
হাজার হাজার মানুষ। সামনে দুর্গম পাহাড়, পেছনে তাড়া করে আসছে সেনাবাহিনী। ফুরিয়ে আসছে খাবার, কমছে অস্ত্র, বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। সামনে তখন একটাই পথ—লড়াই করে মরো, অথবা অসম্ভব দীর্ঘ এক যাত্রায় বেরিয়ে বাঁচার চেষ্টা করো। চীনের কমিউনিস্টদের সেই পলায়নই পরে ইতিহাসে জায়গা করে নেয় ‘লংমার্চ’ নামে। সামরিক বিচারে এটি ছিল এক বিপর্যস্ত বাহিনীর পশ্চাদপসরণ। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে? সেটিই হয়ে ওঠে চীনা বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক মহাযাত্রা।
লংমার্চ চীনের কমিউনিস্টদের বাঁচিয়েই দিয়েছে। আর ধ্বংসের মুখে থাকা দলটিকে দিয়েছে নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি, তৈরি করেছে নতুন নেতৃত্বের কেন্দ্র। এই যাত্রা পথেই ধীরে ধীরে সামনে উঠে আসেন মাও সেতুং; যার নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত চীনের কমিউনিস্টদের নিয়ে যায় রাষ্ট্রক্ষমতার সোপানে।
কেন লংমার্চ শুরু হয়েছিল
চীনে তখন ক্ষমতার মূল লড়াই ছিল কুওমিনতাং বা জাতীয়তাবাদী সরকার এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে। জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাইশেক কমিউনিস্টদের নির্মূল করতে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান শুরু করেন। প্রথম দিকে কমিউনিস্টরা গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি গড়ে প্রতিরোধ করলেও জাতীয়তাবাদীদের সামরিক চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব চীনের জিয়াংসি অঞ্চলে কমিউনিস্টদের প্রধান ঘাঁটি প্রায় ঘেরাও হয়ে যায়। সরাসরি লড়াই করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সামনে আসে একমাত্র পথ—ঘেরাও ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া। ১৯৩৪ সালের শেষ দিকে কমিউনিস্ট বাহিনী জিয়াংসি ছেড়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমের দিকে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করে। ইতিহাসে এটিই লংমার্চ নামে পরিচিত।

লংমার্চ কোনো সাধারণ সামরিক পশ্চাদপসরণ নয়। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল দুর্গম পাহাড়, নদী, জলাভূমি ও শত্রু-অধ্যুষিত এলাকা পেরিয়ে। পথে ছিল খাদ্যের সংকট, রোগ, ক্লান্তি এবং অবিরাম সামরিক সংঘর্ষ। বহু যোদ্ধা মারা যান। অনেকে পিছিয়ে পড়েন। কমিউনিস্ট বাহিনীর বড় একটি অংশ এই যাত্রায় হারিয়ে যায়। তবু যারা টিকে ছিলেন, তাদের জন্য লংমার্চ হয়ে ওঠে এক ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক বাছাইপর্ব। এই যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি ছিল কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের কেন্দ্র বদলে যাওয়া।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বলছে, চীনা কমিউনিস্টদের এই দীর্ঘযাত্রা ৩৬৮ দিন পর্যন্ত চলেছিল।
মাও যেভাবে সামনে এলেন
লংমার্চের আগে কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নেতৃত্বের মধ্যে মতভেদ ছিল। মাও সেতুং শুরু থেকেই গ্রামাঞ্চলকে বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে দেখছিলেন এবং গেরিলা যুদ্ধের ওপর জোর দিচ্ছিলেন। লংমার্চের মাঝপথে অনুষ্ঠিত ‘জুনি কনফারেন্স’ মাওয়ের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। ওই সম্মেলনে আগের সামরিক কৌশলের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হয় এবং মাওয়ের সামরিক চিন্তাধারা ক্রমে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। তিনি দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যান।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কমিউনিস্টরা শেষ পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিম চীনের শানসি প্রদেশের ইয়ানান অঞ্চলে পৌঁছায়। সেখানেই তারা নতুন ঘাঁটি গড়ে তোলে। এটি ছিল লংমার্চের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য। কমিউনিস্টরা তাদের আগের ঘাঁটি হারালেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তারা ইয়ানানে নতুন করে সংগঠিত হয়। মাওয়ের নেতৃত্বে সেখানে গড়ে ওঠে কমিউনিস্ট পার্টির শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি।
লংমার্চ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল
লংমার্চের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল পরাজয় কখনো কখনো কৌশলগত পুনর্গঠনের সুযোগও তৈরি করতে পারে। কমিউনিস্টরা জিয়াংসি হারিয়েছিল, কিন্তু তারা সংগঠন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক লক্ষ্যকে নতুন জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছিল। এরপর চীনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বদলাতে থাকে। জাপানের আগ্রাসন চীনের জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্ট শক্তিকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কমিউনিস্টরা গ্রামাঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে থাকে।
তারা শুধু অস্ত্রের শক্তিতে নয়, ভূমি সংস্কার, স্থানীয় সংগঠন এবং কৃষকদের সমর্থন পাওয়ার মাধ্যমে নিজেদের সামাজিক ভিত্তি বিস্তৃত করে। অন্যদিকে, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে কুওমিনতাং সরকারের জনপ্রিয়তা দুর্বল হতে থাকে। লংমার্চের পরপরই কমিউনিস্টরা চীনের ক্ষমতা দখল করেনি। এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। লংমার্চ তাদের বেঁচে থাকার সুযোগ দেয়। ইয়ানান দেয় পুনর্গঠনের জায়গা।
মাওয়ের নেতৃত্ব চীনাদের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। এরপর জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, গ্রামাঞ্চলে সংগঠন বিস্তার এবং জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় ক্ষমতা দখলের পরিবেশ। অবশেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কুওমিনতাং ও কমিউনিস্টদের গৃহযুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। কয়েক বছরের লড়াইয়ের পর কমিউনিস্টরা বড় জয় পায়। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। চিয়াং কাইশেক ও কুওমিনতাং সরকার মূল ভূখণ্ড চীন থেকে সরে গিয়ে তাইওয়ানে চলে যায়।
লংমার্চ কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দেয়নি কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। আর সেই দীর্ঘ, মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাপথেই তৈরি হয়েছিল এমন এক নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক শক্তি, যা দেড় দশকের মধ্যে চীনের ক্ষমতার মানচিত্র পুরোপুরি বদলে দেয়।
.png)









