
নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের পাশেই ইস্ট ৭৭তম স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবন। ভবনটির ওপরের দুই তলায় বসেন মিয়ানমারের সেনা সরকারের কর্মকর্তারা। আর নিচের তিন তলায় রয়েছেন দেশটির জাতিসংঘ দূত ইউ কিয়াও মো তুন। তিনি সেনা সরকারকে বৈধ মনে করেন না।
এ ভবন এখন মিয়ানমারের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। দুই পক্ষই ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সতর্ক। কারণ, এক পক্ষ ভবন থেকে সরে গেলে অন্য পক্ষ তালা বদলে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
সম্প্রতি মিশনে এক সাক্ষাৎকারে কিয়াও মো তুন বলেন, চাবি আমাদের নিয়ন্ত্রণে। ওপরের তলায় থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা কী করি, তারা তা নজরে রাখে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির মধ্যে মিয়ানমারের জাতিসংঘ দূত হিসেবে নিউইয়র্কে আসেন কিয়াও মো তুন। কয়েক মাস পর, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, দেশটির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী। এরপর তাঁকে বরখাস্ত করা হলেও তিনি সেনা সরকারের হয়ে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। জাতিসংঘে মিয়ানমারের প্রতিনিধি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখেন তিনি।
জাতিসংঘ এখনো উৎখাত হওয়া সরকারকেই মিয়ানমারের বৈধ সরকার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তবে সেনা সরকারও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং নিজেকে মিয়ানমারের বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ব্যাপক সমালোচিত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি এই পদে এসেছেন। এরপর চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো নেতাদের সঙ্গে তাঁকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা গেছে।
এর মধ্যে কিয়াও মো তুনের ওপর চাপও বাড়িয়েছে মিয়ানমার সরকার। গত জুলাইয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে পাঠানো এক চিঠিতে মিয়ানমার সরকার অভিযোগ করে, জাতিসংঘে নিজের পদ ধরে রাখার প্রচেষ্টায় কিয়াও মো তুন ২৬ লাখ ডলার আত্মসাৎ করেছেন। তাঁকে ‘পলাতক’, ‘চোর’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেও অভিহিত করা হয়। চলতি মাসে আবারও একই ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে সরকার।
কিয়াও মো তুন বলেন, এ বছর সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে। মিশনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করারও একাধিক চেষ্টা হয়েছে।
জাতিসংঘে জান্তার বিরুদ্ধে অবস্থান
২০২১ সালে জাতিসংঘে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সরব হয়ে আলোচনায় আসেন কিয়াও মো তুন। ওই বছরের জুনে নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য দিয়ে মিয়ানমার পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিষদের ‘দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার’ সমালোচনা করেন তিনি।
তবে এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সম্ভাবনা নেই।
২০২১ সালে তাঁর ওপর হামলার একটি চেষ্টা হয়েছিল। এরপর কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। নিজের সাপ্তাহিক বাজার করার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে কিয়াও মো তুন বলেন, আমি বুলেটপ্রুফ ভ্যানে করে বাজার করতে যেতাম।
তাঁর পরিবারও নানা সমস্যার মুখে পড়েছে। নিউইয়র্কের অবস্থিত রাষ্ট্রদূতের সরকারি বাসভবনে সিসাযুক্ত রঙের দূষণ ধরা পড়ে। জনস্বাস্থ্য বিভাগের এক পরিদর্শক পরিবারটিকে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
কিন্তু কিয়াও মো তুনের ভাষ্য, তাঁরা চলে গেলে সেনা সরকার বাড়িটি দখল করে নিতে পারে। তাই পরিবারটি সেখানে থেকে যায়। পরে মিয়ানমারের প্রবাসী সম্প্রদায়ের স্বেচ্ছাসেবকেরা বাড়ির দেয়াল নতুন করে রং করে দেন।
দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ
নিউইয়র্কের এই কার্যালয় থেকেই কিয়াও মো তুন নিয়মিত মিয়ানমারের মানুষের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। দেশটিতে গণতন্ত্রপন্থী শক্তি ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে চলা সংঘাত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এই গৃহযুদ্ধে ১ লাখের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে।
কিয়াও মো তুনের সহকারী জুন সু বলেন, মানুষের কাছে এখন তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রদূত। জুন সু নিজেও নমপেনে মিয়ানমারের দূতাবাস থেকে পদত্যাগ করে বেরিয়ে এসেছেন।
কিয়াও মো তুনের আরেক সমর্থক অবসরপ্রাপ্ত গাড়িচালক থাং হ্লাইং। তিনি তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি মিশন ও দূতের বাসভবনে ছোটখাটো মেরামতের কাজেও সহযোগিতা করেন।
তিনি বলেন, আমরা চাই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুন। আমরা যতটা পারি সাহায্য করি।
অভ্যুত্থানের পর এক বছরেরও বেশি সময় থাং হ্লাইং মিশনে রাত কাটিয়েছেন, যাতে জান্তার সমর্থকেরা ভবনটি দখল করতে না পারে। এখন তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা এই দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে একজন চিকিৎসক এবং দুজন উবার চালক।
২০২১ সালে অভ্যুত্থানের কিছুদিন পর ওয়াশিংটনে মিয়ানমার দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিশনটি দখলের চেষ্টা করেছিলেন বলে থাং হ্লাইং ও অন্য কর্মীরা জানান। তবে মিয়ানমারের প্রবাসী সম্প্রদায়ের কয়েক ডজন মানুষ মিশন রক্ষায় এগিয়ে এলে তিনি পিছু হটেন।
একসময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ছিলেন
কিয়াও মো তুন সবসময় সেনা শাসনের বিরোধিতা করেননি। ১৯৯০-এর তিনি মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। তখন দেশটি সামরিক জান্তার শাসনে ছিল।
তরুণ কূটনীতিক হিসেবে নিউইয়র্কে প্রথম দায়িত্ব পালনের সময় এশীয়দের কাছে জনপ্রিয় কিছু জায়গায় তিনি স্ত্রীর সঙ্গে প্রকাশ্যে বার্মিজ ভাষায় কথা বলা এড়িয়ে চলতেন। মিয়ানমারের অন্যদের নজরে পড়ার ভয় ছিল তাঁর।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধন অভিযানের পক্ষে অতীতে তাঁর অবস্থানও সমালোচিত হয়েছে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র ওই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
এখন নিজের আগের অবস্থান থেকে দূরে সরে কিয়াও মো তুন বলেন, এটি মোকাবিলায় সরকারের সুযোগ সীমিত ছিল, কিন্তু তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল।
অর্থসংকটে মিশন
বর্তমানে কিয়াও মো তুনের বড় সমস্যাগুলোর একটি অর্থসংকট। মিশনের ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থ কমে আসছে।
তিনি বলেন, মিশনের খরচ কমিয়ে মাসে মাত্র ২০ ডলারে নামিয়ে এনেছেন। মালীকে চাকরি থেকে বিদায় দিয়েছেন। এখন নিজের বাসভবনের লন নিজেই কাটেন। এমনকি নিজের বেতনও নেওয়া বন্ধ করেছেন। খরচ চালাতে ভাইয়ের সহায়তার ওপর নির্ভর করছেন।
তিনি হেসে বলেন, আমি মূলত নিঃস্ব।
চালকের অতিরিক্ত সময়ের বেতন বাঁচাতে এখন তিনি নিজেই মিশনের কালো ক্যাডিলাক চালান।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
.png)






