
১৯৩০ সালের মার্চ মাস। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ ও নানা ধরনের প্রতিবাদ আগেও হয়েছে, কিন্তু এবার মহাত্মা গান্ধী এমন একটি বিষয়কে সামনে আনলেন, যা রাজনৈতিক আন্দোলনের অস্ত্র হিসেবে প্রায় অবিশ্বাস্য। অস্ত্রটির নাম ‘লবণ’।
১২ মার্চ সকালে গুজরাটের আহমেদাবাদের সবরমতী আশ্রম থেকে গান্ধী ৭৮ জন নির্বাচিত সত্যাগ্রহীকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটা শুরু করেন। গন্তব্য ছিল আরব সাগরের তীরে ডান্ডি। প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ৬ এপ্রিল সেখানে পৌঁছে সমুদ্রের লবণ তুলে ব্রিটিশ লবণ আইন অমান্য করেন তিনি। এই ঘটনাই ইতিহাসে ‘লবণ মার্চ’, ‘ডান্ডি মার্চ’ বা ‘লবণ সত্যাগ্রহ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
লবণ এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন
লবণ এমন একটি পণ্য, যা ধনী-গরিব সবাই ব্যবহার করে। রান্নাঘরে যার প্রয়োজন প্রতিদিন, তার ওপর কর বসানো হলে সমাজের প্রায় প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে সেই করের আওতায় পড়ে। ঔপনিবেশিক ভারতে ব্রিটিশ সরকার এই লবণের উৎপাদন ও বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮৮২ সালের লবণ আইনের অধীনে ভারতীয়দের নিজেদের মতো করে লবণ সংগ্রহ বা উৎপাদনের ওপর বিধিনিষেধ ছিল। ফলে সমুদ্রের পাশে বসবাস করলেও সাধারণ মানুষ নিজের প্রয়োজনের জন্য সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরি করতে পারত না। তাদের সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে লবণ কিনতে হতো এবং তার সঙ্গে করও দিতে হতো।
গান্ধীর কাছে বিষয়টি শুধু করের প্রশ্ন ছিল না। লবণের মতো একটি প্রাকৃতিক পণ্যের ওপর ঔপনিবেশিক সরকার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাই লবণ আইন ভাঙা মানে ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি অন্যায্য ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। গান্ধী জানতেন, লবণ এমন একটি বিষয়, যার সঙ্গে কৃষক, শ্রমিক, নারী, শহরের মানুষ—প্রায় সবাই যুক্ত হতে পারে।
এর আগে কী ঘটেছিল
লবণ মার্চ হঠাৎ করে শুরু হয়নি। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলা হয়। ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস পালনের মাধ্যমে এই দাবিকে আরও জনসম্মুখে আনা হয়। এরপর ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক আইন অমান্য আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়।

গান্ধী আন্দোলনের জন্য কয়েকটি দাবি সামনে আনেন। এর মধ্যে লবণ কর বাতিল ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। ফেব্রুয়ারি ১৯৩০-এ কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটি আইন অমান্য আন্দোলন শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় এবং গান্ধীকে আন্দোলনের সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
২ মার্চ গান্ধী তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইনকে একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন। সেখানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগগুলো তুলে ধরে জানান, সরকার ব্যবস্থা না বদলালে তিনি লবণ আইন ভাঙবেন। অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারকে আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে কী হতে যাচ্ছে।
২৪ দিনের যাত্রা
গান্ধী চাইলে কোনো উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে সরাসরি লবণ আইন ভাঙতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি সাবরমতী আশ্রম থেকে ডান্ডি পর্যন্ত দীর্ঘ পথ হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ মার্চটি শুধু একটি আইন ভাঙার জন্য নয়, এটি ছিল মানুষকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি উপায়।
১২ মার্চ তিনি ৭৮ জন সত্যাগ্রহীকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। প্রতিদিন তাঁরা প্রায় ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার হাঁটতেন। পথে বিভিন্ন গ্রামে থামতেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতেন। যাত্রাপথে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ক্রমে বাড়তে থাকে। এভাবে গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া ছোট একটি পদযাত্রা ধীরে ধীরে বড় রাজনৈতিক ঘটনার রূপ নেয়।
১২ মার্চ সকালে সাবরমতী আশ্রম থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথম দিন তাঁরা আসলালি পৌঁছান। এরপর বেয়ারেজা, নাভাগাম, নাদিয়াদ, আনন্দসহ গুজরাটের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করেন। পথে বিশ্রামের দিনও ছিল। ৫ এপ্রিল তাঁরা ডান্ডিতে পৌঁছান। এই সময় গান্ধী শুধু লবণ আইন নিয়েই কথা বলেননি। তাঁর বক্তব্যে ছিল স্বরাজ, আত্মনির্ভরতা, ব্রিটিশ পণ্য বর্জন এবং অহিংস আন্দোলনের কথা।
মার্চের শুরুতেই ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারছিল, আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি ছোট মনে হলেও এর গভীরতা অনেক। সরকার গান্ধীর পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত থাকলেও শুরুতেই তাঁকে গ্রেপ্তার না করে তাঁকে হাঁটতে দেওয়া হয়। তবে মার্চ শুরুর আগেই গান্ধীর সহযোগী বল্লভভাই প্যাটেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
আন্দোলন কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল
৫ এপ্রিল ডান্ডিতে পৌঁছে গান্ধী ও তাঁর সঙ্গীরা রাত কাটান। পরদিন ৬ এপ্রিল সকালে সমুদ্রতীরে গিয়ে পানি থেকে লবণ তৈরি করার মাধ্যমে সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণকে অমান্য করেন।
গান্ধী নিজে লবণ তুলে নেওয়ার ঘটনাটি প্রতীকী হলেও এর রাজনৈতিক অর্থ ছিল অন্যরকম। একজন সাধারণ ভারতীয় ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি ছাড়াই নিজের প্রয়োজনের লবণ সংগ্রহ করতে পারে, তা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন।
এখানেই ডান্ডি মার্চ শেষ হলেও লবণ সত্যাগ্রহ শেষ হয়নি। এরপর এখান থেকেই আন্দোলনটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
গান্ধীর লবণ আইন ভাঙার পর ভারতের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ একইভাবে আইন অমান্য করতে শুরু করে। উপকূলীয় এলাকায় মানুষ লবণ তৈরি ও সংগ্রহ করে। অন্য জায়গাতেও লবণ আইন অমান্যের কর্মসূচি নেওয়া হয়। গান্ধী গ্রামে গ্রামে গিয়ে আন্দোলনের পক্ষে জনমত তৈরি করতে থাকেন।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল ধরাসানা লবণ কারখানায় সত্যাগ্রহ। গান্ধীকে ১৯৩০ সালের ৫ মে গ্রেপ্তার করার পর আব্বাস তায়াবজি এবং পরে সরোজিনী নাইডুর নেতৃত্বে সত্যাগ্রহীরা ধরাসানার লবণ কারখানার দিকে অগ্রসর হন। সরোজিনী নাইডুও পরে গ্রেপ্তার হন।
এই পর্যায়ে আন্দোলনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অহিংসা। সত্যাগ্রহীরা আইন অমান্য করলেও প্রতিপক্ষের ওপর হামলা না করার নীতি অনুসরণ করছিলেন। ফলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দমন-পীড়ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে এবং ভারতের স্বাধীনতার দাবিও আন্তর্জাতিকভাবে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
গান্ধী কেন লবণকেই বেছে নিয়েছিলেন
গান্ধীর কৌশলটি ছিল একই সঙ্গে সহজ এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। প্রথমত, লবণ সবার প্রয়োজনীয়। তাই এর ওপর করের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে শুধু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক কর্মসূচি বানিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না।
দ্বিতীয়ত, লবণ আইন অমান্য করা ছিল খুব সহজে বোঝা যায় এমন একটি প্রতিবাদ। একজন মানুষ সমুদ্র থেকে লবণ তুলছে—এই দৃশ্যের রাজনৈতিক অর্থ বোঝাতে বড় কোনো বক্তৃতার প্রয়োজন ছিল না।
তৃতীয়ত, এটি অহিংস আইন অমান্যের জন্য উপযোগী ছিল। আন্দোলনকারীরা অস্ত্র হাতে না নিয়ে বা সরকারি স্থাপনা ধ্বংস না করে এমন একটি আইন অমান্য করছে, যা ছিল অন্যায্য।
চতুর্থত, গান্ধী আন্দোলনটিকে একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে কেন্দ্রীভূত করতে চেয়েছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ ছিল, কিন্তু লবণ সেগুলোকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি সরল মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ভারত সরকারের প্রকাশনা বিভাগও পরে উল্লেখ করেছে, লবণ কর তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হলেও দরিদ্র মানুষের ওপর এর প্রভাব ছিল এবং গান্ধী এটিকে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনার কেন্দ্রীয় বিষয় করেছিলেন।

শুধু লবণের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল না
লবণ মার্চকে শুধু ‘লবণ করবিরোধী আন্দোলন’ হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমে যায়। এই মার্চের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্যের মাধ্যমে গণআন্দোলন গড়ে তোলা। লবণ ছিল সেই আন্দোলনের দরজা খোলার চাবি।
গান্ধীর পরিকল্পনায় লবণ আইন অমান্যের পাশাপাশি বিদেশি কাপড় ও মদের দোকানের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান, কর না দেওয়া এবং সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের মতো আরও কিছু কর্মসূচির কথাও ছিল। তবে সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল সত্য ও অহিংসার নীতি।
ব্রিটিশদের ওপর প্রভাব
লবণ মার্চের ফলে সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের পতন হয়নি। এমনকি লবণ করও সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়নি। কিন্তু আন্দোলনটি ব্রিটিশ সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে।
হাজার হাজার মানুষ আইন অমান্য করে গ্রেপ্তার হন। গান্ধীকেও ৫ মে গ্রেপ্তার করা হয়। গান্ধীকে গ্রেপ্তারের পরও আন্দোলন থেমে যায়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে সত্যাগ্রহ চলতে থাকে।
১৯৩১ সালের ৫ মার্চ গান্ধী ও ভাইসরয় লর্ড আরউইনের মধ্যে ‘গান্ধী-আরউইন চুক্তি’ হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিজেদের জন্য লবণ তৈরি ও বিক্রির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকৃত হয় এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তিসহ আরও কিছু বিষয়ে সমঝোতা হয়।
ইতিহাসে লবণ মার্চের গুরুত্ব কোথায়
লবণ মার্চের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল একটি সাধারণ দৈনন্দিন জিনিসকে স্বাধীনতার আন্দোলনের শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করা। শুরুতে মাত্র ৭৮ জন সত্যাগ্রহী গান্ধীর সঙ্গে হাঁটলেও পথের মানুষের অংশগ্রহণ এবং পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় লবণ সত্যাগ্রহের বিস্তার আন্দোলনটিকে গণআন্দোলনের রূপ দেয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস আইন অমান্যকে একটি কার্যকর গণরাজনৈতিক কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে এটি হয়ে ওঠে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
তথ্যসূত্র: গান্ধী হেরিটেজ পোর্টাল, ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ভারত সরকারের প্রকাশনা বিভাগ এবং নেহরু মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরির নেহরু পোর্টাল
.png)









