ঈদের আনন্দ থেমে আছে শিশু ওয়ার্ডে

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বরিশাল

হামের উপসর্গে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক ‍শিশু চিকিৎসা। স্ট্রিম ছবি

বাইরে তখন ঈদুল আজহার সকাল। কোরবানির প্রস্তুতি, রাস্তাজুড়ে মানুষের আনাগোনা। নতুন জামার গন্ধে নগরের অলিগলিতে ছুটছে শিশুরা। সেই সময় হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে এক মা সন্তানের কপালে হাত রেখে জ্বর দেখছেন। অন্যজন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। কেউ কেউ সন্তান কোলে রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করছেন।

এই দৃশ্য বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের ‍শিশু ওয়ার্ডে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল ৮টা থেকে এর আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হামে বরিশাল বিভাগে অন্তত ৪৮ শিশুর মৃত্যু হলো। একই সময় হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছে ২৪ জন। তাদের অভিভাবকদের একটাই চাওয়া— শিশুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুক।

বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালের তিনটি শিশু ওয়ার্ডের করিডোরে ঢুকতেই কানে আসে কাশির শব্দ। দশ মাসের শিশু সিমরানকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন তাঁর মা আছিয়া খানম। কয়েক দিন আগেও মেয়েকে নিয়ে ঈদের কেনাকাটার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু সন্তান অসুস্থ হওয়ার পর সব বদলে গেছে তাঁর।

ক্লান্ত চোখে আছিয়া খানম বলেন, ‘প্রথমে জ্বর আছিল। পরে ঠান্ডা লাগছে। তারপর মুখ থেইকা সারা শরীরে দানা উঠছে। তিন দিন আগে এখানে ভর্তি করছি। আগে চোখ মেলাইয়া তাকাইতে পারত না, এখন একটু পারে।’

বরিশালের শেবাচিম হাসপাতালে হামের উপসর্গে ভর্তি এক ‍শিশুকে নিয়ে তার মা। স্ট্রিম ছবি
বরিশালের শেবাচিম হাসপাতালে হামের উপসর্গে ভর্তি এক ‍শিশুকে নিয়ে তার মা। স্ট্রিম ছবি

পাশের শয্যায় কাঁদছিল সাড়ে তিন বছরের জান্নাতুল মাওয়া। তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন মা আফসিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘সন্তান যদি ভালো না থাকে, ঈদ দিয়া কি হইব? ঈদ তো আবার আসব। আগে বাচ্চাডা সুস্থ হোক।’

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডজুড়ে একই ছবি। শহরের আশপাশের পরিবারগুলোর অনেক বাবা ঈদের নামাজ পড়ে সরাসরি হাসপাতালে ফিরেছেন। দূরের যারা, তারা এক মুহূর্তের জন্যও হাসপাতাল ছাড়েননি।

এদিকে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে এখনো রোগীর তীব্র চাপ। শয্যা খালি নেই। কোনো শয্যায় দুটি শিশুকে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পিআইসিইউ সুবিধাও নেই। এর মধ্যেই চিকিৎসক ও নার্সরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্র বলছে, তিনটি ওয়ার্ড মিলিয়ে যেখানে সর্বোচ্চ ৭২ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে প্রতিদিন হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ভর্তি থাক‌ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ শিশু।

চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের নিচতলার ডায়রিয়া ওয়ার্ডকেও হাম ওয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। দ্বিতীয় তলার শিশু বিভাগও এখন কার্যত হাম আক্রান্ত শিশুদের দখলে। তারপরও জায়গা মিলছে না।

বর্তমানে ৭২টি বেড ও ৩০টি নেবুলাইজারের বিপরীতে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ২০০ বেশি শিশু। আরও প্রায় ৩০০ শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে বারান্দা, করিডোর আর মেঝেতে।

একটি বেডে দুই শিশু, কোথাও তিনজন পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। নেবুলাইজার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছেন অভিভাবকেরা। কেউ অপেক্ষা করছেন অন্য শিশুর চিকিৎসা শেষ হওয়ার জন্য, তারপর নিজের সন্তানের মুখে স্থানীয় পদ্ধ‌তি‌তে তৈরি করা প্লা‌স্টি‌কের মাস্ক পরিয়ে দিচ্ছেন।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, ঈদের সময় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যায়, মেলামেশা বাড়ে। কিন্তু যেসব শিশুর সর্দি-কাশি বা জ্বর আছে, তাদের আলাদা রাখার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ঈদে রোগীদের মাঝে উন্নত খাবার দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

সম্পর্কিত