেছে কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের স্মৃতিচারণামূলক ‘কালরাত্রির খণ্ডচিত্র’ বইতে। ২৫ মার্চের দিনের বেলার বর্ণনায় তিনি লিখছেন—‘সারাদিন শহরময় নানা জল্পনা-কল্পনা। ভবিষ্যৎ গোটা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে?’

সারাদিনের সেই জল্পনা-কল্পনার অবসান হয়েছিল ২৫-২৬ মার্চ রাতে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক-রাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠীর আঁকা ছকে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পূর্ব পাকিস্তানে নেমে এসেছিল অভূতপূর্ব সামরিক বর্বরতা। সেই সামরিক বর্বরতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রত্যয় জাতি সেদিন বরণ করে নিয়েছিল, যা নির্ধারণ করেছিল জাতির ভবিষ্যৎ।

সশস্ত্র সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রেরণা

ভবিষ্যৎ গোটা দেশকে নিয়ে গিয়েছিল এক মহান সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে যার ফলে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। শওকত ওসমানের ভাষায়—‘তাই স্বাধীনতার সংগ্রামে অত প্রচণ্ড প্রবল জোয়ারের প্লাবন জেগেছিল। চরম আত্মত্যাগ, সুখ-সম্পদ বিসর্জনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ তাই ত লক্ষ-কোটি মানুষ কাতার বেঁধেছিল শতাব্দীর জঞ্জাল, সামাজিক আবর্জনা চিরতরে দূরে নিক্ষেপ করার জন্য।’

স্বাধীনতার পর থেকে তাই প্রতি বছর ২৫ মার্চ জাতি স্মরণ করে সেই কালরাত্রিকে। এই স্মরণের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের নানা জল্পনা-কল্পনার উত্তর অনুসন্ধান করা হয়। এভাবে করা হবে আরও বহুকাল। কেন না সেসব জল্পনা-কল্পনার উত্তর অনুসন্ধান জন্ম দেয় আরও অনেক প্রশ্নের। খুব সম্ভবত এখনও উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি এমনি একটি প্রশ্ন হলো—কেন সেই অভূতপূর্ব সামরিক বর্বরতার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল ২৫ মার্চের রাতটিকে?

২৫ মার্চ নির্বাচনের পেছনে প্রচলিত যুক্তি ও সীমাবদ্ধতা

আপাতভাবে এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে—জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত স্বাধীনতাকামী আন্দোলন দমনের জন্য, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব অটুট রাখার জন্য, সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে বিলোপ করার জন্য। কিন্তু এই উত্তরগুলো ব্যাপক-বর্বরোচিত সামরিক হত্যাযজ্ঞের কারণ ব্যাখ্যা করলেও কেন ২৫ মার্চকেই সেই বর্বরতা শুরুর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নটির উত্তর দেয় না।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুরে করাচি থেকে রেডিওতে ঘোষণা দিয়ে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আকস্মিকভাবে স্থগিত করা এক অভাবনীয় রাজনৈতিক সংকট ও জনবিক্ষোভ জন্ম দিয়েছিল। যার দমনেই চালানো হয়েছিল অপারেশন সার্চ লাইট। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসে আলোকপাত করা নানা বর্গে বিভক্ত গবেষণাসমূহ একমত যে, রাজনৈতিক সংকট সমাধানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করার বদলে ভয়াবহ সামরিক হস্তক্ষেপই ১৯৪৭-এর পাকিস্তানের দারুণ সমাপ্তি টেনেছিল।

সামরিক আক্রমণের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

মইদুল হাসান তাঁর ‘মূলধারা ’৭১’-এ ২৫-২৬ মার্চ রাতের সেই ভয়াবহতা সম্বন্ধে বলেছেন—‘রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আক্রমণ ছিল দুর্বল এবং মূলত আত্মঘাতী।’ কেননা ঢাকার রাজারবাগ ও পিলখানায় এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর সেনানিবাসে যথাক্রমে পুলিশ, ইপিআর এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের (ইবিআর) বাঙালি সৈন্যদের ওপর হামলা তাদের ও সাধারণ জনগণের মধ্যে উচ্চতর রাজনৈতিক নেতৃত্বের আহ্বান ও দিকনির্দেশনা ছাড়াই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল।

