হানিফ রাশেদীন

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও ঘুমন্ত সাধারণ বাঙালিদের ওপর যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা বিশ্বের ইতিহাসে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছিল অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। এই গণহত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল অসহযোগ আন্দোলন দমন এবং বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া রোধ করা। তবুও, অপারেশন সার্চলাইটের ফলে সূচনা ঘটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের।
ইতিহাসের বর্বরোচিত সেই গণহত্যার পেছনে পাকিস্তানি শাসক ও সামরিক জান্তা বেশ কিছু ভিত্তিহীন এবং একপাক্ষিক যুক্তি দিয়েছিল। তারা মূলত এই নির্মমতাকে একটি ‘প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা’ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করে। জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান এবং জেনারেল টিক্কা খান ছিলেন এই অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী।
পরে ওই বছরেরই ৫ আগস্ট পাকিস্তান সরকার তাদের কর্মকাণ্ডের সমর্থনে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, যেখানে তারা সমস্ত দায়ভার বাঙালিদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছিল। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই যুক্তিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে একে পরিকল্পিত ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
পাকিস্তান সরকার তাদের শ্বেতপত্রে দাবি করেছিল, মার্চের শুরুতে বাঙালিদের দ্বারা বিহারী বা অবাঙালিদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়েছিল। এই সহিংসতা থামানো এবং অবাঙালিদের জানমাল রক্ষার অজুহাতে তারা গণহত্যার সাফাই হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. নাসির আহমেদ তাঁর ‘অপারেশন সার্চ লাইট অ্যান্ড দ্য ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে লিখেছেন, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রেডিও ও টেলিভিশনে ভাষণ দেন। ওই ভাষণে ইয়াহিয়া বলেন, তিনি সমস্ত সম্ভবপর উপায়ে চেষ্টা করেছেন একটি যুক্তিসংগত সমাধান খুঁজে পেতে। একের পর এক বেআইনি কর্মকাণ্ড তিনি সহ্য করেছেন; কিন্তু সরকার ব্যর্থ হয়েছে, কারণ বাঙালি জনগণ পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে কাজ করছে। তারা পূর্ব পাকিস্তানকে পুরোপুরি আলাদা করতে চায়। তাই তিনি পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব হিসেবে পাকিস্তানের সংহতি, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
পাকিস্তান সরকার দাবি করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সরকারি নথিতে বলা হয়, শিক্ষার্থীরা ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ও জগন্নাথ হলকে অস্ত্রাগারে পরিণত করেছিল। তারা নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাব, বায়তুল মোকাররম এবং নিউ মার্কেটের অস্ত্রের দোকান থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে ক্যাম্পাসে সংরক্ষণ করেছিল। এ ছাড়াও, ক্যাম্পাসে সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরও চালু করেছিল শিক্ষার্থীরা।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সারা দেশে বাঙালি নিধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুজন সিনিয়র কমান্ডারসহ অন্তত তিনজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা পরে এই বিষয়ে লিখেছেন। এদের তৃতীয়জন মেজর সিদ্দিক সালিক অপারেশন সার্চলাইটের প্রস্তুতি পর্বের কথা খুবই বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতেন সালিক। তিনি তাঁর বহুল আলোচিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে ওই দিনের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ঢাকার স্থানীয় কমান্ডার হামলার সময় এগিয়ে আনার অনুমতি চান। কারণ, অন্য পক্ষ অর্থাৎ বাঙালি বিক্ষোভকারীরা প্রতিরোধের জোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং তখন ঘটনাস্থলে সকলেই বারবার তাদের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।
পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলী তাঁর ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ বইতে উল্লেখ করেন, কোনো মারাত্মক দাঙ্গার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে কারফিউ জোরদারে বেসামরিক সরকারকে সহায়তা দিতে যে ধরনের অভিযান চালানো হয়, ‘অপারেশান সার্চলাইট’ সে ধরনের সাধারণ কোনো সামরিক অভিযান ছিল না। এখানে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণই ভিন্ন। বিদ্রোহ দেখা দেওয়ার প্রেক্ষিতে সরকারি কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
পাকিস্তানি জান্তা বুঝতে পারেনি, কোনো জাতিকে হত্যা, ভয় ও বর্বরতার মাধ্যমে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। অপারেশন সার্চলাইট বাঙালি জাতির মনোবল ভাঙতে ব্যর্থ হয়; বরং বাঙালি একে একটি যুদ্ধ হিসেবে মূল্যায়ন করে। ২৫ মার্চের রাতের পর বাঙালির জীবন পুরোপুরি পালটে যায়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, যা নয় মাস ধরে দেশের সর্বত্র চলে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে। অবশেষে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও ঘুমন্ত সাধারণ বাঙালিদের ওপর যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা বিশ্বের ইতিহাসে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছিল অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। এই গণহত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল অসহযোগ আন্দোলন দমন এবং বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া রোধ করা। তবুও, অপারেশন সার্চলাইটের ফলে সূচনা ঘটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের।
