মার্কিন স্থল অভিযানের শঙ্কা, ইরানও প্রস্তুত আক্রমণে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৪০
মার্কিন স্থল অভিযানের শঙ্কা, ইরানও প্রস্তুত আক্রমণে। স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) শেষ হওয়ার পরপরই নতুন বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় ধরনের বদল এনে এখন আরও আক্রমণাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদুল্লাহ জাভানি জানান, দেশ রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে তাদের বাহিনী প্রস্তুত।

মে মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান 'ইসলামাবাদ স্মারক' সই করেন। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেই এই চুক্তি হয়েছিল। পরমাণু কর্মসূচির মতো ইস্যুগুলোকে পরে আলোচনার জন্য রেখে চুক্তিতে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

স্মারকে বলা হয়েছিল, ৬০ দিনের মধ্যে ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হবে। এই চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত হবে এবং উভয় পক্ষের সম্মতিতে এর মেয়াদ বাড়ানো যাবে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) সমঝোতার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে কোনো পক্ষই সমঝোতার মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়নি।

জাভানি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ আগে যুদ্ধ শুরু করেছে। এত দিন আমরা আত্মরক্ষা করেছি। এখন আমরা আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে পারি।’

তবে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনার কথা তিনি প্রকাশ করেননি। প্রতিপক্ষের জন্য বড় ধরনের চমক (স্ট্র্যাটেজিক সারপ্রাইজ) অপেক্ষা করছে বলে সতর্ক করেন তিনি।

হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে গত সপ্তাহে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেন মোহেব্বি জানান, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় আঘাতের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থায় আক্রমণ হবে।

ইরানের গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাহরাইন ও কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা স্থল হামলা চালানো হতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষকরা এমন অভিযানের বাস্তবায়ন ও ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে ইরানে কোনো স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে এমন কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি গত সপ্তাহে আইআরজিসির পুরোনো ও বিশ্বস্ত কমান্ডারদের সামরিক ও নিরাপত্তার শীর্ষে বসিয়েছেন। সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তনের পরই আক্রমণাত্মক প্রতিরোধ ব্যবস্থা (অফেন্সিভ ডিট্যারেন্স) গড়ে তোলার ঘোষণা আসে।

আইআরজিসির নতুন প্রধান মেজর জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিকে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা। নির্দেশনায় শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের প্রস্তুতি রাখার কথা বলা হয়েছে।

ওয়াহিদি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সুসজ্জিত সেনাবাহিনীকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধে ইরান হেরে গেছে। সাগরে নৌ-অবরোধ দিয়ে ইরানকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা হয়েছে। হরমুজকে খুব দ্রুত আমেরিকার ভূখণ্ড ঘোষণা করা হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। হোয়াইট হাউস পরে দাবি করে এই কথা ট্রাম্প ‘কৌতুক’ করে বলছেন।

জবাবে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি ঘোষণা করেছেন, তাঁদের ভূখণ্ডে কোনো মার্কিন সেনা নামলে তাকে হত্যা বা বন্দি করলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। কোনো নারী এই কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ অর্থ দেওয়া হবে।

হাতামি বলেন, ‘আগ্রাসনকারীদের আঘাত করার সব পথ খোলা রয়েছে।’

সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই ভিন্ন দাবি করেছেন। রেজাইয়ের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে স্থল অভিযানের কথা ভাবছিল। অপরিপক্ব পরিকল্পনার কারণে তারা পিছিয়ে গেছে।

রেজাই জানান, জুলাইয়ে দুই সপ্তাহের উত্তেজনার সময় মার্কিন বাহিনী তেহরান বা উত্তরাঞ্চলে হামলা করেনি। ১৫টি প্রদেশের প্রায় ৫০টি শহরে বোমাবর্ষণ করেছে। দক্ষিণ ইরানের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছিল। সড়ক, সেতু, সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, রাডার ও উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়।

রেজাইয়ের ধারণা, হরমুজ প্রণালি দখল এবং ইসফাহানের পরমাণু কেন্দ্রে পৌঁছানোর জন্য স্থল হামলার পথ তৈরিই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

রেজাই বলেন, ‘হরমুজে সেনা নামাতে অন্তত এক লাখ সৈন্যের প্রয়োজন। চল্লিশ বা পঞ্চাশ হাজার সৈন্য দিয়ে সম্ভব নয়। জাগ্রোস পর্বতমালা ও ফার্স প্রদেশ পার হওয়া সহজ নয়।’

ইরানের সামরিক বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল ও দ্বীপগুলো রক্ষায় বড় প্রস্তুতি নিয়েছে। খার্গ দ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনালে নিরাপত্তা জোরদার হয়েছে। হরমুজের চারপাশে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বিশেষ সেনা পাঠানো হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির সামরিক মুখপাত্র মোহাম্মদ-রেজা আকরামিনিয়া বলেন, ‘আমাদের মাটিতে বিদেশি সেনাদের নামতে দেওয়া হবে না। মার্কিন বাহিনী আমাদের কোনো দ্বীপে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে আঘাত করা হবে।’

অন্যদিকে ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ঠেকাতেও প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। ইরাকের কুর্দিস্তানে থাকা সশস্ত্র দলগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে আইআরজিসি।

সোমবার আইআরজিসির রাজনৈতিক প্রধান জাভানি জানান, ইসলামাবাদ সমঝোতার শর্ত যদি যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি মানে তবেই কেবল হরমুজ সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সমঝোতা চুক্তিতে দুই মাসের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে যুদ্ধের জন্য বড় সংকট মনে করছে না তেহরান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই সাংবাদিকদের জানান, কোনো হুমকি বা আল্টিমেটামে ইরান নীতি পরিবর্তন করে না। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার হিসাব মাথায় রেখেই সব সিদ্ধান্ত হয়।

হরমুজ প্রণালি আংশিক খুলে দেওয়ার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং কিছু পক্ষের বাধা সৃষ্টির কারণে সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

মার্কিন স্থল অভিযানের শঙ্কা, ইরানও প্রস্তুত আক্রমণে