জঙ্গল সলিমপুর যেভাবে রাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৬, ১২: ৩৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘ তিন দশক ধরে বাংলাদেশের বুকে সমান্তরাল ও স্বৈরতান্ত্রিক অপরাধ সাম্রাজ্যের জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ভৌগোলিক দুর্গমতা, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে ঢাল বানিয়ে ‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজ কল্যাণ সমিতি’র আড়ালে এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল নিজস্ব প্রশাসন, বাহিনী, কর কাঠামো ও বিচার ব্যবস্থা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মশিউর রহমানের পতন, রোকন ও ইয়াসিন বাহিনীর সশস্ত্র উত্থান এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ধৃষ্টতা এই অঞ্চলকে সাধারণ অপরাধের গণ্ডি থেকে জাতীয় নিরাপত্তার এক বড় সংকটে রূপ দিয়েছে।

প্রকৃতির বুকে মাইলের পর মাইল পাহাড় কেটে যে পরিবেশ বিপর্যয়, অবৈধ ইউটিলিটি সিন্ডিকেট এবং অস্ত্র-মাদকের অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছিল, তা আজ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। এই বাস্তবতায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নাইট সাফারি পার্ক, আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম ও কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের যে মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান সরকার হাতে নিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে একটি চূড়ান্ত সামরিক বা আধা-সামরিক ক্র্যাকডাউনের মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র’ ধারণাকে চিরতরে উপড়ে ফেলা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ ধারণার ভিত্তি

একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরে মূলধারার আইনি শাসন ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে যখন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হয়, তখন তাকে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ বলা হয়। জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূল সমিতির আড়ালে গড়ে ওঠা সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী, সাধারণ মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া নিজস্ব টোল বা কর ব্যবস্থা এবং আদালতের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে ঠিক এই সমান্তরাল স্বৈরতান্ত্রিক শাসনই কায়েম করা হয়েছিল। মূলত ভৌগোলিক দুর্গমতাকে পুঁজি করে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে সেখানে একটি স্বাধীন ও অনিয়ন্ত্রিত অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করাই ছিল এই ধারণার মূল ভিত্তি।

সমান্তরাল প্রশাসন ও নিজস্ব বাহিনী

জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রীয় আইন ও প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজ কল্যাণ সমিতির আড়ালে একটি শক্তিশালী সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এই সমিতির মূল হোতা মশিউর রহমানের নির্দেশে পরিচালিত হতো নিজস্ব একটি সশস্ত্র ক্যাডার ও পাহারাদার বাহিনী, যারা পুরো এলাকার নিরাপত্তা, পাহারাদারি এবং অভ্যন্তরীণ বিচারিক কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত।

দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডে সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশাধিকার একপ্রকার নিষিদ্ধ করে এই বাহিনী সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম রাখে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সশস্ত্র ক্যাডাররা মূলত বহিরাগত অপরাধীদের আশ্রয় দিতে এবং অবৈধভাবে পাহাড় কেটে প্লট দখলের প্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্ন করতে রাষ্ট্রের ভেতরে এই সমান্তরাল বাহিনী গড়ে তুলেছিল।

আলাদা টোল ও কর ব্যবস্থা

জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে মশিউর রহমান এবং তার সহযোগীদের নেতৃত্বে একটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও সমান্তরাল কর কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে কোনো নতুন ঘর তুলতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করতে, এমনকি সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও চলাচলের জন্যও সমিতির নির্ধারিত মোটা অঙ্কের চাঁদা বা ‘টোল’ দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন এবং জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই টোল বাণিজ্যের মাধ্যমে সাধারণ ছিন্নমূল মানুষকে জিম্মি করে অপরাধী সিন্ডিকেটটি প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিত, যা তাদের সমান্তরাল অপরাধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার মূল আর্থিক উৎস হিসেবে কাজ করত।

নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা

জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রীয় বিচারিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ছিন্নমূল সমাজ কল্যাণ সমিতির কার্যালয়কে সমান্তরাল আদালত হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সেখানে স্থানীয় যেকোনো ছোট-বড় বিরোধের মীমাংসা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সমিতির নেতারা নিজস্ব নিয়মে করত এবং তাদের দেওয়া অমানবিক শারীরিক ও আর্থিক শাস্তি সবাইকে বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হতো। এই নিজস্ব বিচার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সাধারণ মানুষকে একচ্ছত্র ভয়ে ও নিয়ন্ত্রণে রাখা, যাতে কেউ সরকারের মূলধারার প্রশাসন বা আদালতের কাছে যাওয়ার সাহস না পায়।

ভূ-রাজনীতি ও ক্ষমতার বিভাজন: রোকন বনাম ইয়াসিন বাহিনী

টানা অভিযানের মুখে মূল গডফাদার মশিউর রহমানের পতনের পর জঙ্গল সলিমপুরের বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্যে যে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তা পুঁজি করে এলাকাটি ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে দুটি প্রধান সশস্ত্র গ্রুপ এবং এলাকায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। পুরোনো অপরাধ চক্রের উত্তরসূরি হিসেবে রোকন বাহিনী মূল ছিন্নমূল বসতির পাহাড় কাটা ও প্লট বাণিজ্য এবং ইয়াসিন বাহিনী আলীনগরের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের মধ্যে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব গড়ে তুলেছে। মূলত প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজেদের আধিপত্য ও কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য টিকিয়ে রাখাই এই দুই বাহিনীর বর্তমান বিভাজনের মূল উদ্দেশ্য।

ছিন্নমূল এলাকা

গডফাদার মশিউর রহমানের গ্রেপ্তারের পর জঙ্গল সলিমপুরের মূল ছিন্নমূল বসতি এবং এর আশেপাশের কৌশলগত এলাকাগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিয়েছে রোকন বাহিনী। দুর্গম পাহাড় কেটে অবৈধ প্লট তৈরি এবং তা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের কাছে চড়া দামে বিক্রি করার কোটি কোটি টাকার সিন্ডিকেটটি এখন মূলত এই বাহিনীর ইশারাতেই পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এরা পাহাড়ের ভেতরে নিজস্ব ক্যাডারদের মাধ্যমে সমান্তরাল নজরদারি ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বজায় রেখেছে।

আলীনগর এলাকা

জঙ্গল সলিমপুরের অত্যন্ত দুর্গম ও গহীন পাহাড়ি অঞ্চল আলীনগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইয়াসিন বাহিনীর একচ্ছত্র ও সশস্ত্র অপরাধ সাম্রাজ্য। প্রশাসনের সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের পর এই বাহিনী পাহাড়ের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে নিজেদের সমান্তরাল আধিপত্য ও অবৈধ প্লট বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতে এবং নিজেদের আস্তানা সুরক্ষিত রাখতে এরা আলীনগর সংলগ্ন প্রবেশপথগুলোতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারা ও শক্তিশালী নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

এই দুই বাহিনী মূলত পুরোনো অপরাধী চক্রের উত্তরসূরি হিসেবে উচ্ছেদ অভিযানের পর ফাঁকা হয়ে যাওয়া জায়গায় পুনরায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

অপরাধের অভয়ারণ্য ও পরিবেশ বিপর্যয়

জঙ্গল সলিমপুরের অনিয়ন্ত্রিত ভৌগোলিক দুর্গমতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধী চক্র একদিকে যেমন প্রকৃতির ওপর তাণ্ডব চালিয়েছে, অন্যদিকে একে রূপ দিয়েছে অপরাধের স্বর্গরাজ্যে। মাইলের পর মাইল সরকারি পাহাড় কেটে সাবাড় করে প্লট বাণিজ্য ও অবৈধ ইউটিলিটির সমান্তরাল সিন্ডিকেট চালুর মাধ্যমে এখানে যেমন মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ও প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে, তেমনি একে দাগী অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও অস্ত্রের বড় ট্রানজিট পয়েন্ট বানানো হয়েছে। মূলত প্রকৃতির বুক চিরে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির বাইরে এক নিরাপদ সন্ত্রাসী ঘাঁটি গড়ে তোলাই ছিল এই অভয়ারণ্যের মূল লক্ষ্য।

পাহাড় কাটা ও প্লট বাণিজ্য

সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে পাহাড় কাটার এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ার কারণে বর্ষাকালে ওই অঞ্চলে নিয়মিতভাবে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। প্রশাসন ও পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, এই মনুষ্যসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে প্রতি বছরই সেখানে মাটি চাপা পড়ে বহু অসহায় মানুষের নির্মম প্রাণহানি ঘটছে।

অবৈধ ইউটিলিটি সিন্ডিকেট

জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের কোনো বৈধ অনুমোদন না থাকলেও অপরাধী চক্রটি পাহাড় কেটে নিজস্ব ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের লাইন টেনে এক বিশাল সমান্তরাল সেবা খাত গড়ে তুলেছিল। সাধারণ বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের এই অবৈধ সংযোগ নিতে বাধ্য করে তারা প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিত। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত অনুযায়ী, এই অবৈধ ইউটিলিটি বাণিজ্য ছিল জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধ সাম্রাজ্য সচল রাখার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।

অস্ত্র ও মাদকের মজুত

জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং সাধারণ প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দাগী অপরাধীরা অপরাধ সংঘটনের পর এখানে এসে অনায়াসে আত্মগোপন করত। ফলে, এই অবরুদ্ধ পাহাড়ি অঞ্চলটি কালক্রমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের নিরাপদ মজুতশালা এবং মাদক চোরাচালানের একটি প্রধান ও কৌশলগত ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়। অপরাধীদের এই শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও অস্ত্রের মজুদের কারণেই এলাকাটি দীর্ঘদিন যাবত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি দুর্ভেদ্য এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে টিকে ছিল।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা: সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত

জঙ্গল সলিমপুরের বর্তমান সংকট এখন আর কেবল সাধারণ ভূমিদস্যুতা বা স্থানীয় অপরাধ চক্রের আধিপত্য বিস্তারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মূলত একটি পুরোদস্তুর সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং উগ্রপন্থী ঘরানার অপরাধী গোষ্ঠীর রূপ ধারণ করেছে। ইতিপূর্বে এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের হাতে এলিট ফোর্স র‍্যাবের একজন সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাটি ছিল রাষ্ট্রের জন্য একটি চূড়ান্ত সীমালঙ্ঘন বা ‘রেড লাইন’। কিন্তু অপরাধীদের ধৃষ্টতা ও বেপরোয়া মনোভাব যে কতটা উগ্র আকার ধারণ করেছে, তা সাম্প্রতিক নজিরবিহীন হামলার ঘটনাটি আরও একবার প্রমাণ করে।

জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রীয় আইন ও প্রশাসনের তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমাজ কল্যাণ সমিতির আড়ালে একটি শক্তিশালী সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এই সমিতির মূল হোতা মশিউর রহমানের নির্দেশে পরিচালিত হতো নিজস্ব একটি সশস্ত্র ক্যাডার ও পাহারাদার বাহিনী, যারা পুরো এলাকার নিরাপত্তা, পাহারাদারি এবং অভ্যন্তরীণ বিচারিক কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত।

আগামী ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব ও পুলিশের একটি স্থায়ী ক্যাম্প উদ্বোধনের কথা ছিল। ওই ক্যাম্পে প্রায় ১৫০ জনের মতো সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও রোকন ও ইয়াসিন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের ওপর অতর্কিত ও মরণঘাতী হামলা চালায়। শুধু পুলিশ সদস্যদের পিছু হটতে বাধ্য করাই নয়, বরং নিজেদের লজিস্টিকস ও আসুরিক শক্তির প্রদর্শন ঘটিয়ে তারা প্রকাশ্য দিবালোকে বুলডোজার এনে সরকারি ক্যাম্পটি ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্বোধনের ঠিক আগে এই মাত্রার সুপরিকল্পিত সশস্ত্র হামলা এবং সরকারি ক্যাম্প ধ্বংসের ঘটনা রাষ্ট্রের রিট ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার শামিল। ১৫০ জন পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে বুলডোজার ব্যবহারের এই দুঃসাহস স্পষ্ট ইঙ্গিত করে যে, পাহাড়ি দুর্গমতার সুবিধা নেওয়া এই অপরাধী চক্রের পেছনে কোনো বড় ধরনের সুপ্রশিক্ষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বা আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের কালো হাত ও গোপন অর্থায়ন রয়েছে।

সরকারের মহাপরিকল্পনা

জঙ্গল সলিমপুরের এই কোটি কোটি টাকার সমান্তরাল অবৈধ সাম্রাজ্য এবং একচ্ছত্র আধিপত্য চিরতরে হাতছাড়া হওয়ার চরম ভয়েই রোকন ও ইয়াসিন বাহিনীর মতো সন্ত্রাসীরা শেষ চেষ্টা হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর এই নজিরবিহীন ও মরিয়া হামলা চালাচ্ছে। তবে রাষ্ট্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ধৃষ্টতার কাছে সরকার মাথা নত করবে না এবং উদ্ধারকৃত প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাস জমিকে একটি আধুনিক, সুরক্ষিত ও সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব সরকারি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সরকারের এই দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যানের মূল লক্ষ্যই হলো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে একে একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী প্রশাসনিক জোনে রূপান্তর করা।

এই মহাপরিকল্পনার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা জোরদারে বর্তমান চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারকে এখানে স্থানান্তর করা হবে, পাশাপাশি থাকবে পুলিশ ও র‍্যাবের স্থায়ী ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) ও সেনানিবাসের কৌশলগত সম্প্রসারণ। বিনোদন ও পরিবেশ সুরক্ষায় এখানে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সাড়ে ৫৭ একর জুড়ে বিস্তৃত আধুনিক ‘নাইট সাফারি পার্ক’, ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন নির্মাণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে পাহাড়ের কোলে একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ গড়ে তোলা হবে এবং জনগণের সেবায় এখানে একটি বিশেষায়িত হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, হাই পাওয়ার রেডিও ব্রডকাস্টিং সেন্টার ও কাস্টমস ডাম্পিং হাউস স্থাপন করা হবে।

জঙ্গল সলিমপুরের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে, এলাকাটি এখন আর কেবল সাধারণ ভূমিদস্যুতার আখড়া নেই, বরং এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তিন দশকের পুঞ্জীভূত অপরাধের যে সমান্তরাল সাম্রাজ্য এখানে গড়ে উঠেছিল, তার মূলোৎপাটন শুধু আংশিক উচ্ছেদ বা প্রশাসনিক আশ্বাসের মাধ্যমে সম্ভব নয়—তা রোকন ও ইয়াসিন বাহিনীর সাম্প্রতিক দুঃসাহসিক হামলা এবং ক্যাম্প ধ্বংসের ঘটনাই প্রমাণ করে।

সরকারের মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যানটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দূরদর্শী এবং যুগোপযোগী, তবে তা বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হলো এই দুর্গম অঞ্চল থেকে সব ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ককে সমূলে বিনাশ করা। রাষ্ট্র যেখানে তার আইনি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর, সেখানে এই ধরনের চরমপন্থী ও উগ্র ঘরানার অপরাধী চক্রকে দমনে কোনো রকম আপোসের সুযোগ নেই।

ভবিষ্যৎ করণীয় হিসেবে সরকারকে এখন নিয়মিত পুলিশি টহলের গণ্ডি পেরিয়ে সেনাবাহিনী, সোয়াত এবং র‍্যাবের সমন্বয়ে একটি ব্যাপকভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি ‘কম্বাইনড ক্র্যাকডাউন’ বা যৌথ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পুরো ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি খাস জমিকে সম্পূর্ণ সিলগালা করে দিয়ে ড্রোনের মাধ্যমে আধুনিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যেন প্রতিটা সুড়ঙ্গ বা গোপন আস্তানা খুঁজে বের করে অস্ত্র ও মাদকের মজুত ধ্বংস করা যায়। অপরাধীদের এই মূল চক্রকে চিরতরে নির্মূল করার পাশাপাশি উদ্ধারকৃত ভূমিতে নাইট সাফারি পার্ক, আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম ও কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে, যাতে শূন্যতার সুযোগে নতুন কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী পুনরুত্থান করতে না পারে। একই সঙ্গে, প্রকৃত ছিন্নমূল মানুষদের ডাটাবেজ তৈরি করে পুনর্বাসন করা এবং স্থায়ী চেকপোস্ট ও সিসিটিভি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুরো সীতাকুণ্ড অঞ্চলের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ চিরতরে সুসংহত করাই হবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সম্পর্কিত