ফিরে দেখা জুলাই

এখনো গ্রেপ্তার হননি শহীদ ওয়াসিম হত্যার প্রধান অভিযুক্ত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট ও বহদ্দারহাটজুড়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছিল। সেদিন বিকেলে মাথা ও বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম। পরিবারের দাবি, বিচার চলছে ঢিমেতালে, গ্রেপ্তার হননি প্রধান অভিযুক্তও।

সহপাঠী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই দুপুরের পর থেকেই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা শুরু হয়। প্রথমে লাঠিচার্জ, পরে গুলিবর্ষণ। বিকেল চারটার দিকে বহদ্দারহাট এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা দ্রুত তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ১৭ জুলাই চট্টগ্রামে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন নিজ গ্রাম মেহেরনামায় দ্বিতীয় জানাজার পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেহেরনামা গ্রামের ছেলে ওয়াসিম ছিলেন বাবা শফিউল আলম ও মা জ্যোৎস্না বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। মেহেরনামা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং বাকলিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষে ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে। এই তরুণের স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় যাওয়া। সেই স্বপ্ন আর বাস্তবের মুখ দেখেনি। মৃত্যুর প্রায় তিন মাস পর প্রকাশিত অনার্স তৃতীয় বর্ষের ফলাফলে জানা যায়, ওয়াসিম প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

ওয়াসিম বলেছিলেন—এলাকায় ছাত্রলীগ অবস্থান নিয়েছে, স্থান পরিবর্তন প্রয়োজন

ওয়াসিম আকরাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের চট্টগ্রাম কলেজ শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তাঁর বন্ধু তৌহিদুল ইসলাম স্ট্রিমকে জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং নগরীর প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। পরিস্থিতি যতই উত্তপ্ত হয়েছে, তিনি ততই দৃঢ় থেকেছেন।

ওয়াসিমকে অভিভাবকতুল্য উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘১৬ জুলাই দুপুরে তাঁদের ষোলশহর রেলস্টেশনের পাশে কর্মসূচি করার পরিকল্পনা ছিল। সে সময় ওয়াসিম ফোন করে সতর্ক করেন যে এলাকায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছে, তাই স্থান পরিবর্তন করা প্রয়োজন। পরে আন্দোলনকারীরা মুরাদপুর মোড়ে অবস্থান নেন। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের সম্মিলিত হামলার মধ্যেও আন্দোলনকারীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থানকালে গুলিবিদ্ধ হন ওয়াসিম।’

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে নিজের ফেসবুকে দেওয়া শেষ স্ট্যাটাসে ওয়াসিম লিখেছিলেন, তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে তাঁর সংগঠনের পরিচয়ে শহীদ হতে চান। সেই স্ট্যাটাসের প্রায় ১৬ ঘণ্টা পরই গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবার ও সহযোদ্ধাদের কাছে সেই লেখাটি আজও এক বেদনাময় স্মৃতি।

মূল অভিযুক্ত গ্রেপ্তার না হওয়ায় পরিবারের ক্ষোভ

ওয়াসিমের মৃত্যুর পর তাঁর মা জ্যোৎস্না বেগম বাদী হয়ে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং স্থানীয় কয়েকজনকে আসামি করা হয়। মামলার এক অভিযুক্ত ফটিকছড়ির সুয়াবিল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জাহেদ গ্রেপ্তার হলেও পরিবারের দাবি, মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত চকরিয়ার রাশেদ এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

বাবা শফিউল আলম স্ট্রিমকে বলেন, তাঁর দাবি শুধু নিজের সন্তানের জন্য নয়; যেসব পরিবার সন্তান হারিয়েছে বা আহত হয়েছে, সবার পক্ষ থেকেই তিনি প্রকৃত হত্যাকারী, পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারপ্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে ওয়াসিমের আত্মত্যাগ স্মরণে বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ লালখান বাজার-শাহ আমানত বিমানবন্দর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নামকরণ করেছে তাঁর নামে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নগরীর আমবাগানের শেখ রাসেল পার্কের নাম পরিবর্তন করে রেখেছে ‘শহীদ ওয়াসিম আকরাম পার্ক’। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের উদ্যোগে তাঁর প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত