জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

‘আমাদের ক্যাম্পাস ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু বেঁচে আছে বিশ্ববিদ্যালয়’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

গাজায় চলমান যুদ্ধ ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে একটি যৌথ খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন গাজার তিনটি প্রধান অলাভজনক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে, আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়, আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় (গাজা), এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা। এই তিন প্রতিষ্ঠান একত্রে গাজার সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব করে। এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট যথাক্রমে আয়মান সাবহ, ওমর মিলাদ এবং আসাদ আসাদের স্বাক্ষরিত বিবৃতি নিচে তুলে ধরা হলো:

আমরা গাজার তিনটি অলাভজনক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একত্রে গাজার সিংহভাগ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের প্রতিনিধিত্ব করে। গাজায় এই বীভৎসতার সময়ে আন্তর্জাতিক একাডেমিক সমাজের উদ্দেশে আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ বিবৃতি দিচ্ছি।

ইসরায়েলের চলমান গণহত্যামূলক যুদ্ধ আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার উপর এক সুপরিকল্পিত আঘাত হেনেছে। একে আমরা বলছি ‘স্কলাস্টিসাইড’। অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃত ও ধারাবাহিকভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, এর অবকাঠামো, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা।

এই ধ্বংসযজ্ঞ দুর্ঘটনাজনিত বা অনিচ্ছাকৃত নয়। এটি লক্ষ্যভিত্তিক প্রচেষ্টা, যার উদ্দেশ্য হলো গাজার উচ্চশিক্ষার ভিত্তিকে মুছে ফেলা- যে ভিত্তি এতদিন ধরে দখলদারিত্ব ও অবরোধের মধ্যেও টিকে থেকেছে দৃঢ়তা, আশাবাদ এবং বৌদ্ধিক স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে।

ফিলিস্তিনজুড়ে একাডেমিক প্রতিষ্ঠান বহু দশক ধরে হামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে আমরা যে পরিস্থিতি দেখছি, তা এক ভয়াবহ রূপান্তরের দিক নির্দেশ করে। আগের সকল ধ্বংসের ঘটনাকে ছাপিয়ে গিয়ে এবার এটি পরিণত হয়েছে গাজার উচ্চশিক্ষার ভিত্তিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে ফেলার অপচেষ্টায়।

তবু, আমরা আমাদের অবস্থানে অটল। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা সংগঠিত হয়েছি এবং এই হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগ নিয়েছি।

অবকাঠামের দিক থেকে ক্যাম্পাস, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার এবং অন্যান্য বিভাগ ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। তবুও, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো টিকে আছে। কারণ আমরা শুধু স্থাপনা নই, আমরা একটি একাডেমিক সমাজ, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মীরা আছেন। যারা এখনো জীবিত, তাঁরা সচেতন ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধভাবে আমাদের কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।

২০২৪ সালের ২৯ মে ফিলিস্তিনি একাডেমিক ও প্রশাসকদের জারি করা ঐক্যবদ্ধ জরুরি বিবৃতিতে যেমন বলা হয়েছিল, ‘ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী আমাদের ভবন ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এখনো জীবিত।‘

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে, আমাদের শিক্ষক, কর্মী ও শিক্ষার্থীরা অকল্পনীয় কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের মূল দায়িত্ব— শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণ, অনাহার, ইন্টারনেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং চলমান গণহত্যার বিভীষিকা—কিছুই আমাদের মানসিক শক্তিকে ভাঙতে পারেনি। আমরা এখনো আছি, এখনো শিক্ষাদান চালিয়ে যাচ্ছি, এবং গাজার শিক্ষার ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার এখনো অটুট।

আমরা জরুরি ভিত্তিতে আমাদের বিশ্বব্যাপী সহকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানাই

  • একটি টেকসই ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য উদ্যোগ নিন। এই গণহত্যায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকা সকল প্রচেষ্টার অবসান ঘটান। কারণ এমন পরিস্থিতিতে কোনো শিক্ষাব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না।
  • গাজার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা ও সহায়তার জন্য অবিলম্বে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্যোগ নিন, কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলো ফিলিস্তিনি জনগণের টিকে থাকা এবং ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।
  • ‘স্কলাস্টিসাইড’কে (শিক্ষাব্যবস্থার উপর পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক আক্রমণ) একটি সংগঠিত যুদ্ধাপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিন। একই সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একাডেমিক কাঠামো ও সমাজের পুনর্গঠনে কৌশলগত ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করুন।

আমরা আন্তর্জাতিক একাডেমিক সমাজ, সহকর্মী, প্রতিষ্ঠান এবং বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানাই

  • অবরোধ ও ভয়াবহ ক্ষতির মধ্যেও আমরা যেন শিক্ষাদান ও গবেষণা চালিয়ে যেতে পারি, সে চেষ্টায় আমাদের পাশে থাকুন।
  • প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ও একাডেমিক স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়ে, আমাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বে গাজার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পুনর্গঠনের কাজে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোন।
  • আমাদের সঙ্গে একসাথে কাজ করুন। সরাসরি সংযুক্ত হোন এবং সহযোগিতা করুন সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে, যারা এখনো গাজায় একাডেমিক চর্চা ও সম্মিলিত বৌদ্ধিক প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছে।

গত বছর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে গাজার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জরুরি কমিটি গঠন করি। এই কমিটি আমাদের তিনটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কলেজগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি রয়েছে গাজার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।

এই কমিটি গঠিত হয়েছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্মূল করে ফেলার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং গাজার একাডেমিক সমাজের পক্ষে একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে।

এই কমিটি ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠন করেছে, যাতে করে আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণের জন্য একটি সমন্বিত, বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর কাঠামো তৈরি করা যায়।

আমরা বিশ্বের একাডেমিক সমাজগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই, আপনারা যেন এই আহ্বানের প্রেক্ষিতে নিজেদেরকে সংগঠিত করেন। প্রতীকী সংহতির সময় এখন পেরিয়ে গেছে। আমরা এখন চাই বাস্তবিক, কাঠামোবদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব।

সম্পর্কিত