মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ/বদরুদ্দীন উমরের দৃষ্টিতে ‘সাম্প্রদায়িকতা’

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বদরুদ্দীন উমরের প্রথম বই ‘সাম্প্রদায়িকতা’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। প্রথম সংষ্করণের ভূমিকায় তিনি জানিয়েছিলেন যে লেখাগুলো ইতিপূর্বে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘পূর্বমেঘ’ এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘জনতা’য় ছাপা হয়েছে। ১৯৬৪ সালে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় ১৭ দিনের জন্য। উমর এই সময়কালের ঘটনাগুলোকে সামনে রেখেই বইটি লিখেছিলেন। মোট ছয়টি পরিচ্ছেদে সম্পূর্ণ বইটি প্রকৃতপক্ষে ছয়টি প্রবন্ধের সংকলন। বিচ্ছিন্নভাবে লেখা বলে প্রবন্ধগুলোর মধ্যে পুনরোক্তি দোষ আছে, লেখাগুলো অধ্যায়ের নামকরণের সঙ্গে সর্বত্রই প্রাসঙ্গিক হয়নি।

প্রথম বই বলেই হয়তো উমর প্রারম্ভে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন, এই বইতে যা লেখা হয়েছে তাতে কোনো নতুন কথা নেই। ‘কোনো পাঠক এই বইয়ের মধ্যে যদি নতুন তথ্যের সন্ধান করেন তবে নিরাশ হবেন।’ প্রথম অধ্যায়ে সম্প্রদায়িকতার সংজ্ঞার সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়া হয়েছে এভাবে:

ধর্ম এবং সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে যোগসম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মনিষ্ঠা স্বতন্ত্র জিনিস। ... ধর্মের আচার বিচার এবং তত্ত্বের প্রতি নিষ্ঠা থাকলে তাকে আমরা বলি ধর্মনিষ্ঠা।… কোন ব্যক্তির মনোভাবকে তখনই সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেওয়া হয় যখন সে এক বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্তির ভিত্তিতে অন্য এক ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং তার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধাচরণ এবং ক্ষতি সাধন করতে প্রস্তুত থাকে।... এছাড়া সত্যিকার ধর্মনিষ্ঠা পরকালমুখী। … সাম্প্রদায়িকতার মুনাফা ইহলোকে।

(সাম্প্রদায়িকতা / পৃ: ১)

সম্ভবত ১৯৬৬ সালে উমরের দেওয়া সাম্প্রদায়িকতার এই সংজ্ঞা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে নাই। বাংলাদেশে ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘জাতীয়তাবাদ’, অথবা ‘গোষ্ঠীবাদ’— এই সব শব্দের প্রকৃত অর্থ কী হতে পারে তা নিয়ে আজও সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি। যারা এ বিষয়ে লেখেন, তারাও আমাদের দেশের সাধারণ জনগণের প্রচলিত ধারণাকে মেনে নিয়েই আলোচনা করেন। যাই হোক, উমরও সাম্প্রদায়িকতার মৌলিক অর্থের ব্যাপ্তির দিকে না গিয়ে ভারতবর্ষে নেতিবাচক অর্থে যে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়, সরাসরি সেই প্রক্রিয়াতেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি আলোচনা করেছেন। সেই অর্থে তার ব্যাখ্যায় সাম্প্রদায়িকতা শুধু ধর্মীয় কারণেই হয়, এবং ‘অন্য এক ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং তার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধাচরণ এবং ক্ষতি সাধন’—এর জন্যই সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করা হয়ে থাকে বলে বিবেচিত হয়। আমাদের দেশে নেতারাও এটাই বোঝেন, বুদ্ধিজীবীরাও সেই বক্তব্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না এবং জনগণকে সাম্প্রদায়িকতার বৃহত্তর অর্থের ব্যাপ্তির সঙ্গে পরিচিত হতে দেন না।

বদরুদ্দীন উমরের লেখা প্রথম বই ‘সাম্প্রদায়িকতা’। ছবি: সংগৃহীত
বদরুদ্দীন উমরের লেখা প্রথম বই ‘সাম্প্রদায়িকতা’। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রদায়িকতা যে ধর্ম ছাড়াও জাতিগত, বিশ্বাস, ভাষা, মূল্যবোধ ইত্যাদিকে ভিত্তি করেও হতে পারে, কিংবা সাম্প্রদায়িকতারও যে আদর্শিক, ঐতিহ্যিক, ভৌগোলিক ন্যায্য স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে— সাম্প্রদায়িকতা শুধু জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিই করে না, অনেক ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের মাধ্যমে জাতীয় শক্তির সৃষ্টি করে—এই বিবেচনাগুলো আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের আলোচনার মধ্যে খুব একটা পাওয়া যায় না।

উমরের ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বইটির প্রশংসা হয়েছে যেখানে, সেখানে যেমন এই সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়নি, আর যারা সমালোচনা করেছেন তারাও এর বিষয়টি উল্লেখ করেননি। উমর তাঁর বইটি সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে:

সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে পাক-ভারতীয় উপমহাদেশের অগণিত বিশ্বাসপ্রবণ, সৎ এবং দরিদ্র মানুষ শ্রেণী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কি জঘন্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে, সেকথা জনসাধারণ যদি উপযুক্তভাবে উপলব্ধি করেন, তাহলে এদেশের রাজনীতি অনেকখানি সুস্থ পথে চালিত হওয়ার সম্ভাবনা। এব্যাপারে এই বই খানি যদি সামান্য কাজে লাগে তাহলেই নিজেকে পুরস্কৃত এবং কৃতার্থ বোধ করব।

(সম্প্রদায়িকতা / প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধ)

ধর্মের বাইরে এসে সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্য বিচারের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতা যে বিভাজন নয়, উমর নিজেই সেটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্বরূপ অন্বেষণ করতে গিয়ে বলেছেন:

ভারতীয় হিন্দুর সাংস্কৃতিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভারতীয় মুসলমানের সাধারণ সাংস্কৃতিক জীবনের ধারণাকে প্রমাণাভাবে অলীক কল্পনা বলেই মনে হয়। কিন্তু এই অলীক কল্পনা স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষের রাজনৈতিক জীবনে এত প্রতাপশালী হল কেমন করে। রাজনৈতিক সমাজতন্ত্রের এটা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং এ প্রশ্নের মাধ্যমেই পাকিস্তান আন্দোলনের ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের চরিত্র যথাযথভাবে উদঘাটিত হওয়া সম্ভব।

উমর তাঁর গ্রন্থের পরবর্তী দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পরিচ্ছেদে সাম্প্রদায়িকতার জন্য ধর্মীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব কীভাবে হয়, তার বর্ণনা দিয়ে সরাসরি মুসলিম জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মুসলিম সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সম্পর্কের স্বরূপটি ব্যাখ্যা করেছেন, একই সঙ্গে উনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ আবিষ্কৃত হিন্দু ধর্মের নবলব্ধ চেতনা নিয়ে কীভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হলো তারও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু ‘ভারতবর্ষে ব্রিটিশের ক্ষমতা দখল ও হস্তান্তর’—এই প্রবন্ধে এসে উমর প্রথম ১৯৪৭ সালের পূর্ববঙ্গ-পশ্চিমবঙ্গের ভাগাভাগি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করেন।

বাঙলাদেশের রাজনীতিতে একটা, স্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তা বরাবরই ছিল। উনিশ শ' বিশের দিকে চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে বাঙলা কংগ্রেসের মাধ্যমে এই চিন্তা কিছুটা স্পষ্টতর রূপ নেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে একটা সম্পূর্ণ পৃথক রাষ্ট্র স্থাপনের কথা তাঁরাও কোনোদিন বলেননি।

উমর এই বইতে ১৯৬৬ সালের তৎকালীন বাংলাদেশের অধিবাসীদের মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৪৭ সালের প্রথম দিকে পূর্ববঙ্গ-পশ্চিমবঙ্গের ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ।

ভাষার ভিত্তিতে বাঙলাদেশে একটা পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন সর্বপ্রথম শুরু হয় ১৯৪৭-এর প্রথম দিকে। এই আন্দোলনকে বিশ্লেষণ করলে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের সত্যকার চরিত্র বিশ্লেষণের সুবিধা হবে এবং কংগ্রেসের ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও মুসলিম লীগের ‘সাম্প্রদায়িক’ রাজনীতির মূলসূত্রও ভালোভাবে উদঘাটিত হবে। মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব। কংগ্রেসের অখণ্ড ভারতের তত্ত্বগত ভিত্তি ছিল ভারতীয় জাতীয়তা। বাঙলা ভাগের আন্দোলনের সময় বস্তুতপক্ষে কংগ্রেস লীগের এই দুই তত্ত্বই সামন্ত-বুর্জোয়া স্বার্থের অন্তর্নিহিত তাগিদে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে পড়ে। ১৯৪৭-এর ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাঙলা’ আন্দোলনের সূত্রপাত হয় মুসলিম লীগ নেতৃত্বের দ্বারা। পাকিস্তান আন্দোলনকালে বাঙলা ভাগের কথা পূর্বে তাঁরা চিন্তা করেননি। কিন্তু ভারত বিভাগ যখন অবধারিত হলো তখন ভারতীয় ব্রিটিশ সরকারের প্ররোচনায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী আওয়াজ তুললেন বাঙলাদেশ ভাগ করার।

হাস্যজ্জ্বল বদরুদ্দীন উমর। ছবি: রুমীয়া রুমী
হাস্যজ্জ্বল বদরুদ্দীন উমর। ছবি: রুমীয়া রুমী

কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক নেতাদের পরিচালিত করতেন ভারতের মাড়োয়ারী-মারাঠী-গুজরাটি বণিক সম্প্রদায়। তাদের দুরভিসন্ধিতে পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব বঙ্গের নোয়াখালীতে প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ইন্ধন যোগান এবং বাংলা ভাগ করা হয়।

২.

