আন্তর্জাতিক নির্মল বায়ু দিবস আজ

সংরক্ষিত বনের পাশে কয়লার বিদ্যুৎ, দূষণ মাপার হিসাব নেই তালতলীতে

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বরিশাল

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ২২
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

একদিকে বাজার ও সংরক্ষিত টেংরাগিরি বনাঞ্চল। রয়েছে স্কুল ও ঘনবসতি। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পায়রা (বুড়িশ্বর) নদী। এই নদীর তীরেই বরগুনার তালতলীর জয়ালভাঙায় ৩৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে দেশীয় কোম্পানি আইসোটেক গ্রুপ। নদীপথেই আসে কেন্দ্রটির কয়লা। বাজার থেকে কেন্দ্রটির দূরত্ব দেড় কিলোমিটারের কিছু বেশি।

২০১৩ সালে উদ্যোগ নেওয়ার পর ২০২২ সালে কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খোলা জাহাজে কয়লা পরিবহন ও খালাসের সময় বাতাসে প্রচুর ধুলা ও কয়লার কণা ছড়ায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর তৈরি হওয়া ছাই নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর তালতলী বাজারের বাতাসে কতটা দূষণ ছড়িয়েছে, সরকারি কোনো তথ্যভান্ডারে তার উত্তর নেই।

রাষ্ট্রের চাপে ছাড়পত্র ছাড়াই কাজ

পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের সাবেক এক সহকারী পরিচালক জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাজ শুরু হয়েছিল অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের চাপে আমরা অনেক কিছু এড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। পরে ২০১৯ সালে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) প্রতিবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়।’

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সমীক্ষায় দেশের দ্বিতীয় সুন্দরবনখ্যাত টেংরাগিরি বন, আন্ধারমানিক ইলিশ অভয়ারণ্য ও গোরাপদ্মার সবুজ বেষ্টনীর ক্ষতির ঝুঁকিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ এগুলো প্রকল্প এলাকা ঘেঁষেই অবস্থিত।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণাতেও প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা শর্ত অমান্যের প্রমাণ মিলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পসংলগ্ন এলাকায় স্লুইসগেট বন্ধ ও খাল ভরাট করা হয়েছে। এক কিলোমিটার এলাকার নিরাপত্তা বিধিনিষেধ অমান্য করে শুভসন্ধ্যা সৈকত থেকে বালু তোলা হয়েছে। এমনকি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশে বরগুনা জেলা প্রশাসন নদীর জায়গা ভরাট বন্ধ করলেও সেখানেই নির্মিত হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি!

আগের হিসাব আছে, পরের নেই

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগে ২০১৮ সালের এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরে তালতলী বাজারে বায়ুর মান পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই বছরের এপ্রিলের হিসাবে, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম-২.৫ ছিল ৪১ দশমিক ৮৭ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম-১০ ছিল ৬৪ দশমিক ০১ মাইক্রোগ্রাম। সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইডের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২৪ দশমিক ০৬ এবং ২২ দশমিক ৭০ মাইক্রোগ্রাম। বর্ষায় (সেপ্টেম্বর) এই মাত্রা কিছুটা কমে আসে।

কিন্তু কেন্দ্রটি ২০২২ সালে উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে তালতলী বাজারের বাতাসে দূষণের মাত্রার কোনো হালনাগাদ তথ্য আর প্রকাশ্যে আসেনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, ‘২০১৮ সালে পিএম-২.৫–এর মাত্রা ৪১ মাইক্রোগ্রামের আশপাশে ছিল। এখন সেটি কত হয়েছে, তা জানার উপায় নেই। কেন্দ্র চালুর পর দূষণ বেড়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে নিয়মিত বায়ুমান পরিমাপের তথ্য দরকার। সেটাই আমাদের কাছে নেই।’

গত ৩ জুলাই বেলার একটি প্রতিনিধিদল কেন্দ্র এলাকায় যায়। তারা সেখানে খোলা অবস্থায় কয়লা পরিবহন এবং নদীর তীরে ছাই ফেলার দৃশ্য দেখেছে। এসবের ছবি ও ভিডিও তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে।

ইলিশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আগেই ছিল সতর্কতা

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইআইএ প্রতিবেদনে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, নদীতে জাহাজ চলাচলের শব্দ ইলিশের জীবনচক্রে প্রভাব ফেলবে। নদীর গতিপ্রবাহ বদলে ডিম ঝুঁকির মুখে পড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে জলজ প্রাণীর আবাস। কিন্তু বাস্তবে সেই সতর্কবার্তা মানা হয়নি।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মো. রাজীব সরকার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন নদীতে ভারী ধাতু নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, কয়লার ছাই খোলা জায়গায় রাখলে বৃষ্টির পানি বা জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে তা নদীর পানিতে মিশতে পারে। নদীর তলানিতে ভারী ধাতু জমা হলে তা ক্ষুদ্র প্রাণী ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে। ইলিশের মতো মাছের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত চাপ তৈরি করতে পারে।

কয়লার পথ ও ছাই ব্যবস্থাপনা

২০১৮ সালের সমীক্ষাতেই সম্ভাব্য বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে নৌযানের ধোঁয়ার কথা বলা হয়েছিল। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়লাবাহী বড় বড় নৌযান।

তালতলীর পরিবেশকর্মী মো. মোস্তাফিজ বলেন, কয়লা পরিবহন ও খালাসের পুরো প্রক্রিয়ায় উড়ন্ত ধুলা নিয়ন্ত্রণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমানের অভিযোগ, নদীর তীরে ছাই ফেলার কারণে বায়ুদূষণ হচ্ছে কি না, তা-ও বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা দরকার।

কর্তৃপক্ষের নীরবতা

সমীক্ষা অনুযায়ী, কেন্দ্র থেকে কাছের তালতলী বাজার, জয়ালভাঙা বাজার এবং ছোট অংকুজানপাড়াকে গুরুত্বপূর্ণ বায়ুমান পর্যবেক্ষণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকায় নিয়মিত বায়ুমান পরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে।

এ বিষয়ে বরগুনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হায়াত মাহমুদ রকিবের হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি। কল করলেও ধরেননি। অন্যদিকে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সাংবাদিকেরাও কখনো কর্তৃপক্ষের নাগাল পান না বলে জানিয়েছেন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত