গাজায় এখন ঈদ মানে শোক, ক্ষুধা আর হারানোর বেদনা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৬, ১৬: ২২
গাজা উপত্যকার খান ইউনিসে কোরবানির ঈদের নামাজের সময় মিষ্টি হাতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। ছবি: এএফপি

গাজার শাতি শরণার্থীশিবিরে ঈদের সকাল একসময় ছিল উৎসবের। ভোরে ঘুম থেকে উঠে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি ঘোরা, কোরবানির মাংস ভাগাভাগি করা আর ঈদের শেষে পুরো পরিবারের একসঙ্গে ছবি তোলা—এসবই ছিল বারুদ পরিবারের বহু বছরের রীতি।

কিন্তু এবার সেই ছবিটিই হয়ে উঠেছে বেদনার স্মৃতি। পরিবারের সদস্য ওয়ালা বারুদ এখন হাতে ধরে থাকেন শেষ ঈদের সেই পারিবারিক ছবি। ছবির ২২ জনের মধ্যে এখন বেঁচে নেই ১৩ জন। ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন তাঁরা। পরিবারটির ৮০ জনের বেশি সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন চলমান যুদ্ধে।

কয়েক দিন আগে নিহত হয়েছেন ওয়ালার ভাই বাহা বারুদও। ফলে এবারের ঈদ শুরু হয়েছে শোকতাঁবুতে বসে। তাঁর মরদেহ এখনো হাসপাতালে।

ওয়ালা বারুদ বলেন, যুদ্ধ আমাদের প্রিয়জনদের কেড়ে নেওয়া থামায়নি। আমরা কখনো ভাবিনি যুদ্ধবিরতির সময়ও শোক পালন করতে হবে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৩ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন গাজায়।

‘ঈদ তাঁবুতে আসে না’

গাজা শহরের এক ফুটপাতে ছোট্ট একটি তাঁবুতে থাকেন হাজ্জা শামা আল-জোরবাতলি। স্বামী ও বাড়ি—দুটিই হারিয়েছেন তিনি। ঈদ নিয়ে প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। পরে বলেন, ঈদ তাঁবুতে আসে না।

তাঁর তাঁবুতে নেই বিদ্যুৎ, ফোন বা ইন্টারনেট। দিন-তারিখের হিসাবও ঠিকমতো জানেন না তিনি।

৭০ বছরের বেশি বয়সী এই নারী একসময় ঈদের আগে নাতি-নাতনিদের জন্য কাপড় কিনতেন, মিষ্টি আনতেন, কেক বানাতেন। এখন তাঁর কাছে ঈদ মানে শুধু শোক।

তিনি বলেন, এটা শহীদদের ঈদ। আনন্দ নেই, শুধু হারানোর বেদনা।

স্ত্রী, ঘর ও পা হারিয়ে একা ঈদ

পাশের তাঁবুতেই একা ঈদ কাটাচ্ছেন মোহাম্মদ উবেইদ। যুদ্ধে তিনি হারিয়েছেন স্ত্রী, বাড়ি এবং নিজের দুই পা।

হুইলচেয়ারে বসে কোরআন তিলাওয়াত করেই সময় কাটান তিনি। একসময় শুজাইয়া এলাকায় তাঁর চারতলা বাড়ি ছিল। প্রতিবছর কোরবানির মাংস প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করতেন।

এখন সেই মানুষটিকেই অন্যদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

উবেইদ বলেন, আজকের ঈদ আর অন্য দিনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যুদ্ধ আমাদের পিষে ফেলেছে।

কোরবানির পশু এখন নাগালের বাইরে

গাজায় এবার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে কোরবানি। রু’ইয়া দাতব্য সংস্থার কর্মকর্তা কারাম খালেদ বলেন, সীমান্ত বন্ধ, পশুর সংকট এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে কোরবানি কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের আগে যেখানে একটি ভেড়ার দাম ছিল প্রায় ৩৫০ ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ডলারে।

খালেদ বলেন, এখন সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, দাতব্য সংস্থাগুলোর পক্ষেও কোরবানি দেওয়া সম্ভব নয়।

বিকল্প হিসেবে এবার হিমায়িত মাংস বিতরণ করছে সংস্থাগুলো। প্রায় ১০ টন হিমায়িত মাংস বিতরণের পরিকল্পনা নিয়েছে রু’ইয়া ফাউন্ডেশন।

বাজারে পণ্য আছে, ক্রেতা নেই

গাজার বাজারগুলোতেও ঈদের আমেজ নেই। দোকানে কাপড়, খেলনা, মিষ্টি সাজানো থাকলেও ক্রেতা খুব কম।

রেমাল এলাকার পোশাক ব্যবসায়ী আমজাদ আকরাম বলেন, যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে একটি কাপড়ের চালান আনতে ২৫০ শেকেল খরচ হতো, এখন লাগে প্রায় ২ হাজার শেকেল।

তাঁর ভাষায়, মানুষ এখন খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। নতুন কাপড় কেনা তাদের অগ্রাধিকার নয়। ফলে অনেকেই দোকানে এসে শুধু দাম জিজ্ঞেস করে ফিরে যাচ্ছেন।

গাজায় এবারের ঈদুল আজহা কাটছে তাকবিরের শব্দ, শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। উৎসবের বদলে সেখানে এখন টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।

(আল জাজিরা থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ)

সম্পর্কিত