হলফনামায় মিথ্যা তথ্য/পদ হারানোর ঝুঁকিতে এমপি মাহবুবা হাকিম, দায় চাপালেন দলের ওপর
ঢাকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত সংসদ সদস্য মাহবুবা হাকিমের হলফনামায় মিথ্যা তথ্য পাওয়া গেছে। নিজের স্বাক্ষর থাকলেও তিনি এর দায় চাপিয়েছেন দলের ওপর। হলফনামা দল পূরণ করে কেবল তার স্বাক্ষর নিয়েছে বলে তিনি স্ট্রিমকে জানান।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া এই সংসদ সদস্য (এমপি) তার হলফনামায় বিষয়টির উল্লেখ না করে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণের তথ্য দিয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জানিয়েছেন, হলফনামায় এই ধরনের মিথ্যা তথ্য দেওয়া প্রতারণার শামিল। এই ঘটনায় ওই সংসদ সদস্য ও তাঁর দল উভয়েরই দায় রয়েছে। স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার স্ট্রিমকে বলেন, এই ঘটনায় সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে। হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদও।
হলফনামায় মিথ্যা তথ্য
হলফনামায় মাহবুবা হাকিম নিজের সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে লিখেছেন, ‘এমএলএম, ব্যারিস্টার এট ল।’
কিন্তু স্ট্রিম যাচাই করে দেখেছে, মাহবুবা হাকিমের উচ্চতর পড়াশোনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর। আইন বিষয়ে তিনি উচ্চতর কোনো সনদ অর্জন করেননি।
বিষয়টি স্বীকার করেছেন মাহবুবা হাকিমও। আইন বিষয়ে তাঁর কোনো উচ্চতর ডিগ্রি নেই জানিয়ে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘আমি বুটেক্স (বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে পাস করেছি; বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। আমার ওটারই সার্টিফিকেট জমা দেওয়া আছে। আমি সায়েন্সের স্টুডেন্ট। আইন বিষয়ে আমার কোনো সার্টিফিকেট নেই।’
সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং জমা দেওয়া সনদের গড়মিল বিষয়ে মাহবুবা হাকিম বলেন, ‘আমার নমিনেশনের ফর্ম ওঠানো থেকে ফিলাপ (পূরণ) করা—সবই দল করেছে। আমার সার্টিফিকেট সবকিছুই আমার দেওয়া। আমি সিগনেচার করেছিলাম নমিনেশন ফর্মে, ওনারা ফিল-আপ করেছিলেন।’
অথচ স্বাক্ষরিত হলফনামায় মাহবুবা হাকিম বলেছেন, ‘আমি, নিম্ন স্বাক্ষরকারী, ঘোষণা ও শপথ করিতেছি যে, আয় ও সম্পত্তিসহ উপর্যুক্ত বিবরণীতে উল্লিখিত সব তথ্য আমার জ্ঞান ও বিশ্বাস অনুযায়ী সত্য এবং কোনো আয় ও সম্পত্তি বা সংশ্লিষ্ট তথ্য গোপন বা বাদ দেওয়া হয় নাই এবং এই হলফনামায় দেওয়া সমস্ত তথ্য এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সমস্ত দলিলাদি ও কাগজপত্র আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সম্পূর্ণ সত্য ও নির্ভুল।’
হলফনামায় স্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে মিথ্যা তথ্যের ওপর শপথ নেওয়া হলো কিনা জানতে চাইলে এই প্রতিবেদককে দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন মাহবুবা হাকিম।
এ ব্যাপারে দলীয় বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে একাধিকবার ফোনকল ও বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
পরে দলের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ স্ট্রিমকে বলেন, মাহবুবা হাকিম সম্পর্কে দলের আমির মামুনুল হকের ভাগ্নি। মামুনুল হকের পরিবারই মনোনয়ন ফরম পূরণ করেছে। তবে ভুল বা মিথ্যা তথ্যের ব্যাপারে তিনি নিজে কিছু জানাতে পারেননি। দলের আমিরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনিও।
পরে আবারও মামুনুল হককে ফোন করা হয়। তবে এবারও তিনি সাড়া দেননি।
হলফনামায় প্রার্থীর শনাক্তকারী হিসেবে মাসরুরুল হকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। জানা গেছে, তিনি খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের ছোট ভাই।
আইন নিয়ে পড়েননি মাহবুবা হাকিম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র ও হলফনামা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২১ এপ্রিল। মাহবুবা হাকিম হলফনামায় স্বাক্ষর করেন ১৯ এপ্রিল। পরদিন ২০ এপ্রিল দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাহবুবা হাকিমের পরিচিতি তুলে ধরা হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ওয়েবসাইটে। পরে সেটি গণমাধ্যমেও পাঠানো হয়। সেখানেও মাহবুবা হাকিম বস্ত্র প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, মাহবুবা হাকিমের জন্ম ১৯৮৪ সালে ঢাকার সাভারে। হলফনামাতেও একই তথ্য রয়েছে। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি (১৯৯৯) ও এইচএসসি (২০০১) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে মজলিসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, ‘পরে তিনি বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জানিয়েছে, মাহবুবা হাকিম পেশাগত জীবনে টেক্সটাইল বার্ডস গ্রুপ, আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেড এবং ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ল্যাবরেটরি ম্যানেজমেন্ট ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। বর্তমানে তিনি হিফজখানা ও মক্তব পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি রাজধানীর পল্টন এলাকায় শিশু শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন।
হলফনামায় মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিলে কী হয়
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছিলেন, হলফনামায় কোনো প্রার্থী মিথ্যা তথ্য দিলে নির্বাচিত হওয়ার পর পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে ইসি স্বপ্রণোদিত হয়ে বা কোনো তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে রিকল (প্রত্যাহার) করতে পারবে। মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ হলে তার প্রার্থিতা, এমনকি সংসদ সদস্য পদও বাতিল হবে। তবে পাঁচ বছর মেয়াদের পর তা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে থাকবে না।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ স্ট্রিমকে বলেন, কোনো সংসদ সদস্য হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২০২৬ সালে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য পদও হারাতে পারেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, হলফনামার উদ্দেশ্যই হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে দেশবাসী যেন জানতে পারে। এখানে ভুল বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া তো প্রতারণা। এখন সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য যদি বলেন, এটা তিনি জানেন না, এটা তাঁর দল থেকে করা হয়েছে, এরপরেও এর দায় ওই সংসদ সদস্যের। হ্যাঁ, এখানে যোগসাজশকারী হিসেবে তাঁর দলের জবাবদিহির বিষয়ও হয়তো আসতে পারে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রতারণার জন্য মূল দায়ী ওই সংসদ সদস্যই হবেন। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে, এটা অস্বীকার বা এভয়েড করার কোনো সুযোগ নেই। এমনিতে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা অনুযায়ী তাঁর সদস্যপদ থাকবে না, থাকার কথা নয়।’
হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদারও। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, এই ক্ষেত্রে তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। ১. কেউ প্রমাণ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলে। ২. গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে পূর্ণ এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। ৩. সংসদীয় ‘বিশেষ অধিকারসম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’র হয়ে স্পিকার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে পারেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)–এর সম্পাদক স্ট্রিমকে আরও বলেন, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া সংসদের জন্য অবমাননার। এর শাস্তিস্বরূপ সংসদ সদস্যদের বহিষ্কার করার ক্ষমতা রয়েছে সংসদীয় ‘বিশেষ অধিকারসম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’র। আমাদের জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধির ২০১-২০৩ ধারায় এ–সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংসদীয় বিশেষ অধিকার কমিটি গঠিত হয়েছে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীর বিক্রম) নেতৃত্বে ৯ সদস্য নিয়ে, যাদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মো. নুরুল ইসলাম, জয়নুল আবদিন ফারুক ও নাহিদ ইসলাম।
.png)
-40e58c.jpeg)



-4aac43-256x144.webp)
-b04cb2-256x144.webp)
