ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে উষ্ণতা, বেইজিং নিয়ে টানাপড়েন

বিশ্লেষকরা বলছেন, পর্যটন ভিসা চালুর মাধ্যমে গলছে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের বরফ। তবে চীনা বিনিয়োগ ও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের মাঝে সমতা রক্ষাই ঢাকার সামনে বড় পরীক্ষা।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ২১: ২২
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে পণ্য খালাস শেষে ভারতে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় সারিবদ্ধ ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালু করেছে ভারত। এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে উষ্ণতার ইঙ্গিত বলা হচ্ছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর এবং সেখানে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে দেশটির সম্ভাব্য বিনিয়োগের আগ্রহে ভারত খোলাখুলি উদ্বেগ জানিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ভিসা বন্ধ করে ভারত। দীর্ঘদিন পরে হলেও, তা আবার চালু হলো গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে। এটি দুই দেশের সম্পর্কের নতুন শুরু। তবে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

গত ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের পর্যটন ভিসার আবেদন নেওয়া শুরু করেছে ভারত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য স্থগিত ভিসা সেবা চালু করে বাংলাদেশ। তবে ভারতে পালিয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন তৈরি করছে।

অবশ্য সম্পর্কের বরফ গলার আরও ইঙ্গিত মিলেছে দিল্লির সাম্প্রতিক কার্যক্রমে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করছে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে নয়াদিল্লি।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেছেন, ‘পর্যটন ভিসা চালু হয়েছে। আমি নিশ্চিত, ধীরে ধীরে সীমান্ত বাণিজ্যসহ অন্যান্য সহযোগিতাও স্বাভাবিক হবে।’ তাঁর মতে, ‘এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং ভারত হয়ে তৃতীয় কোনো দেশে বাংলাদেশের রপ্তানির জন্যও ইতিবাচক হবে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। গত মাসে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন তারেক রহমান। সফরে তিনি বাংলাদেশে চীনের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং মোংলা বন্দর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে চীন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আরও সহজ প্রবেশাধিকার পেতে পারে বেইজিং।

তবে এসব ভারতের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মোংলা বন্দর ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর- দুটিই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা সংকীর্ণ ‘চিকেনস নেক’ করিডরের কাছাকাছি। বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রাখছে নয়াদিল্লি।

লন্ডনপ্রবাসী ভারতীয় লেখক প্রিয়জিৎ দেব সরকার বলেন, ‘তারেক রহমান বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিকল্প বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে এটি খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে চীন ও ভারত– দুই দেশের বিনিয়োগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারত-বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং স্বল্প দূরত্বের কারণে বাণিজ্যও বেশি কার্যকর।’

ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, ‘চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর এখনো একটি প্রস্তাব মাত্র। এই মুহূর্তে এটি বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক বার্তাই বেশি। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ চলায় শিগগির এমন কোনো করিডর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম।’ তবে তিনি সতর্ক করেন, ‘বাংলাদেশে চীনের বন্দর, পরিবহন নেটওয়ার্ক ও শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক বিনিয়োগ ভারতের পূর্বাঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।’

অধ্যাপক উদয় চন্দ্রের মতে, বাংলাদেশকে চীনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নেটওয়ার্কে চলে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে ভারতকে আরও ভালো অর্থনীতি, ভালো বাণিজ্য সুবিধা, কম খরচে ট্রানজিট এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার সিদ্ধান্ত নিলে, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগও বিবেচনায় রাখতে হবে ঢাকাকে। দুই দেশের সঙ্গে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলছেন তারা।

তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

Ad 300x250

সম্পর্কিত