‘নিরাপত্তা সঙ্গী’ খুঁজছে আমিরাত-সৌদি, ইরানই কী বিকল্প

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রতীকী ছবি।

উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে নিজেদের নিরাপত্তার হিসাবনিকাশ কষছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ৬০ দিনের সমঝোতার আওতায় যুদ্ধ আপাতত বন্ধ হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে চিন্তিত এই অঞ্চলের দেশগুলো। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা জোটের বহুমুখীকরণের দিকেও দ্রুত এগোবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যেই গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো নিজেদের সম্পর্ক বিস্তৃত করছে। যুদ্ধের সময় জিসিসি দেশগুলো ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

পুরোনো নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ

যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সামরিক জোট অদূর ভবিষ্যতে অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও সম্প্রসারিত হবে। উপসাগরীয় দেশগুলো বহু বছর ধরেই কিছু ইউরোপীয় দেশের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনে আসছে। একই সঙ্গে তারা রাশিয়া এবং চীনের সাথেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর তাদের এই বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি আরও বেশি সুসংহত হবে।

আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের গবেষক আন্না জ্যাকবস খালাফ বলেন, নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজার মানে এই নয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিতে চাইছে। তাঁর মতে, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা। তারা একই সঙ্গে ইরান এবং ইসরায়েল উভয়কেই চাপে রাখতে চায়।

আন্না জ্যাকবস আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় পাকিস্তানকে বসানো তাদের উদ্দেশ্য নয়। দেশগুলো নিজেদের অংশীদারত্ব বহুমুখী করতে চাইছে। সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর এবং পাকিস্তানকে নিয়ে ‘কোয়াড’ জোট গঠনের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা সেই লক্ষ্যেরই অংশ। পাশাপাশি তারা নিজেদের দেশীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে। দেশগুলো আরও বেশি স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে আগ্রহী।

ইরানের হামলা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সংকট

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ওই অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। এর বাইরেও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা এবং হোটেলের মতো বেসামরিক স্থানেও হামলা হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে তেহরান ও ওয়াশিংটন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করলেও উত্তেজনা থামেনি। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নেতৃত্বে ইরানি সামরিক বাহিনী বাহরাইন ও কুয়েতে মিসাইল এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সমঝোতা ভঙ্গ করে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলার জবাবেই ইরান এসব হামলা চালায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অঞ্চলে ইরান ছাড়াও ইসরায়েল বড় মাথাব্যথার কারণ। অনেক উপসাগরীয় দেশ ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতি এবং সামরিক অভিযানকেও নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।

গত বছর ইসরায়েল কাতারের রাজধানী দোহায় বোমা হামলা চালিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতার সময়ে হামাস নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই হামলা চালানো হয়।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারে চালানো ওই হামলায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কাতার যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান নন-ন্যাটো মিত্র। ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, এই হামলার বিষয়ে তিনি কোনো অনুমোদন দেননি এবং আগে থেকে কিছুই জানতেন না।

আন্না জ্যাকবস খালাফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের জবাবে আরব দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা হামলা জিসিসি সদস্যদের নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। এই সংঘাতের সময় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের ফলে এই অঞ্চলের কিছু দেশ উপলব্ধি করেছে, তারা আর যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে পারবে না। ইরান যুদ্ধ কিছু উপসাগরীয় দেশকে নিরাপত্তা গ্যারান্টার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে।

মার্কিন ঘাঁটির বিপরীত ফল এবং নতুন মিত্রের সন্ধান

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফটের গবেষক অ্যানেল শেলিনও একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, জিসিসি দেশগুলো এখন তাদের নিরাপত্তা জোটের বহুমুখীকরণের দিকে নজর দেবে। তারা চীন, তুরস্ক এবং ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করবে।

অ্যানেল শেলিন আল জাজিরাকে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে। তবে তারা আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই নির্ভর করতে চাইবে না।

তিনি বলেন, এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন নিরাপত্তা বলয় ইরানের হামলা ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি হামলার জন্য বাধা না হয়ে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

শত্রুর সাথে অর্থনৈতিক মেলবন্ধন

হামলার শিকার উপসাগরীয় দেশগুলোর ইরানের ওপর ক্ষোভ রয়েছে। তবুও তারা তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে। এমনকি নিরাপত্তা পর্যায়েও তাদের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একাধিক জিসিসি দেশ প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের উদ্যোগ নিচ্ছে। তারা অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার দিকেও পা বাড়াচ্ছে।

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অস্ত্রের চেয়ে বিনিয়োগ অনেক বেশি কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে। উপসাগরীয় দেশ এবং ইরানের অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায়, তবে তেহরান এই অঞ্চলে হামলা চালানোর আগে দ্বিতীয়বার ভাববে।

শেলিন বলেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো সম্ভবত ইরানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে চাইবে। বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর মতো খাতে তারা ইরানের সঙ্গে কাজ করতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অঞ্চলে আঘাত হানা ইরানের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি ‘আনহার্ড’ নামক একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই কৌশলের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারককে স্বাগত জানিয়েছে।

গত সপ্তাহে ভ্যান্স বলেন, জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে বেশি যুদ্ধংদেহী এবং ইসরায়েলপন্থী। সেই আমিরাতই আইআরজিসিসহ ইরানিদের সঙ্গে আলোচনা করছে। এই ধরনের আলোচনা আগে কখনো হয়নি। তারা বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা নিয়ে কথা বলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া এবং ইসরায়েলের আগ্রাসন

শেলিন বলেন, সমঝোতা স্মারক যদি ইরানের সঙ্গে স্থায়ী চুক্তির দিকে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অবশেষে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে আসবে। কিন্তু ইসরায়েল এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তারা উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও এই অঞ্চলের যুদ্ধে টেনে আনতে পারে। শেলিনের মতে, এখানকার সবচেয়ে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হলো ইসরায়েল।

শেলিন আরও বলেন, নেতানিয়াহু সরকার যেন কোনোভাবেই চুক্তি বানচাল করতে না পারে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের ওপর শক্ত চাপ প্রয়োগ করতে হবে। চুক্তি সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কিছুটা কমাতে পারবে। এর ফলে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর না করে, নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই পালন করার সুযোগ পাবে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ইসরায়েলের সামরিকবাদ ক্রমশ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য হুমকি। বিশেষ করে ২০২৫ সালের দোহা হামলা এবং ইরান যুদ্ধের পর এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।

আন্না জ্যাকবস খালাফ বলেন, এই অঞ্চলে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক অবস্থানে অনেক উপসাগরীয় দেশ হুমকি অনুভব করছে। যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ মেনে নেওয়া যায় না। ফিলিস্তিনি জমি দখল এবং এর সম্প্রসারণ সবার জন্য উদ্বেগের।

লেবানন ও সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের ধারাবাহিক আক্রমণ সব উপসাগরীয় দেশের কাছে অগ্রহণযোগ্য। যেসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল, তারাও এখন এই আগ্রাসন মেনে নিতে পারছে না।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত