কীভাবে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০: ২৩
ইরানের বিজ্ঞানমন্ত্রী হোসেইন সিমায়ী সাররাফ ইরান যুদ্ধ চলাকালে শাহিদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করছেন। ছবি: মিডল ইস্ট আই

গত ৬ এপ্রিল ইরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে অন্তত কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার মধ্যে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্রও ছিল। যদিও এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে গবেষণা অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) সঙ্গে প্রায়ই তুলনা করা হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়কে। কয়েক দশক পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটি পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এর সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মারিয়াম মির্জাখানি। ২০১৪ সালে গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল পাওয়া প্রথম নারী ও প্রথম ইরানি তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য জানান, লক্ষ্যবস্তু হওয়া এআই কেন্দ্রটিতে গুরুত্বপূর্ণ ডেটাবেস ছিল এবং গত দুই বছর ধরে সেখানে ফার্সি ভাষায় এআই মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান বৈশ্বিক এআই গবেষণা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায়, এসব কাজ তাদের নিজস্ব উদ্যোগেই করতে হয়েছে। কিন্তু এখন কেন্দ্রটির অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানান আমির হোসাইন নামে এক শিক্ষার্থী। তিনি সেখানে কাজ করতেন।

তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমরা সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ডেটা প্রক্রিয়াকরণ সেবা ও জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছিলাম। কেন্দ্রটির সঙ্গে কোনো সামরিক সম্পর্ক ছিল না। এ ধরনের হামলা থেকে মনে হয়, তাঁদের লক্ষ্য হলো ইরানকে বৈজ্ঞানিকভাবে পিছিয়ে দেওয়া।’

এক্স-এ দেওয়া পোস্টে ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ বোমা ব্যবহার করেছে। ট্রাম্প বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন ইরানের জ্ঞান কংক্রিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যা বোমা মেরে ধ্বংস করা যাবে। আসল দুর্গ হলো আমাদের শিক্ষক ও মেধাবীদের ইচ্ছাশক্তি।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা

শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার আগে আরও বেশ কয়েকটি গবেষণা কেন্দ্রে হামলা হয়েছে। ইরানের শীর্ষ প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্রমেই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের। ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানায়, অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হয়েছে।

ব্রিটিশ সোসাইটি ফর মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ (ব্রিজমেস) এর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইরান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও সম্প্রতি হামলা হয়। পরদিন ইসফাহান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (আইইউটি) দ্বিতীয়বারের মতো হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চারজন কর্মী আহত হন।

আইইউটি ইরানের জাতীয় রাডার প্রকল্প তৈরি করেছে এবং দেশের প্রথম ইরানি সাবমেরিন ডিজাইন ও তৈরি করেছে। ২০১৫ সালে শরিফ বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইউটি বিশ্বসেরা ৫০ বছরের কম বয়সী বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় যথাক্রমে ৪০ ও ৬৩ নম্বরে ছিল।

গত ২ এপ্রিল শতবর্ষী পাস্তুর ইনস্টিটিউটে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে এর টিকা উৎপাদনকারী ল্যাব ধ্বংস হয়ে যায়।

কয়েক দিন পর তেহরানের শাহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লাজমা ও লেজার গবেষণাগারেও হামলা হয়। অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল তেহরানের গান্ধী হাসপাতালের একটি আইভিএফ ক্লিনিক।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যক্তিগত শিক্ষক-কর্মীরাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, আইইউটির ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাঈদ শামঘাদরি ২২ মার্চ বিমান হামলায় পরিবারসহ নিহত হন।

ব্রিজমেসের চেয়ারম্যান লিইউইস টার্নার বলেন, এই হামলার ধরণ গাজায় ইসরায়েলের অভিযানের সময় শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে সুরক্ষিত মর্যাদা আছে, তা ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

টার্নার সতর্ক করেন, এই ক্ষতির প্রভাব বহু বছর ধরে থাকবে।

‘আসল লক্ষ্য চিন্তার ক্ষমতা’

লক্ষ্যবস্তু হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সবগুলোতেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। আমির বলেন, বিজ্ঞান দর্শন কেন লক্ষ্যবস্তু হবে? সমস্যা কি দর্শনের, নাকি বিজ্ঞানের? মনে হচ্ছে আসল লক্ষ্যই হলো চিন্তা করার ক্ষমতা।

এই হামলাগুলো এসেছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পর যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সীমিত করে ইরানের শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রেজা সোহরাবি বলেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়াশোনা বা এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারেন না। নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক সময় ইরানি চিকিৎসকদের গবেষণাপত্রও প্রত্যাখ্যাত হয়। এমনকি বিজ্ঞান সংগঠনের সদস্যপদ বা সম্মেলনে অংশগ্রহণের ফিও পরিশোধ করতে সমস্যা হয়।

এখন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা দূর্বল ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সোহরাবি বলেন, যুদ্ধের মধ্যে পড়াশোনা ও গবেষণা করা সহজ নয়। থিসিস ও গবেষণাপত্র তৈরি করছি, কিন্তু ইন্টারনেটসহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই পাওয়া কঠিন। আগে লাইব্রেরিতে যেতাম, এখন তা বন্ধ।

ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটার এর গবেষক আসামা আবদি বলেন, এসব হামলার উদ্দেশ্য হলো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যা সম্ভব হয়নি, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে জ্ঞান উৎপাদন, শিল্পোন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। যা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থামানো যায়নি, তা এখন বোমা হামলার মাধ্যমে পুরোপুরি ধ্বংস করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক ভাবনা ও বিশ্ববিদ্যালয়

আবদি ইরানে ছাত্র আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন। বিশেষ করে শাহ শাসনামলে এবং সাম্প্রতিক সময়ে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, ‘ইরানের আধুনিক ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলন ও বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় স্বৈরাচারবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানেই চিন্তা বিনিময় হয় এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারা গড়ে ওঠে।’

শাহ ও তার পাহলভি শাসনের পতনের পরও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি ছিল। ১৯৮০ সালের ১৪ জুন নতুন ইসলামি সরকার এগুলো বন্ধ করে দেয়, যা ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ নামে পরিচিত।

১৯৮৩ সালে পুনরায় চালু হওয়ার পর ইসলামি নীতির বিরোধী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বহিষ্কার করা হয় এবং ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে ‘স্টুডেন্ট বাসিজ’ গঠন করা হয়।

এ বছরের দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। যা অনেকের মতে ছাত্র আন্দোলন দমন করার চেষ্টা ছিল।

আবদি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এসব হামলা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ধ্বংস করে রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে বন্ধ করার প্রচেষ্টা।

তিনি বলেন, এটি এক ধরনের ‘স্কলাস্টিসাইড’। যা আমরা গাজা ও এখন লেবাননে দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে রাজনৈতিক বিকল্পের পথ বন্ধ করে দেওয়া। এর ফলে ইরানে গণতন্ত্রের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে

• মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন

সম্পর্কিত