আহমদ রফিক তাঁর ‘একাত্তরে পাক-বর্বরতার সংবাদভাষ্য’ বইতে দেখিয়েছেন, ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা থেকে ২৫ মার্চ পাকবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ পর্যন্ত তৎকালীন স্থানীয় দৈনিকগুলো তাদের সংবাদ ও সম্পাদকীয় বিচার-বিশ্লেষণে যেমন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেছিল, তেমনি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আহ্বান জারি রেখেছিল সাধারণভাবে শাসকগোষ্ঠীর ওপর, বিশেষভাবে ইয়াহিয়ার কাছে।

শর্মিলা বোস তাঁর ‘ডেড রেকনিং’-এ একই মত দিয়ে লিখেছেন—রাজনৈতিক সমস্যার সামরিক সমাধান কেবল তো ভ্রষ্টনীতিই ছিল না, তা পাকিস্তানের বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল। কেন ২৫ তারিখ রাতকে বেছে নেওয়া হয়েছিল এই বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করে তিনি মত দিয়েছেন, হয়ত ১৫ তারিখে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসা ইয়াহিয়ার ২৫ তারিখে রাজনৈতিক আলোচনা বন্ধ করে আকস্মিক ঢাকা ত্যাগের আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়েছিল ওই বর্বরতা শুরু করার। কিন্তু এই দৃষ্টিকোণ অপারেশন সার্চলাইটের মতো অভিযান পরিচালনার জন্য যে সামরিক ও অন্যান্য পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া ছিল, তা ব্যাখ্যা করতে পারে না।

দীর্ঘমেয়াদী সামরিক প্রস্তুতি ও গণহত্যা

পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজী তাঁর ‘বিট্রায়াল অব ইস্ট পাকিস্তান’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে অপারেশন সার্চ লাইট চালানোর জন্য টিক্কা খানের অধীনে তখন ছিল দেশব্যাপী ছড়ানো চারটি ব্রিগেডের সমন্বয়ে গঠিত ১৪ পদাতিক ডিভিশন, একটি ট্যাংক রেজিমেন্ট, পাঁচটি ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্ট, একটি লাইট এন্টি-এয়ারক্র্যাফট রেজিমেন্ট ও দুইটি মর্টার ব্যাটারি।

টিক্কা খান ৭ মার্চ ঢাকায় এসেছিলেন গভর্নর ও ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল ইয়াকুবকে প্রতিস্থাপিত করতে। ইয়াকুব ১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসানকে প্রতিস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু মাত্র চার দিন পর গভর্নর ও ইস্টার্ন কমান্ডার ইয়াকুব পদত্যাগ করেছিলেন এই বলে যে তিনি তাঁর পাকিস্তানি ভাইদের হত্যা করতে পারবেন না। সুতরাং বোঝা যায় সামরিক বর্বরতার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ২৩ মার্চের প্রতিরোধ দিবস, ৭ মার্চের ভাষণ ও ৮ মার্চ থেকে চলা ব্যাপক অসহযোগ, কিংবা তারও আগে ৪ মার্চ ডাকা অসহযোগ এরও আগে অন্তত ১লা মার্চ জাতীয় অধিবেশন স্থগিত করা থেকেই সামরিক শাসকগোষ্ঠীর ছিল।

২৫ তারিখ ঢাকা ত্যাগের আগে ইয়াহিয়া টিক্কা খানকে বলেছিলেন ‘সর্ট দেম আউট’। এই নির্দেশনাই বাস্তবে গণহত্যায় রূপ নিয়েছিল। হয়তো সংজ্ঞার ভিত্তিতে জেনসাইড অর্থে নয়, কিন্তু মাস মার্ডার অর্থে অবশ্যই।

২৫ মার্চের প্রতীকী তাৎপর্য: সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা

এসকল বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ধারণা করি, ২৫ তারিখ রাতটিকে বেছে নেওয়া ছিল পাকিস্তানে সামরিক শাসন অব্যাহত রাখার একটি প্রতীকী বার্তা—যা তার ক্ষমতা নেওয়ার সময়ে ইয়াহিয়ার প্রতিজ্ঞার সম্পূর্ণ বিপরীত। ইয়াহিয়া প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ। ১৯৬২ সাল থেকে চলে আসা সাংবিধানিক সংকটের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক সংকটের তীব্রতার মুখে আইয়ুব খান ওই দিন সংবিধান বিলুপ্ত করে পদত্যাগ করেন আর ইয়াহিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করে সামরিক শাসন জারি করেন।

তিনি তখন বলেছিলেন যে একটি সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা ছাড়া তাঁর অন্য কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই—যার প্রমাণ আছে ৫ আগস্ট ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক শাসক কর্তৃক প্রকাশিত ‘পূর্ব পাকিস্তান সংকট বিষয়ক শ্বেতপত্র’। সেই লক্ষ্যে তিনি এগিয়েছিলেনও কিছু। ২৮ নভেম্বর ১৯৬৯ তিনি প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য একটি ভোটের নীতি গ্রহণ করেন, ১ জানুয়ারি ১৯৭০ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নির্বাচনী প্রচারণা অনুমোদন করেন, এবং ৩০ মার্চ ১৯৭০ নির্বাচনের জন্য লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) জারি করেন।

রাজনৈতিক অনেক কারণ ছাড়াও ১৯৭০ সালের নভেম্বরের সাইক্লোনের জন্য নির্বাচন পিছিয়ে গিয়ে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন জয়ী হয়ে সমগ্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু একদিকে ভুট্টোসহ পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানের এই আধিপত্য মেনে নিতে রাজি ছিল না, অন্যদিকে সামরিক শাসকগোষ্ঠী পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিক আপত্তির পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। কেননা ইয়াহিয়ার প্রস্তাবিত প্রতিজনের একভোট আসলে অখণ্ড পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার নির্দেশ করেছিল।

কালরাত্রি থেকে স্বাধীনতার উদয়

১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ ছিল এই দুরভিসন্ধির প্রস্তুতিপর্ব যা ১লা মার্চ জাতীয় অধিবেশন স্থগিত হবার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল আর ২৫ মার্চ রাতে শুরু হওয়া গণহত্যার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল্লুর রহমান খান ১৯৭২ সালে প্রকাশিত তার “মার্চ মুভমেন্ট অব বাংলাদেশ: বেঙ্গলি স্ট্রাগল ফর পলিটিক্যাল পাওয়ার” প্রবন্ধে দেখিয়েছেন—জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘটনা যেসকল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জোয়ার এনেছিল তাই রূপ নিয়েছিল চূড়ান্ত স্বাধীনতার আন্দোলনে, যার নিবৃত্তিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক-সামরিক শাসকগোষ্ঠী গণহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল ২৫ মার্চ থেকে।

ইতিহাসের এ পর্যায়ে এসে তাই আমরা ধরে নিতে পারি ২৫ মার্চ ছিল প্রতীকীভাবে বেছে নেয়া—যেদিন সামরিক শাসক ক্ষমতায় এসেছিলেন ১৯৬৯ সালে; প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ভোটাধিকার ভিত্তিক গণতান্ত্রিক-সাংবিধানিক সরকারের, যে লক্ষ্যে কিছু কাজও করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭১-এর মার্চ নাগাদ যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন আসলো তখন পিছিয়ে গিয়ে গণহত্যার মধ্য দিয়ে জানান দিলেন পাকিস্তানে সামরিক শাসনই অব্যাহত থাকবে। আর প্রতীকীভাবে বেছে নিলেন সামরিক শাসন জারির সেই ২৫ মার্চকেই।

সম্পর্কিত