শিশু ধর্ষণকে ‘সমকামিতা’ উল্লেখ করে আলেমদের বিবৃতি নিয়ে বিতর্ক
স্ট্রিম প্রতিবেদকঢাকা

সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছরের এক শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত যৌন নিপীড়নের খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ৬০০ আলেম। সেইসঙ্গে সমকামী সহিংসতা প্রতিরোধে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনের ৩৭৭ ধারা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। এসব আলেমদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম, খতিব, শায়েখ ও মাদ্রাসার মুহতামিম (প্রিন্সিপাল)।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ‘মূল্যবোধ আন্দোলন’ এর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।
আলেমদের বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন গবেষণামূলক বিশ্লেষণে জানা যায়, সমকামী ও উভকামীদের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। সমাজে এই সমকামী প্রবণতা প্রতিরোধ না করা গেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিগত কয়েক বছর যাবত পশ্চিমা ফান্ডে বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক সমকামী আচরণকে স্বাভাবিকীকরণের কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে দাবি করে তারা বলেন, একদিকে এনজিও সহযোগিতা ও বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সমকামী নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি লাভ করেছে। অন্যদিকে সমকামিতা প্রতিরোধমূলক দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে সমকামিতার ব্যাধি ধীরে ধীরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে, এমনকি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। মাদ্রাসা সমাজের বাইরে ভিন্ন গ্রহের কোন ভূখণ্ড নয়। সমাজে যখন কোন অবক্ষয়ের বন্যা বইতে থাকে, মাদ্রাসাও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।
তবে শিশু নির্যাতনের ঘটনাকে সমকামিতা হিসেবে দেখানোর ঘটনায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মহলে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
হুযাইফা আল মামদূহ নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ৬০০ হুজুর মিলে শিশু নিপীড়ন রুখতে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা কার্যকর করার দাবি জানাইছে। মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনকে তারা ‘সমকামী যৌন সহিংসতা’ হিসেবে দেখছে এবং দাবি করছে, সমকামী ও উভকামী ব্যক্তিদের দ্বারা শিশু যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি বেশি। সমকামিতা আর শিশু ধর্ষণ যে এক না, এই সামান্য কিন্তু জরুরি পার্থক্য করার মত পড়াশোনা তাঁদের নাই?
তিনি আরও লেখেন, ৬০০ জন মানুষের একজনও জানে না যে, ইচ্ছা করে কোন কাজ করা আর জোর করে করা যে এক না। একজনেরও মাথায় আসল না যে, দুই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক আর একটা শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন একই জিনিস না।
আবু বকর সিদ্দীক জাবের নামে একজন লিখেছেন, হুজুররা সমকামী ইস্যুতে সরব আর নন হুজুররা হুজুরদের শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব। এটাকে একটা সমস্যা না দেখে এটাকে একটা আত্মমর্যাদার লড়াই দেখতে চাইছে ৬০০ জন আলেম। তাই শিশু নির্যাতনের আলাপে তারা সরাসরি না গিয়ে তারা সমকামী আলাপে গেছে এবং এটাকে ব্যাপকতা দিয়ে ডিল করতে বলছে সরকারকে।
তিনি আরও লেখেন, কিন্তু তারা নিজেদের অজান্তেই মাদ্রাসার হুজুরদের সমকামী বানায়ে দিলো। এখন সমকামী আন্দোলনের সাথে তাদেরকেও শামিল করা হবে। বৃহত্তর পরিসরে সমকামী আলাপে হুজুর সমকামী জায়গা পাবে। অথচ এই শিশু নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত বা প্রমাণিত কেউই নিজেদেরকে সমকামী হিসেবে পোট্রে করতে চায় না এবং এটা করেও না।
শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’ এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার স্ট্রিমকে বলেন, সমকামিতা হয় দুইজন অ্যাডাল্ট মানুষের কনসার্নের ভিত্তিতে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে নির্যাতনের প্রশ্নটাই আসে জোর করার কারণে। কারণ সেখানে শিশুর কোনো কনসার্ন থাকে না।
তিনি আরো বলেন, সমকামিতার সঙ্গে শিশু নিপীড়ন গুলিয়ে ফেলে এটা বন্ধ করা যাবে না। যারা নিপীড়ন করছে তাঁদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সমকামিতার মতো একটা বিষয়কে এখানে এনে শিশু নির্যাতনকে জাস্টিফাই করা যাবে না। আমি বলবো, নিশু নির্যাতনের ঘটনায় সমকামিতাকে টেনে আনার মানে হলো, এই বিষয় থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ স্ট্রিমকে বলেন, বাংলাদেশের আইনে সমকামিতা তো নিষিদ্ধই। কিন্তু শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সমকামিতার বিষয়টি সামনে আনার বিষয়টি আমার বোধগম্য না। তবে আমার মনে হয়, দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় কিছুটা অস্পষ্টতা থাকার কারণে তাঁরা এই কথা বলছেন। এ ক্ষেত্রে আইনে এই ব্যাপারগুলোকে আরো স্পষ্ট করে আপডেট করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একইসঙ্গে, ওই ব্যক্তি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
.png)
-40e58c.jpeg)



-b04cb2-256x144.webp)

-3d2c06-256x144.webp)