‘সাম্প্রদায়িকতা’ বইটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক কারণে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন:

‘সাম্প্রদায়িকতা’ বইটি ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামষ্টিক রাজনৈতিক মানস সৃষ্টিতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। উনসত্তরের কিংবা মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব গণ-আন্দোলনে বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মূল্যবোধ সৃষ্টিতে এর যথেষ্ট প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় এই বইটি এবং এর বর্ধিত ব্যাখ্যার অংশটি, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’র অনেক উদ্ধৃতি প্রাসঙ্গিক হয়ে ছিল।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো উমরের জীবদ্দশায় বইটির কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। উমর প্রায় প্রতিটি সংস্করণে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতা চর্চার ওপর তার নিজস্ব মতামত দিয়েছেন এবং এ প্রসঙ্গে নানাবিধ উদাহরণ দিয়ে যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন। এইসব সংস্করণের মধ্যে দিয়ে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা চর্চার বিভিন্ন পর্বে বদরুদ্দীন উমরের পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্যগুলো অনেক ধরনের বাস্তবতাকে ঐতিহাসিক সময়রেখায় প্রমাণিত করে।

যেমন: ১৯৬৬ সালের প্রথম সংষ্করণে বদরুদ্দীন উমর তৎকালীন পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িকতার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রথমেই পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তব্য উদ্ধৃত করে পাকিস্তানের অসাম্প্রদায়িক যাত্রার কথা বলেছিলেন।

অথচ এই বইতেই উমর বলেছেন:

এ জন্যই স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষে যে কারণে হিন্দু মুসলমান কংগ্রেস নেতারা অখণ্ড ভারত এবং একজাতি তত্ত্বের কথা বলেছিলেন ঠিক সেই জন্যই কায়েদে আজমও স্বাধীনতার পর এমনকি পূর্বেই বলেছিলেন পাকিস্তানের অখণ্ডতা এবং এক জাতিত্বের কথা। দুই বিভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিবেশে একই ব্যক্তির এই দ্বিবিধ মনোভাব আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত মনে হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকে বিচার করলে সেটাকেই মনে হবে সব থেকে স্বাভাবিক এবং রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত।

(সাম্প্রদায়িকতা / পৃ:২৫)

১৯৬৬ সালে উমর পাকিস্তানকে একটি ধর্ম-নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে দেখেছেন। তার বক্তব্য ছিল, ‘এদিক থেকে ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান অন্যান্য যে-কোনো জাতীয় রাষ্ট্রের মতই নিঃসন্দেহে ধর্মনিরপেক্ষ’।

পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে ইসলাম ধর্মের গৌরব বর্ধন করতে কতখানি সমর্থ হয়েছে সেটা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তান যে মুসলমান মধ্যবিত্তের শ্রেণীস্বার্থ প্রতিষ্ঠায় অনেকখানি সফল হয়েছে সে বিষয়ে তর্কের কোনো অবকাশ নেই। এদিক থেকে ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান অন্যান্য যেকোনো জাতীয় রাষ্ট্রের মতোই নিঃসন্দেহে ধর্মনিরপেক্ষ।

১৯৬৬ সালে তিনি বলেছিলেন যে পাকিস্তানের সরকারি কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় বিবেচনা খুব সক্রিয় ছিল না। বাস্তব জীবনের ক্ষেত্রে যা কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে তাদের কোনোটিই কিন্তু ধর্ম চিন্তার ফল নয়।

স্বাধীনতার পর থেকে (পাকিস্তান পর্বে) আজ পর্যন্ত পাকিস্তানের বাস্তব জীবন ক্ষেত্রে যা কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে তাদের কোনোটিই কিন্তু ধর্ম চিন্তার ফল নয়। সরকার পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ধর্মকে নানাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় জীবন বাস্তবত ধর্মীয় নির্দেশে নিয়ন্ত্রিত হয়নি। এ দেশের (অর্থাৎ তৎকালীন পাকিস্তানের) মুখ্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনসমূহ-যেমন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন, বন্দীমুক্তি আন্দোলন, শিল্পোন্নয়ন ও সমতা রক্ষার আন্দোলন ইত্যাদি ধর্মীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ নয়। উপরন্তু অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর আবেদন প্রায় ধর্ম বিরোধী।

(সাম্প্রদায়িকতা / পৃ:২৯)

এপ্রসঙ্গে পাদটীকায় উমর বলেছিলেন: (পাকিস্তানের ১৯৬৬) শাসনতন্ত্র আন্দোলন সম্পর্কে একথা সব থেকে বেশি প্রযোজ্য। ইসলামী রাষ্ট্র, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি প্রশ্নে এই আন্দোলনের ইসলাম বিরোধী ভূমিকা খুবই স্পষ্ট।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় ধর্মভিত্তিক জাতি সৃষ্টির বক্তব্য থাকলেও ১৯৪৭ সালের পরে পাকিস্তানের সংবিধান সভার সভাপতি হিসাবে জিন্নাহ প্রথম বক্তৃতাতেই বলেছিলেন যে পাকিস্তানে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীস্টানের মধ্যে কোনো তফাত নেই নতুন রাষ্ট্রে জনগণ কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করবে ধর্মের ভিত্তিতে নয়, পাকিস্তানী জাতীয়তার ভিত্তিতে। জিন্নাহর এই বক্তব্যে দ্বিজাতি তত্ত্ব অথবা ধর্মীয় রাষ্ট্রের কোন উল্লেখ নেই। (সাম্প্রদায়িকতা / পৃ:২৪)।

১৯৬৬ সালে উমরের দৃষ্টিতে পাকিস্তানের সংস্কৃতি ক্রমশ ধর্মনিরেপক্ষতার দিকে রূপান্তরিত হচ্ছিল। পাকিস্তানের, বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানের নতুন সাংস্কৃতিক চেতনা একেবারে ধর্ম-নিরপেক্ষ না হলেও আগের মত যে আর ধর্ম-নির্ভর নেই একথা সত্যি। … সমসাময়িক পত্রপত্রিকা এবং সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাগুলোই এর সিদ্ধান্তমূলক প্রমাণ বহন করে। (সাম্প্রদায়িকতা / পৃ:২৬)।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে উমর বারবার তার বইটির মাধ্যমে ‘বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতার’ মূল্যায়ন করতে থাকেন। বইটি তখন যেন একটি জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়।

১৯৯৪ সালে উমর এই বইটির ৬ষ্ঠ সংস্করণের মুখবন্ধে কয়েকটি মন্তব্য করেন যা বর্তমানে বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বইটি প্রকাশের ২৮ বছর পরে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে তাঁর কয়েকটি পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য ‘ষষ্ঠ সংস্করণের মুখবন্ধে’ লিপিবদ্ধ করেছিলেন:

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রথম দিকে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং সাম্প্রদায়িকতা অনুপস্থিত থাকলেও অতি অল্প দিনে বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার উপলব্ধি করে ১৯৭১ সালের রাষ্ট্রীয় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে ।

তাঁর মতে, পরবর্তী সরকার দুটির আনুকূল্যে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল সংগঠিত হতে থাকে। উমর মন্তব্য করেন, তাদের এই তৎপরতা এরশাদের সামরিক শাসন আমলে এবং (তৎকালীন) পরবর্তী নির্বাচিত ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের আমলে এত বৃদ্ধি পেয়েছে যা পাকিস্তান আমলেও দেখা যায়নি। (৬ষ্ঠ সংস্করণের মুখবন্ধ)।

কিন্তু বদরুদ্দীন উমর শেষ পর্যন্ত ওই মুখবন্ধেই স্বীকার করেন, প্রতিবেশী দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা থাকলে নিজের দেশে অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা করা বাস্তবিকভাবেই দুরূহ। এই প্রসঙ্গে তিনি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে মূলত একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল নয়’ বলে অভিহিত করে এর কর্মকান্ডের সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার সম্পর্কে মন্তব্য করেন।

বিশেষত পাশের দেশ ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এখনো শক্তিশালী থাকায় বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত রাখা বাস্তবত সম্ভব নয়। এ কারণে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার যারা করে তাদের মধ্যে ক্ষেত্রবিশেষে, সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা দেখা যায়। মূলত একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল না হলেও এ জন্য জামায়াতে ইসলামী প্রয়োজনে সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিতে বিরত থাকে না। (৬ষ্ঠ সংস্করণের মুখবন্ধ)।

উমরের বাংলাদেশ অন্বেষণের একটি ক্ষেত্র ছিল সাম্প্রদায়িকতার অবস্থান জরিপ, আর উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিষময় উত্তাপ থেকে বাংলাদেশের জনগণকে সতর্ক করা।

  • আহমদ বশীর: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত