জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য ‘আশীর্বাদ’, লাভের খাতায় শুধু তেল নয়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৬: ৫৬
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

রাশিয়ার বিপর্যস্ত অর্থনীতির জন্য ইরান যুদ্ধ প্রয়োজনীয় ‘লাইফলাইন’ বা জীবনরেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য রাশিয়ার কোষাগারকে সমৃদ্ধ করছে। ফলে দেশটি তাদের কেন্দ্রীয় বাজেটের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সহায়তা পাচ্ছে। তবে শুধু তেল নয়, ইরান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের সরবরাহে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা রাশিয়ার আর্থিক লাভকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ সহযোগী বেন কাহিল বলেন, ‘এই (ইরান) সংঘাতের সবচেয়ে বড় বিজয়ী হলো রাশিয়া।’ তিনি আরও বলেন, রাশিয়া আগে ছাড়ে বিক্রি করা অপরিশোধিত তেল এখন ‘পুরো বাজারমূল্যে’ বিক্রি করতে পারছে। এই নতুন পরিস্থিতি তাদের অর্থনীতির জন্য বেশ বড় ধরনের ‘ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ’ তৈরি করেছে।

রাশিয়ার সরকারি কোষাগারে এই অপ্রত্যাশিত অর্থ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছে, যখন দেশটি মারাত্মক সংকটে ছিল। বার্লিনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের ফেলো আলেকজান্দ্রা প্রোকোপেনকো সিএনএনকে বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে রাশিয়া সত্যিকারের বাজেট সংকটের দিকে এগোচ্ছিল।’ দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের কারণে কাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির দৃশ্যপট এই সংঘাতের কারণে খুব একটা না বদলালেও, অন্তত ‘কিছুটা সময় কিনে দিয়েছে’ বলে মনে করেন তিনি।

এই স্বস্তি কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে ইরান যুদ্ধ কত দিন চলবে তার ওপর। তবে তেলের উচ্চমূল্য ইতিমধ্যেই কিছুটা স্বস্তি এনেছে। কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো সের্গেই ভাকুলেঙ্কো জানিয়েছেন, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ‘ইউরালস ক্রুড’-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণ। চলতি সপ্তাহে এক নোটে তিনি জানান, মার্চ মাসের শুরুর দিকে ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলার দাম বাড়ার অর্থ হলো প্রতি মাসে ৮৫০ কোটি (৮.৫ বিলিয়ন) ডলার অতিরিক্ত রাজস্ব আয়, যার ‘৫০০ কোটি ডলার যায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এবং বাকিটা তেল কোম্পানিগুলোর পকেটে।’

ব্রাসেলসভিত্তিক থিংকট্যাংক ব্রুগেলের জ্যেষ্ঠ ফেলো সিমোন তাগলিয়াপিয়েত্রা বলেন, রাশিয়ার কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। ইউক্রেনে তাদের ‘যুদ্ধযন্ত্র’ সচল রাখতে এই অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা ইউক্রেনের জন্য একটি দুঃসংবাদ।

নাটকীয় পটপরিবর্তন

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেলের ক্রেতা কমছিল এবং গ্রাহকরা বিপুল ছাড় দাবি করছিল। যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা ভারতের ওপরও চাপ প্রয়োগ করেছিল। এই চাপ কাজেও দিচ্ছিল। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের রপ্তানি দৈনিক ৬৬ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছিল, যা ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন।

কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী ট্রাম্প প্রশাসনের রুশ তেল নীতির আকস্মিক পরিবর্তন। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সচল রাখতে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সমুদ্রপথে পরিবহন করা রুশ অপরিশোধিত তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে।

রিয়েল-টাইম ডেটা ও অ্যানালিটিক্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারতীয় শোধনাগারগুলো কেনাকাটা বাড়িয়েছে। ফলে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে ভারতে রাশিয়ার তেল রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পথে রয়েছে। কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া জানান, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ভারতীয় ক্রেতারা বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর চেয়ে ‘ইউরালস ক্রুড’-এর জন্য বেশি দাম পরিশোধ করেছেন।

প্রাকৃতিক গ্যাস সার

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত রাশিয়ার জন্য আরও কিছু আর্থিক ও কৌশলগত সুবিধা বয়ে আনতে পারে। হরমুজ প্রণালি কেবল তেলের জন্যই নয়, বরং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার, হিলিয়াম এবং অ্যালুমিনিয়ামের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট। আর এগুলোর প্রতিটিই রাশিয়া বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করে থাকে।

প্রোকোপেনকোর মতে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়া ইতিমধ্যেই আরও বেশি কার্যাদেশ (অর্ডার) পাচ্ছে। নাইজেরিয়া ও ঘানার আমদানিকারকরা চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের জন্য আগাম কেনাকাটা সেরে রাখছেন।

রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। এরই মধ্যে জল্পনা শুরু হয়েছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন হয়তো রাশিয়ান প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার সময়সীমা পিছিয়ে দিতে পারে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির ফেলো তাতিয়ানা মিত্রোভা জানান, কিছু রুশ তেলের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করাটা মূলত প্রতীকী। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী ছাড় আদায়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে দরকষাকষির সুযোগ পেয়েছে রাশিয়া।

উপসাগরীয় আমদানি নিয়ে ভারত-চীনের নতুন হিসাব

কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের ভাকুলেঙ্কোর মতে, ভারত ও চীন যদি মধ্যপ্রাচ্যের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমায়, তবে তারা বিকল্প হিসেবে রাশিয়ান আমদানির দিকে ঝুঁকতে পারে। এর ফলে কিছু বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের যৌক্তিকতা আরও জোরালো হবে, যা রুশ অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করবে। উদাহরণস্বরূপ, চীন আগে রাশিয়ার প্রস্তাবিত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে যুক্ত হতে অনিচ্ছুক ছিল, কিন্তু এখন বেইজিং হয়তো এতে আগ্রহী হবে।

তবে মিত্রোভার মতে, রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি এশিয়ার এই নতুন আগ্রহ দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট চীন ও ভারতকে নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং এমনকি কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে বাধ্য করবে।

সম্পর্কিত