পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে দেশেটির নির্বাচন কমিশন। গতকাল রোববার (১৫ মার্চ) বিকেলে দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন কমিশনের ফুল বেঞ্চ এই তারিখ প্রকাশ করে। পশ্চিমবঙ্গে দুই দফায় ভোট হবে। ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ। গণনা হবে ৪ মে। ভোটের দিনক্ষণ যখন চূড়ান্ত, রাজনৈতিক মহলে উঠছে একটাই প্রশ্ন, ৬০ লাখ বিচারাধীন ভোটারের কী হবে?
এদিন এসআইআর প্রসঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানান, এর লক্ষ্য ছিল যাতে কোনো বৈধ ভোটার বাদ না পড়েন। একই সঙ্গে যাতে কোনো অবৈধ ভোটার থেকে না যান, তা-ও নিশ্চিত করার জন্য এসআইআর করা হয়েছে। এসআইআরের কাজ সফলভাবে পরিচালনা করার বিএলও থেকে ইআরও-দের এদিন শুভেচ্ছাও জানান জ্ঞানেশ কুমার।
অতিরিক্ত ভোটার তালিকা কবে প্রকাশিত হবে—এই প্রসঙ্গেও কথা বলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বর্তমানে কলকাতা হাই কোর্টের তত্ত্বাবধানে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা ‘বিবেচনাধীন’ নামগুলো খতিয়ে দেখছেন। অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হলে সেই নামগুলো বর্তমান ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা যে নামগুলো অনুমোদন দেবেন, সেগুলোই পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
কমিশন সূত্রে আগেই জানা গেছে, রাজ্যে পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার পশ্চিমবঙ্গে ভোটের দফা কম রাখা হচ্ছে। গত কয়েকটি নির্বাচনে যেখানে ছয় থেকে সাত দফায় ভোটগ্রহণ হয়েছিল, সেখানে এবার দুই থেকে তিন দফার মধ্যেই ভোট সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল আট দফায়।
তবে দফা কম হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনোরকম শৈথিল্য রাখতে চাইছে না কমিশন। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসার অতীত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি থাকবে একাধিক পর্যবেক্ষক ও কড়া নজরদারি। পাঁচ রাজ্যে ভোটের জন্য প্রায় ১৫ লাখ ভোটকর্মী নিয়োগ করছে কমিশন। নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে প্রায় সাড়ে আট লাখ। ভোটের জন্য প্রায় ৪৯ হাজার মাইক্রো অবজার্ভার, ১ হাজার ৪৪৪ জন অবজার্ভার, ৪০ হাজার গণনাকর্মী, ২১ হাজার সেক্টর অফিসার এবং গণনার জন্য ১৫ হাজার মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হচ্ছে। নির্বাচন যাতে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি আসাম, তামিল নাড়ু, কেরালা এবং পন্ডিচেরির বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণও একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ব্যতীত আসাম, তামিল নাড়ু, কেরালা এবং পন্ডিচেরিতে এক দফায় ভোটগ্রহণ হবে বলে ঘোষণা করেছে কমিশন। কয়েক দিন আগে কমিশনের ফুল বেঞ্চ কলকাতা সফরে এসে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছিল। সেই বৈঠকে অধিকাংশ দলই কম দফায় ভোটের দাবি জানিয়েছিল। নতুন সূচিতে সেই দাবিরই প্রতিফলন দেখা গেল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় পাওয়া তথ্যগত অসঙ্গতি খতিয়ে দেখছেন কলকাতা হাইকোর্টের নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা। বর্তমানে এই কাজে ৭০০-র বেশি আধিকারিক নিয়োজিত রয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন অসম্পূর্ণ ভোটার তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ‘বিবেচনাধীন’ ছিল ৬০ লাখ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম। শনিবার পর্যন্ত প্রায় ১৮ লাখ নামের নিষ্পত্তি হয়েছে বলে কমিশন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। পশ্চিমবঙ্গে নতুন ভোটার (১৮-১৯ বছর বয়সি) রয়েছেন ৫ লাখ ২৩ হাজার জন। ২০-২৯ বছর বয়সি ভোটার রয়েছেন ১ কোটি ৩১ লাখ জন।
বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার মতো কয়েকটি জেলায় এই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে এবং সেখানে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব। তবে মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর দিনাজপুর ও মালদহে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। এই জেলাগুলোতে ‘বিবেচনাধীন’ নামের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি ছিল।
প্রসঙ্গত, এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর আগে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় মোট ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৩৭ হাজার ৫২৯ জনের নাম ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে ‘যোগ্য’ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৬০৯। প্রতিদিন এই কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল।
এই বিপুল সংখ্যক বিচারাধীন ভোটারকে ঘিরেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বিবেচনাধীন ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার্থে রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক দল। বামেরা রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের সামনে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মতলায় ধর্নায় বসেছেন। সবারই দাবি মোটামুটি এক, আগে ভোটার তালিকা, তারপর ভোট। এসআইআরে বিচারাধীন থাকা বা জীবিত থাকা সত্ত্বেও, প্রয়োজনীয় নথি জমা করা সত্ত্বেও যাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে একজন ভোটারকেও বাদ দিয়ে ভোট করানো যাবে না। অথচ নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গেছে, এখনো এসআইআর সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যাঁদের নাম এখনো নিষ্পত্তি হয়নি তারা কি ভোট দিতে পারবেন? ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার ভোটগ্রহণ, তার আগে কি এসআইআরের প্রক্রিয়া সম্পূর্ন শেষ হবে?
সারা বাংলা বিচারাধীন ভোটার মঞ্চের তরফে সুমন সেনগুপ্ত বলেন, ‘এটা মোটামুটি এরকম একটা দাঁড়ায় যে মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা দেখা হয়নি সবার, কিন্তু মাধ্যমিকের পরীক্ষার ফল বেরিয়ে গেল। তাহলে যে মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতাগুলো দেখা হয়নি, তাদের কী হবে? তারা কি পরের বছর পরীক্ষা দেবে, না এ বছর তাদের পাস ঘোষণা করা হবে? এই সমস্ত কথাগুলো এখন উঠে আসবে। নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গেলে ৬০ লাখ মানুষের কী হবে? এরা নাগরিকত্ব হারাবে। এদের নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল এখন আর কোনো কথা বলবে না। কেউ কেউ বলবে যে আমরা ভোটের পরে ফিরে আসব, ফিরে এসে তোমাদের নাগরিকত্ব নিয়ে কথা বলব। এখনও ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে ট্রাইবুনাল গঠন করতে—সেটা হাইকোর্টে হবে, না জেলা আদালতে হবে, না নিম্ন আদালতে হবে, কেউ কিছু জানে না। এই মানুষগুলোর কী হবে? এই প্রশ্নটা সবার আগে করতে হবে।’
১০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, এসআইআর মামলায় বাতিল হওয়া ভোটার আবেদনগুলোর আপিল শুনতে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এই ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্বে থাকবেন একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর সঙ্গে থাকবেন একাধিক প্রাক্তন বিচারপতি; প্রয়োজন অনুযায়ী সদস্যসংখ্যা বাড়ানোও যাবে এবং সমস্ত খরচ বহন করবে নির্বাচন কমিশন।
মালদহ-মুর্শিদাবাদ জেলায় সবচেয়ে বেশি ভোটার বিচারাধীন। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলেই পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। তাঁদের বিচারাধীন রেখেই ভোট ঘোষণা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক জানিয়েছেন, যে ট্রাইব্যুনালের কথা বলা হয়েছে, আসাম মডেলের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, আসামের মানুষ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন। এবং এখানে ম্যাক্সিমামই যারা পরিযায়ী শ্রমিক, তারা আইনের বিষয়গুলো কিছুই বোঝে না। এবং সেক্ষেত্রে এরা ভারতীয় ভোটার, বারবার এদেরকে প্রমাণ করতে হয় যে এরা পশ্চিমবাংলার বাংলাভাষী মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিক। এটা কেন হবে? নিজের রাষ্ট্রে নিজের অধিকার বারবার কেড়ে নিতে চাইছে এবং সরকার থেকে শুরু করে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাও যেন বিমাতৃসুলভ আচরণ করছে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে।
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের বহু নাগরিককে, বিশেষ করে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের, বারবার প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তারা বাংলাদেশি নন। এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোটাধিকার কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করায় তাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ভোটার তালিকায় ‘‘বিচারাধীন’’ থাকার কারণে এই শ্রমিকদের ভোটার কার্ড কর্মস্থল বা অস্থায়ী বাসস্থানে বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে মান্যতা পাচ্ছে না, ফলে নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাও বাড়ছে। বিচারাধীন ভোটারদের একটি বড় অংশ পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ায় তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করেই নির্বাচন ঘোষণা করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে উদ্বেগের বিষয়। বিজেপিকে জেতানোর জন্যই নির্বাচন কমিশন এটা করছে।’
তবে নববর্ষের পরেই যদি প্রথম দফার ভোট শুরু হয়, তার মধ্যে সব নামের নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে গেলেও বিচারাধীন লাখ লাখ ভোটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে এই প্রশ্নই এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।