এশিয়া টাইমসের প্রতিবেদন

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কিনতে চায় বাংলাদেশ, উদ্বিগ্ন কেন ভারত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

চীন-পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সম্ভাব্য জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্রয় শুধু সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় নয় বরং এটি ভারত-চীন-পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

এ মাসে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট (এসসিএমপি) এক প্রতিবেদনে জানায়, চীন-পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক থ্রি যুদ্ধবিমান কিনতে পারে বাংলাদেশ। এর আগে পাকিস্তানি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর জেএফ-১৭ ফ্লাইট সিমুলেটর হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা এটিকে সম্ভাব্য ক্রয়চুক্তির পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন।

পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স ও চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ তুলনামূলক কম খরচের বহুমুখী যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে আধুনিক অ্যাভিওনিকস ও বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশ এই যুদ্ধবিমান কিনলে পুরোনো মিগ-২৯ ও এফ-৭ এর বদলে নতুন বিমান ব্যবহার করতে পারবে। এতে বিমান বাহিনীর শক্তি অনেক বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই বিমানগুলো এলে ভারতের বিশাল আকাশশক্তির তেমন কোনো ক্ষতি হবে না, তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তির পার্থক্য কিছুটা কমে আসবে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর ঘিরে ভারতের সামরিক পরিকল্পনা আরও জটিল হতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। পরে তাঁকে ফেরত চেয়ে ভারতকে অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হলে ভারতের সন্দেহ বাড়তে পারে। এতে সীমান্তে অতিরিক্ত সামরিক মোতায়েন ও কৌশলগত ভুল হিসাবের ঝুঁকিও বাড়তে পারে, যদিও সরাসরি সংঘাতের শঙ্কা এখনো কম।

২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর হাতে রয়েছে ৪৪টি যুদ্ধবিমান। এর মধ্যে ৩৬টি পুরোনো এফ-৭ এবং ৮টি মিগ-২৯। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতীয় বিমানবাহিনীর রয়েছে ২৯টি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন।

প্রতি স্কোয়াড্রনে ১৮টি যুদ্ধবিমান ধরে হিসাব করলে ভারতের সম্মুখসারির যুদ্ধবিমানের সংখ্যা প্রায় ৫২২। এর মধ্যে রয়েছে ডাসো মিরাজ, ডাসো রাফাল, সু-৩০ এমকেআই ও এইচএএল তেজাসসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান।

ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের আকাশশক্তি অনেক কম হলেও জেএফ-১৭ যুক্ত হলে বাংলাদেশ নিজস্ব আকাশসীমায় টহল ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এই চুক্তি হলে বাংলাদেশ চীনের অন্যতম বড় অস্ত্র ক্রেতা হিসেবে আরও শক্ত অবস্থানে যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশের হাতে রয়েছে চীনের তৈরি এফ-৭ যুদ্ধবিমান, টাইপ-০৩৫ মিং শ্রেণির সাবমেরিন, টাইপ-০৫৩এইচ৩ ও টাইপ-০৫৩এইচ২ ফ্রিগেট, টাইপ-০৫৬ করভেট এবং বিভিন্ন ধরনের চীনা সাঁজোয়া যান, কামান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনা অস্ত্রের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়লে প্রতিরক্ষা নীতি ও সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বাড়তে পারে। কারণ এসব উন্নত সামরিক ব্যবস্থার জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও সফটওয়্যার আপডেটের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা তৈরি হবে।

ভারতের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ শিলিগুড়ি করিডর। প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অরুণাচলের বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় চীনের সামরিক অভিযান ভারতকে উত্তর-পূর্ব অংশ থেকে আলাদা করে দিতে পারে এবং বঙ্গোপসাগরে ভারতের যাতায়াত বন্ধ করে দিতে পারে।

সেন্টার ফর জয়েন্ট ওয়ারফেয়ার স্টাডিজের (সেনজোস) জন্য ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আশীষ কুমার গুপ্ত বলেন, বাংলাদেশের সম্ভাব্য চীনা যুদ্ধবিমান ক্রয় ভারতকে কৌশলগতভাবে চাপে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে চীনের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে পারে।

তাঁর মতে, জেএফ-১৭ সংগ্রহ করলে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে নিজেদের প্রভাববলয়ে আনতে চীনের প্রচেষ্টা জোরদার হবে। এতে ভারতকে বাংলাদেশ সীমান্তে আরও বেশি সামরিক সম্পদ মোতায়েন করতে হতে পারে।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির জন্য ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বায়রন চং বলেন, শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা।

তাঁর মতে, হাসিনার আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ‘স্বর্ণযুগে’ পৌঁছায়। এ সময় বাংলাদেশ ভারতীয় 'বিচ্ছিন্নতাবাদীদের' ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয়, উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং বাংলাদেশে পাকিস্তানের আইএসআই নেটওয়ার্ক দুর্বল করে।

চং আরও বলেন, ভারতীয় উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে শেখ হাসিনা সোনাদিয়া বন্দর প্রকল্প বাতিল করেছিলেন এবং তিস্তা প্রকল্পের জন্য ভারতকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

তবে তিনি উল্লেখ করেন, ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসন, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের ওপর দমন-পীড়নের কারণে ব্যাপক গণবিক্ষোভ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত হাসিনার পতন ঘটে।

আইওএসআর জার্নাল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে পি কে বিজয়কুমার বলেন, হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিরোধী মনোভাব জোরালো হয়। এতে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বাড়ে এবং ভারতীয় কূটনীতির জন্য বড় ধাক্কা তৈরি হয়।

তাঁর মতে, হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ‘ডি-ইন্ডিয়ানাইজেশন’ এর প্রবণতা দেখা যায়। হাসিনা আমলের বিভিন্ন চুক্তি বাতিল করা হয়, ভারত-নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক উদ্যোগে গতি কমে এবং ভারতের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা শুরু হয়।

একই সঙ্গে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখতে বাংলাদেশ পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ভারত সমর্থন দেওয়ায় এবং তাঁকে ফেরত না পাঠানোয় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) জন্য ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মহসিনা মোস্তফা বলেন, হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ এখন প্রতিদ্বন্দ্বী বৈশ্বিক শক্তিগুলোর চাপে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

তাঁর মতে, স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সীমাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের (এমপি-আইডিএসএ) জন্য ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে নিহার নায়েক বলেন, বাংলাদেশ আরও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঝুঁকছে বলে ভারত উদ্বিগ্ন। একই সময়ে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প ও অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তাঁর মতে, চীন প্রায়ই সামরিক সহযোগিতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহায়তাও যুক্ত করে। পাকিস্তানের মাধ্যমে জেএফ-১৭ সিমুলেটর হস্তান্তরের ঘটনাও সেই প্রেক্ষাপটের অংশ হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। কারণ এটি বঙ্গোপসাগর ও ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কিনে, তাহলে বিষয়টি শুধু সামরিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। যেখানে দেশটি ক্রমশ ভারত, চীন ও পাকিস্তানের পারস্পরিক লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রে চলে যাচ্ছে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হতে পারে আকাশসামরিক শ্রেষ্ঠত্ব হারানো নয়; বরং এমন একটি প্রতিবেশী দেশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়া, যা একসময় ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত