‘চাঁদের গাড়ি চড়ে, সে এসেছে সবার ঘরে।’ এক ফালি চাঁদ ওঠার মধ্য দিয়ে আবারও ফিরে এসেছে পবিত্র মাহে রমজান। রমজান মাস ত্যাগ আর ইবাদতের ডাক নিয়ে আসে। রমজান আসে আত্মসংযম ও আত্মত্যাগের চিরন্তন আহ্বান নিয়ে। ধর্মপ্রাণ মানুষ এই ক্ষণটির জন্য ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করেন।
রমজান যখন আসে, তখন পৃথিবীর রূপ কিছুটা বদলে যায়। জীবনের নিত্যদিনের ছন্দে একটা পরিবর্তন আসে। পরিচিত পথগুলো নতুন অর্থ খুঁজে পায়। যাঁরা রোজা রাখেন, তাঁদের হৃদয়ে আবেগের এক প্রবল স্রোত বয়ে যায়। অবশ্য এই পরিবর্তন সবাই অনুভব করেন না, কেবল কেউ কেউ করেন।
বাহ্যিক পরিবর্তনগুলো খুব স্পষ্ট। কিন্তু রমজান আরও গভীর পরিবর্তনের ডাক দিয়ে আমাদের জীবনে গুণগত পরিবর্তনের আহ্বান জানায়, আত্মার পরিশুদ্ধির কথা বলে। রমজান আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করে ও চিন্তাকে স্বচ্ছ করে তোলে। মানুষের আত্মাকে যে ছয়টি রিপু গ্রাস করে রাখে, তা থেকে মুক্তির বার্তা দেয় এই মাস।
কিন্তু আমরা আসলে এই আহ্বানে কতটা সাড়া দিই? আমাদের কতজন এই শিক্ষার প্রতি সত্যিকারের মনোযোগ দিই? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর হলো—‘না’। অনেকের কাছে রমজান কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। দুঃখজনকভাবে রোজা এখন কেবল নিছক রিচুয়াল বা প্রথা হয়ে গেছে, আত্মিক পরিচর্যার সময় নয়।
রমজানে শারীরিক চাহিদা বা প্রবৃত্তি-কেন্দ্রিক অপরাধগুলো কিছুটা কমে আসে। খুন, ধর্ষণ বা চুরির মতো ঘটনাগুলো কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু সূক্ষ্ম বা কম দৃশ্যমান অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে এই সংযম দেখা যায় না। পরচর্চা, অপবাদ, মিথ্যাচার বা বিশ্বাস ভঙ্গের মতো কাজগুলো ঠিকই চলতে থাকে। বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি, যেমন পণ্য মজুত করা, জালিয়াতি, পাইরেসি, অবৈধভাবে সম্পদ জমা করা বা অতি মুনাফা লোটার প্রবণতা প্রবলভাবেই থেকে যায়। যদিও দান-খয়রাত বা ফিতরা দেওয়ার মতো কাজগুলো পরিবর্তনের আশার আলো দেখায়, কিন্তু মাস শেষ হলেই এই ভালো অভ্যাসগুলো মিলিয়ে যেতে থাকে।
রমজান বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভালো আচরণের সেই ঢেউও স্তিমিত হয়ে পড়ে। সাময়িক ভালো উদ্দেশ্য আর পবিত্রতার যে অনুভূতি জেগেছিল, তা আবার আমাদের নিচু প্রবৃত্তিগুলোর দখলে চলে যায়। মাস শেষ হতেই আমরা টের পাই আমাদের সহজাত স্বভাব আবার ফিরে আসছে। অনেকটা ডা. জেকিল আর মিস্টার হাইডের দ্বৈত সত্তার মতো। আমাদের স্বার্থপর প্রবণতা আর নিজের লাভ খোঁজার আচরণ আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমরা আবার সেই ম্যাকিয়াভেলিয়ান কৌশলের ছকে ফিরে যাই।
রমজানের প্রকৃত সাফল্য আমাদের খারাপ দিকগুলোকে সাময়িকভাবে আটকে রাখার মধ্যে। যদিও সেগুলোকে পুরোপুরি বিনাশ করতে পারে না। বছরের বাকি এগারো মাস এই সংযম অকল্পনীয়। সেই অর্থে, রমজানই একমাত্র দূত যে প্রতি বছর আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। আমাদের চেতনার ঘুমন্ত অংশকে জাগিয়ে তোলে।
আমাদের সমাজে পচন ও দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। রমজান সেখানে সংস্কারের সুযোগ নিয়ে আসে। আমাদের লাগামহীন বস্তুবাদের পেছনে ছোটার মাঝে রমজান যদি কেবল এক মুহূর্তের বিরতিও হয়, তবুও তা এক ধরনের অগ্রগতি। এই সময়ে অনেকে মন খুলে দান করেন। ধর্মের আত্মিক দিকগুলোর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেন। সম্মিলিত প্রার্থনা আর আত্মোপলব্ধিতে মগ্ন হন। রমজানে অনেক মুসলমান এক ধরনের জাগরণ অনুভব করেন। তাঁরা নিজেদের মনে করিয়ে দেন যে কেবল টিকে থাকা আর ভোগ করার বাইরেও জীবনের কিছু মূল্যবোধ আছে।
কিন্তু রমজানের একটি বৈশ্বিক দিকও রয়েছে যা প্রায়ই অলক্ষ্যে থেকে যায়। ব্যক্তিগত আর সামাজিক পরিবর্তনের বাইরেও রমজান বিশ্বজুড়ে এক সামষ্টিক সংস্কারের শক্তিশালী সুযোগ এনে দেয়। আমরা যদি আজকের পৃথিবীর দিকে তাকাই, দারিদ্র্য, পরিবেশের বিপর্যয়, সামাজিক অবিচার থেকে শুরু করে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বাড়তে থাকা বৈষম্য—সবই আমাদের চোখের সামনে। রমজান তার মূল সত্তায় মানুষকে আত্মসংযম শেখায় এবং বৃহত্তর সমাজের কথা ভাবতে বলে।
দান-সদকার চেতনা রমজানের প্রাণ। এর বৈশ্বিক গুরুত্বকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। রমজানে যখন বিশ্বজুড়ে লাখো কোটি মুসলমান অন্যের কল্যাণে হাত বাড়িয়ে দেন, তখন তা বিশাল মানবিক সহায়তায় পরিণত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংঘাতের মতো সংকটের সময় রমজান হয়ে ওঠে নজিরবিহীন ত্রাণ তৎপরতার উপলক্ষ। মসজিদ, দাতব্য সংস্থা আর সামাজিক সংগঠনগুলোর বিশাল নেটওয়ার্ক একযোগে কাজ করে।
সিরিয়া, ইয়েমেন আর ফিলিস্তিনের মতো দেশগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর যুদ্ধ মানুষকে অমানবিক কষ্টের মধ্যে ফেলেছে। সেখানে রমজান একাধারে আত্মিক ও পার্থিব শুশ্রূষা হিসেবে আসে। রোজা রাখাটা তখন সহমর্মিতার স্মারক হয়ে ওঠে। যাকাত (বাধ্যতামূলক দান) আর সদকার (ঐচ্ছিক দান) মাধ্যমে মুসলমানরা তাদের সম্পদ দিয়ে সীমান্ত-পারের মানুষের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করেন। রমজানের কেন্দ্রে থাকা করুণা আর দয়ার বার্তা জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে যায়। রমজান বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়কে সংহতির বন্ধনে আবদ্ধ হতে আহ্বান জানায়।
রমজান বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা আর জাতির মুসলমানদের এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। সন্ধ্যায় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার করা হোক বা মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া হোক—রমজানে সর্বজনীন সম্প্রদায়ের অনুভূতি জেগে ওঠে। এই ঐক্য কেবল ব্যক্তি বা স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। নিজের চেয়েও বড় কিছুর অংশ হওয়ার এক বোধ তৈরি করে।
তবে রমজানের বৈশ্বিক দিক কেবল দান আর সংহতির মধ্যেই আটকে নেই, বরং ন্যায়বিচার, শান্তি আর টেকসই উন্নয়নের মতো বৃহত্তর বিষয়গুলো নিয়ে ভাবারও সুযোগ দেয়। রোজার চর্চা—খাবার, পানীয় আর নেতিবাচক আবেগ থেকে বিরত থাকা—আমাদের ভারসাম্য আর পরিমিতিবোধের গুরুত্ব শেখায়। অতিরিক্ত ভোগ আর অপচয়ের এই পৃথিবীতে রমজান আমাদের একটু থামতে বলে। রমজান ব্যক্তি আর সমাজকে সম্পদ, ঐশ্বর্য আর পরিবেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নতুন করে ভাবতে শেখায়।
রমজানে ভোগের ধরন প্রায়ই প্রাচুর্য আর অভাবের মধ্যকার বৈষম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অপচয়ের নৈতিক সংকটকেও সামনে আনে। রোজা কেবল আত্মিক প্রশান্তিই দেয় না, খাদ্য উৎপাদন, বণ্টন আর ভোগের মূল্য নিয়ে ভাবারও সুযোগ করে দেয়।
রমজান শেষ হয়ে গেলেও এর শিক্ষা পেছনে ফেলে আসা উচিত নয়। আত্মিক উন্নতি আর সামাজিক ন্যায়বিচারের যে ডাক এই মাস দেয়, তা রোজা শেষ হওয়ার পরেও প্রতিধ্বনিত হওয়া উচিত। রমজান আমাদের নিজেদের প্রয়োজনের বাইরে তাকাতে এবং বিশ্ব সমাজে আমাদের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে শেখায়। দান, পরিবেশ সচেতনতা বা শান্তির জন্য প্রচেষ্টা—যাই হোক না কেন, রমজানের সেই ক্ষমতা আছে যা ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারে।
রমজান যদিও একান্তই ব্যক্তিগত আর আত্মিক যাত্রা, কিন্তু এর প্রভাব ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই মাস করুণা, ঐক্য আর ন্যায়বিচারের পৃথিবীর আভাস দেয়। রমজানের ডাক হলো পরিবর্তনের এবং আত্মসংযম আর উদারতার এই চেতনাকে সারা বছর ধরে লালন করার।
- আফতাব উদ্দিন সিদ্দিকী রাগিব: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট