উৎসবপ্রিয় বাঙালির উঠোনে আবার এসেছে চৈত্রসংক্রান্তি। বাংলা ক্যালেন্ডারের শেষ দিনে পালন করা হয় এই উৎসব। আবহমানকাল ধরেই চলে আসছে এই রীতি।
বছরের শেষ দিন হিসেবে পুরোনোকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-উৎসবের আয়োজন। এই উৎসব একসময় ছিল গ্রামীণ জীবনের গভীরে প্রোথিত এক অনাড়ম্বর কিন্তু প্রাণবন্ত উৎসব। সময়ের পরিবর্তনে এর রূপ বদলেছে, বদলেছে উদযাপনের ধরনও। তবুও ঐতিহ্যের শিকড় এখনো মাটির ভেতর কোথাও না কোথাও জীবন্ত আছে। গ্রাম থেকে শহর, আর এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম— সবখানেই চৈত্রসংক্রান্তি নতুন অর্থে ফিরে এসেছে।
কেমন ছিল গ্রামবাংলার চৈত্রসংক্রান্তি
গ্রামবাংলায় চৈত্রসংক্রান্তি মানেই ছিল উৎসবের এক স্বতঃস্ফূর্ত রূপ। মানবাধিকারকর্মী ও লেখক ফরিদা আখতার তাঁর ‘চৈত্র সংক্রান্তি কৃষির ভুল সংশোধনের দিন’ নামের এক নিবন্ধে বলেছেন, বছরের শেষ দিনে কৃষিজীবী মানুষ তাদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করতেন, পুরোনো জঞ্জাল সরিয়ে নতুন বছরের জন্য প্রস্তুতি নিতেন। ঘরে ঘরে তৈরি হতো পিঠা-পুলি, বিশেষ করে পাটিসাপটা, চিড়া, মুড়ি, নাড়ু, তিল, নারিকেল কিংবা মুড়ি-মুড়কি। এছাড়াও গমের ছাতু, দই ও পাকা বেল সহযোগে এক বিশেষ শরবত তৈরি করা হতো। এই শরবতেই প্রাণ জুড়িয়ে নিত সংক্রান্তির উৎসবে যোগ দেওয়া সবাই। কেবল তাই নয়, সংক্রান্তির দিন গ্রামের হাটে কোনো কোনো দোকানে বিক্রেতারা ক্রেতাদের এই শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করতেন।
প্রাবন্ধিক চিররঞ্চন সরকার তাঁর এক লেখায় বলেছেন, এই দিনে গ্রাম-বাংলার নারীরা ঝোপ-জঙ্গল থেকে ১৪ রকমের শাক তুলে আনতেন। সেই শাক একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া হতো। এখনও পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের অনেক স্থানে এভাবে শাক তুলে এনে খাওয়ার রীতি রয়েছে। প্রথাটি ‘শাকান্ন উৎসব’ নামে পরিচিত। কোথাও কোথাও চৈত্র সংক্রান্তির দিনে নিরামিষ ও তিতা খাওয়ার প্রথাও রয়েছে।
শিশু-কিশোরদের জন্য থাকত গ্রামীণ মেলা যেখানে নাগরদোলা, বাঁশের খেলনা, মাটির হাঁড়ি-পাতিল আর নানা রকম মিষ্টির দোকান মিলিয়ে তৈরি হতো এক অনন্য পরিবেশ।
চৈত্রসংক্রান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘চড়ক পূজা’ বা ‘গাজন’। গ্রামবাংলার বহু অঞ্চলে এখনো এই আয়োজন দেখা যায়। সন্ন্যাসীরা কঠোর ব্রত পালন করে শারীরিক কষ্ট সহ্য করতেন, যা ছিল ভক্তি ও আত্মত্যাগের প্রতীক। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আচার অনেক জায়গায় কমে এসেছে, কোথাও কোথাও একেবারেই বিলুপ্ত।
শহুরে চৈত্রসংক্রান্তি
অন্যদিকে শহরের চৈত্রসংক্রান্তি ছিল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। এখানে ঐতিহ্য থাকলেও তা ছিল কিছুটা সীমিত ও প্রাতিষ্ঠানিক। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করে গানের অনুষ্ঠান, নাটক, কিংবা চারুকলার প্রদর্শনী। শহরের মানুষজন নতুন পোশাক পরে ঘুরতে বের হন, রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া, ছবি তোলা, আর সামাজিক আড্ডায় মেতে ওঠেন।
কবি ও প্রাবন্ধিক এসডি সুব্রত তাঁর এক লেখায় বলেছেন, আগের দিনে পুরান ঢাকায় চৈত্রসংক্রান্তির দিন ঘুড়ি উৎসব ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বাড়ির ছাদে ছাদে মানুষ জড়ো হতো। আকাশ ভরে যেত রঙিন ঘুড়িতে।
এমনকি চড়ক পূজা, গাজন, শিবসংক্রান্তির মতো আচার শহরেও কিছুটা পালন হতো। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা হালখাতা করতেন। এগুলো মূলত গ্রাম থেকেই শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ক্রমে এসব উৎসব এখন শহর থেকে বিলুপ্তির পথে। সেখানে গেড়ে বসেছে করপোরেট ইভেন্ট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, নাচ ও মেলা।
হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য
আগে চৈত্রসংক্রান্তিতে ‘হালখাতা’ খোলার প্রস্তুতি শুরু হতো। ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব মিটিয়ে নতুন খাতা খুলতেন। গ্রামে গ্রামে দলবেঁধে গান গাওয়ার প্রচলন ছিল, যেমন গাজনের গান বা চড়কের গান। এখন এসব রীতি অনেকটাই স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেকেই এসবকে পুরোনো বা অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন।
তবে সবকিছু হারিয়ে যায়নি। এখনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় উদ্যোগে মেলা বসে, লোকজ সংস্কৃতি চর্চা হয়। কিছু সংগঠন এবং তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে কাজ করছে। বিশেষ করে লোকসংগীত, গ্রামীণ খেলাধুলা ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে পুরোনো দিনের ছোঁয়া ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
ডিজিটাল যুগে চৈত্রসংক্রান্তি
ডিজিটাল যুগে চৈত্রসংক্রান্তির উদযাপন পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এই উৎসবের প্রচার-প্রচারণা ব্যাপক। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা ইনস্টাগ্রামে চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে লাইভ অনুষ্ঠান, ভিডিও কনটেন্ট, এবং ফটোশেয়ারিং এখন খুবই সাধারণ বিষয়। মানুষ ঘরে বসেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারছেন।
এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো হয়। ই-কমার্স সাইটগুলোতে ‘নববর্ষ অফার’ শুরু হয় এই সময় থেকেই। অনেকেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
ডিজিটাল উদযাপনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংস্কৃতির সংরক্ষণ। আগে যে লোকজ গান বা অনুষ্ঠান কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে নতুন প্রজন্ম সহজেই নিজেদের শেকড় সম্পর্কে জানতে পারছে।
তবে এই পরিবর্তনের মধ্যেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। উৎসবের আসল প্রাণ কি বজায় থাকছে? অনেকেই মনে করেন, ডিজিটাল মাধ্যমে উদযাপন যতই সহজ হোক না কেন, তা কখনোই গ্রামবাংলার সেই প্রাণবন্ত পরিবেশের বিকল্প হতে পারে না। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনই স্বাভাবিক, এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হলে এই ডিজিটাল রূপান্তর জরুরি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চৈত্রসংক্রান্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ের ওপর। যদি গ্রামীণ রীতিনীতি সংরক্ষণ করে তা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে এই উৎসব আরও সমৃদ্ধ হবে।
সব মিলিয়ে, চৈত্রসংক্রান্তি এখন আর কেবল একটি গ্রামীণ উৎসব নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। গ্রাম, শহর এবং ডিজিটাল জগৎ সবখানেই এর আলাদা আলাদা রূপ দেখা যায়। হারিয়ে যাওয়া রীতির আক্ষেপ থাকলেও, নতুনভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনাও কম নয়।
বছরের শেষ দিনে তাই একদিকে থাকে অতীতের স্মৃতি, অন্যদিকে নতুন শুরুর প্রত্যাশা। আর এই দুইয়ের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে চৈত্রসংক্রান্তি আজও বাঙালির জীবনে এক বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।