ইউক্রেনের ড্রোনে যেভাবে খেই হারাচ্ছে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

গত বৃহস্পতিবার মস্কোতে সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের ক্রমাগত ড্রোন হামলায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভোরে মস্কোতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই সময়ের বিভিন্ন ভিডিওতে রুশ প্রতিরক্ষার বিশৃঙ্খল চিত্র দেখা গেছে।

সিএনএনের যাচাই করা ভিডিও ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মস্কোর একটি ব্যস্ত মহাসড়কের পাশ থেকে কাঁধে বহনযোগ্য বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ড্রোন লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছেন সেনারা। এ সময় সড়কে যানবাহন চলাচলও অব্যাহত ছিল।

অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভূপাতিত একটি ড্রোন একটি বাণিজ্যিক এলাকার ভবনের ওপর আছড়ে পড়ছে এবং আশপাশের মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।

আরেকটি ভিডিওতে একটি রুশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মস্কোর উপকণ্ঠের একটি তেল সংরক্ষণ ট্যাংকে আঘাত হানতে দেখা যায়। এতে বিস্ফোরণের পর ট্যাংকের উপরের অংশ ছিটকে আকাশে উঠে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিপুলসংখ্যক ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলার যে কৌশল ইউক্রেন নিয়েছে, তা কার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক মার্কুস শিলার বলেন, রাশিয়ার অনেক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোনো এবং শতভাগ নির্ভরযোগ্য নয়। বিপরীতে ইউক্রেন কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে তাদের ড্রোন হামলার সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

২০২৪ সাল থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। সম্প্রতি সেন্ট পিটার্সবার্গেও হামলা চালিয়েছে তারা। পাশাপাশি মস্কোকেও একাধিকবার লক্ষ্যবস্তু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সীমান্ত ও যুদ্ধক্ষেত্রে রেখেছিল। তবে কিয়েভের কৌশল ছিল রাশিয়ার ভেতরে ও ইউক্রেনের দখল হওয়া পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা হামলা চালানো। ফলে রাশিয়া তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়, যার কারণে তাদের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

একই সঙ্গে ইউক্রেন নিয়মিতভাবে রুশ রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা উৎক্ষেপণব্যবস্থাকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। ইউক্রেনের দাবি, বছরের শুরু থেকে ১৬৬টি রুশ বিমান প্রতিরক্ষা–সম্পর্কিত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে তারা। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর এ সংখ্যা ১ হাজার ৪৩২ ছাড়িয়েছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত যুদ্ধবিমান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার জন্য তৈরি। তুলনামূলক ছোট ও ধীরগতির ড্রোন শনাক্ত ও অনুসরণে এসব ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক থমাস উইথিংটন বলেন, বর্তমান সময়ের ড্রোন হামলা মোকাবিলায় রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উপযুক্ত নয়। তাঁর মতে, বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে নতুন প্রযুক্তি সংগ্রহেও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে মস্কো। ফলে নতুন ও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত গড়ে তোলা দেশটির জন্য সহজ নয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া এখনো বিপুলসংখ্যক ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হচ্ছে। শুক্রবার রুশ সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা দেশজুড়ে ২১৬টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে।

ইউক্রেনের মানববিহীন ব্যবস্থা বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ব্রোভদির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মস্কোতে ১০০টির বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ৫০টির বেশি ‘প্যান্টসির’ মোবাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন ছিল।

তবে এক হামলায় ১০০টির বেশি ড্রোন ব্যবহার করা হলে কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন দিক থেকে একযোগে আসা শত শত ড্রোন প্রতিহত করতে অত্যন্ত জটিল সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়, যা সব সময় কার্যকরভাবে সম্ভব হচ্ছে না।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও দেশটির প্রকৃত মজুত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে নেই। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইউক্রেন যদি একই মাত্রায় হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত