হাকালুকির বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন পানির নিচে, হাল ছেড়েছেন কৃষকরা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ০৯: ৩৭
হাকালুকির বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন পানির নিচে। স্ট্রিম ছবি

টানা কয়েকদিনের কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকির বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন পানির নিচে। মৌলভীবাজারের এই হাওরের কৃষকেরা গত কয়েকদিন ধরেই বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান রক্ষায় সবধরনের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কেউ নৌকায়, কেউ বা কলাগাছের ভেলায় ভর করে কেটেছেন ধান। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে এই অসম লড়াইয়ে অনেকেই এরইমধ্যে হার মেনেছেন।

হাওরের দক্ষিণ তীরঘেঁষা কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল, জয়চন্ডী ও কাদিপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে—কৃষকেরা কাটা ধান পাশের সড়কে স্তূপ করে রেখেছেন। কিন্তু রোদ না থাকায় সেই ধানে পচন ধরছে, কোথাও কোথাও নতুন অঙ্কুরও গজিয়েছে। মাড়াইয়ের জন্য অপেক্ষা করলেও শ্রমিক ও যন্ত্র সংকটে সেই আশাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ধান রক্ষার আশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক কৃষক। স্ট্রিম ছবি
ধান রক্ষার আশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক কৃষক। স্ট্রিম ছবি

জয়চন্ডী ইউনিয়নের মীরশংকর গ্রামের কৃষক মান্নান মিয়া, রইছ আলী, লতিফ মিয়া ও আব্দুল করিমসহ আরও অনেকেই এমন ভুক্তভোগী। তারা জানান, এক সপ্তাহ আগে কাটা ধান এখনো মাড়াই করা যায়নি। ‘মেশিন নেই, শ্রমিকও নেই। এর মধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে ধান। এখন আর কিছু করার নেই’,—হতাশ কণ্ঠে বলছিলেন মান্নান মিয়া।

একই সুর কাদিপুর ইউনিয়নের মতু মিয়ার কণ্ঠেও। তাঁর ভাষায়,‘'ধানের দাম কম, কিন্তু কাটতে খরচ বেশি। এক বিঘা ধান ঘরে তুলতে ৬-৭ হাজার টাকা লাগে। শ্রমিকের মজুরি হাজার টাকার ওপরে। এ অবস্থায় ধান রেখে লাভ কী!’

শুধু মীরশংকর বা কাদিপুর নয়—সাদিপুর, কোরবানপুর, মহেষগোরী, বড়দল, গৌড়করণ, আলীনগর, শেরপুরসহ অর্ধশতাধিক গ্রামের কৃষকের একই হতাশা। তাদের অনেকেই বলছেন, এই বোরো ধানই সারা বছরের ভরসা। এবার মনে হয় না খেয়ে থাকতে হবে।

ধান কাটলেও মাড়াই করতে পারছেন না অনেক কৃষক
ধান কাটলেও মাড়াই করতে পারছেন না অনেক কৃষক

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কুলাউড়ায় মোট ৮ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ৪ হাজার ৮০৫ হেক্টর। ইতোমধ্যে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় ৩৮০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিকভাবে প্রায় তিন হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

ভূকশিমইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, তাঁর ইউনিয়নেই অর্ধেকের বেশি বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন। কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘হাওর এলাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হলেও গ্রামাঞ্চলে তা ৬৫ শতাংশের মতো। অনেক আধাপাকা ধান এখনও পানির নিচে রয়েছে।’

রোদ না থাকায় শুকানো যাচ্ছে না ধান
রোদ না থাকায় শুকানো যাচ্ছে না ধান

তিনি বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়া ও হঠাৎ পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দ্রুত ধান সংগ্রহে কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন কাজ করছে।’

এদিকে, সরকারিভাবে কুলাউড়ায় বোরো ধান সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্রতি মণ ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা এবং একজন কৃষক সর্বোচ্চ তিন টন ধান বিক্রি করতে পারবেন। এবারের সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৩৫ টন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি—আগাম বন্যা থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। তাদের মতে, সময়মতো বাঁধ মেরামত, আধুনিক যন্ত্রের সহজলভ্যতা ও শ্রমিক সংকট নিরসন করা গেলে প্রতি বছর এমন দুর্ভোগে পড়তে হতো না।

সম্পর্কিত