ইতিহাসের বর্বরোচিত সেই গণহত্যার পেছনে পাকিস্তানি শাসক ও সামরিক জান্তা বেশ কিছু ভিত্তিহীন এবং একপাক্ষিক যুক্তি দিয়েছিল। তারা মূলত এই নির্মমতাকে একটি ‘প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা’ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করে। জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান এবং জেনারেল টিক্কা খান ছিলেন এই অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী।
পরে ওই বছরেরই ৫ আগস্ট পাকিস্তান সরকার তাদের কর্মকাণ্ডের সমর্থনে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, যেখানে তারা সমস্ত দায়ভার বাঙালিদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছিল। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই যুক্তিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে একে পরিকল্পিত ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
পাকিস্তান সরকার তাদের শ্বেতপত্রে দাবি করেছিল, মার্চের শুরুতে বাঙালিদের দ্বারা বিহারী বা অবাঙালিদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়েছিল। এই সহিংসতা থামানো এবং অবাঙালিদের জানমাল রক্ষার অজুহাতে তারা গণহত্যার সাফাই হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. নাসির আহমেদ তাঁর ‘অপারেশন সার্চ লাইট অ্যান্ড দ্য ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে লিখেছেন, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রেডিও ও টেলিভিশনে ভাষণ দেন। ওই ভাষণে ইয়াহিয়া বলেন, তিনি সমস্ত সম্ভবপর উপায়ে চেষ্টা করেছেন একটি যুক্তিসংগত সমাধান খুঁজে পেতে। একের পর এক বেআইনি কর্মকাণ্ড তিনি সহ্য করেছেন; কিন্তু সরকার ব্যর্থ হয়েছে, কারণ বাঙালি জনগণ পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে কাজ করছে। তারা পূর্ব পাকিস্তানকে পুরোপুরি আলাদা করতে চায়। তাই তিনি পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব হিসেবে পাকিস্তানের সংহতি, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
পাকিস্তান সরকার দাবি করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সরকারি নথিতে বলা হয়, শিক্ষার্থীরা ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ও জগন্নাথ হলকে অস্ত্রাগারে পরিণত করেছিল। তারা নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাব, বায়তুল মোকাররম এবং নিউ মার্কেটের অস্ত্রের দোকান থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে ক্যাম্পাসে সংরক্ষণ করেছিল। এ ছাড়াও, ক্যাম্পাসে সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরও চালু করেছিল শিক্ষার্থীরা।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সারা দেশে বাঙালি নিধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুজন সিনিয়র কমান্ডারসহ অন্তত তিনজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা পরে এই বিষয়ে লিখেছেন। এদের তৃতীয়জন মেজর সিদ্দিক সালিক অপারেশন সার্চলাইটের প্রস্তুতি পর্বের কথা খুবই বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতেন সালিক। তিনি তাঁর বহুল আলোচিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে ওই দিনের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ঢাকার স্থানীয় কমান্ডার হামলার সময় এগিয়ে আনার অনুমতি চান। কারণ, অন্য পক্ষ অর্থাৎ বাঙালি বিক্ষোভকারীরা প্রতিরোধের জোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং তখন ঘটনাস্থলে সকলেই বারবার তাদের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল।
পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলী তাঁর ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ বইতে উল্লেখ করেন, কোনো মারাত্মক দাঙ্গার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে কারফিউ জোরদারে বেসামরিক সরকারকে সহায়তা দিতে যে ধরনের অভিযান চালানো হয়, ‘অপারেশান সার্চলাইট’ সে ধরনের সাধারণ কোনো সামরিক অভিযান ছিল না। এখানে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণই ভিন্ন। বিদ্রোহ দেখা দেওয়ার প্রেক্ষিতে সরকারি কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
পাকিস্তানি জান্তা বুঝতে পারেনি, কোনো জাতিকে হত্যা, ভয় ও বর্বরতার মাধ্যমে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। অপারেশন সার্চলাইট বাঙালি জাতির মনোবল ভাঙতে ব্যর্থ হয়; বরং বাঙালি একে একটি যুদ্ধ হিসেবে মূল্যায়ন করে। ২৫ মার্চের রাতের পর বাঙালির জীবন পুরোপুরি পালটে যায়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, যা নয় মাস ধরে দেশের সর্বত্র চলে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে। অবশেষে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
.png)

প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ঢাকা নগরীও এমন অসংখ্য পরিবর্তনের সাক্ষী। একসময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবাব কিংবা সমাজের উচ্চবিত্তরা ঢাকায় আসেন। তাঁদের সঙ্গে আসেন নানা ধরনের কারিগর, শিল্পী ও পেশাজীবীরাও। ফলে কলকাতা ও উত্তর ভারতের অনেক পেশা একসময় ঢাকায় প্রচলিত ছিল। সময়ের আবর্তে সেই পেশাগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে
০৯ আগস্ট ২০২৬
‘যুদ্ধ’ শব্দটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেক দিনের। টিভি খুললেই যুদ্ধের খবর, ফেসবুকে ঢুকলেই ধ্বংসস্তূপ, আগুন আর মানুষের কান্নার ছবি। এত বেশি দেখতে দেখতে আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিউজফিড স্ক্রল করতে এখন আর আঙুল থেমে যায় না।
০৬ আগস্ট ২০২৬
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান নিয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু গবেষণা হয়েছে। আজকের লেখায় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তিনটি গবেষণা নিয়ে আলোচনা করব। গবেষণাগুলোতে এই গণঅভ্যুত্থানকে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষকরা বিশ্লেষণ করেছেন।
০৫ আগস্ট ২০২৬
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয় মঈদুল হাসানের বই ‘মূলধারা ৭১’। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এর দ্বিতীয় সংস্করণের সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও বইটির গুরুত্ব কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
২৯ জুলাই ২০২৬