
ভারতের নাগরিক হিসেবে সব ধরনের বৈধ পরিচয়পত্র রয়েছে তাঁর। ২০০২ সাল থেকে তিনি নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছেন এবং ২০২৬ সালের সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। তবুও ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে দীর্ঘ তিন মাস কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল ৬৬ বছর বয়সী দিনমজুর জলিল আখতারকে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার ডালখোলা থানার বগরাইল গ্রামের বাসিন্দা জলিল আখতার জামিনে মুক্তি পান। ইসলামপুর আদালতের অতিরিক্ত জেলা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট জমশেদ শেখ শর্তসাপেক্ষে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৯ জুন মধ্যরাতে। ঘুমন্ত অবস্থায় জলিল আখতারকে তাঁর ঘর থেকে তুলে নেয় ডালখোলা থানার পুলিশ। পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে তাঁকে সোজা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিজেকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে স্বীকার করার জন্য তাঁর ওপর চাপ দেওয়া হয়।
জলিল আখতার কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তিনি এই দেশেই জন্মেছেন এবং জীবনে কখনো বাংলাদেশে যাননি। টানা জেরার পর বিএসএফ বুঝতে পারে তিনি প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক। বিএসএফ তাঁকে পুলিশের কাছে ফেরত পাঠায়।
বিএসএফের ছাড়পত্র সত্ত্বেও পুলিশ তাঁকে মুক্তি দেয়নি। প্রথমে নিজামপুর এবং পরে কাদেরগঞ্জের আটক কেন্দ্রে (ডিটেনশন সেন্টার) পাঠানো হয়।
জলিলের চাচাতো ভাই মতিউর রহমান আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ও রেশন কার্ড নিয়ে থানায় ছুটে যান।
মতিউরের তথ্যমতে, ২০০২ সালে করণদিঘি বিধানসভা এবং ২০২৬ সালে চাকুলিয়া বিধানসভার ভোটার তালিকায় জলিলের নাম রয়েছে।
মতিউর জানান, একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাঁদের বলেছিলেন ওপর থেকে ৫০০ জনকে আটক করার তালিকা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের চাপের কারণেই সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও জলিলকে আটকে রাখা হয়।
গত ২২ জুলাই পুলিশ জলিলকে ইসলামপুর আদালতে হাজির করে। পুলিশের প্রতিবেদনে তাঁকে বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুরের বাসিন্দা হিসেবে দাবি করা হয়।
আদালতের নির্দেশে পুলিশ জলিলের নথিপত্র যাচাইয়ে বাধ্য হয়। অবশেষে ১৯ আগস্ট পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে স্বীকার করে যে জলিলের ভোটার কার্ড ও রেশন কার্ড সম্পূর্ণ আসল।
তিন মাসের এই বন্দিদশায় জলিলের পরিবার চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। স্ত্রী বিবি তৌফা খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। দিল্লি ও হায়দরাবাদে অভিবাসী শ্রমিকের কাজ করা দুই ছেলে কাজ হারানোর ভয়ে কাউকে বাবার আটকের খবর পর্যন্ত জানাতে পারেননি।
শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া জলিল এখন সামাজিক অপবাদের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকারের দেওয়া ‘বাংলাদেশি’ তকমা সমাজ কীভাবে নেবে, সেই আতঙ্কে ভুগছেন এই বৃদ্ধ দিনমজুর।
তথ্যসূত্র: দ্য ওয়্যার
.png)






