মিত্রদের সুরক্ষায় ট্রাম্পের কৌশল ভেস্তে দিচ্ছেন কিম-পুতিন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক।
স্ট্রিম গ্রাফিক।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া উলচি ফ্রিডম শিল্ড সংক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আধুনিক যুদ্ধের ড্রোন প্রযুক্তি, জিপিএস বিভ্রাট এবং সাইবার হামলার ঝুঁকি মাথায় রেখে এই যৌথ মহড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পাশে থেকে লড়াই করে উত্তর কোরিয়ার সেনারা বড় ধরনের বাস্তব সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। সেই অভিজ্ঞতা মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়াও ছিল এই মহড়ার অন্যতম লক্ষ্য।

কিছুদিন আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার সামরিক শক্তি দ্রুত বাড়ছে। জেলেনস্কির সতর্কবার্তা এবং ইউক্রেনে যুদ্ধের বাস্তবতার মধ্যে ট্রাম্পের মহড়া সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত সবাইকে অবাক করেছে।

জেলেনস্কি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর আবেদনের কয়েক দিনের মাথায় ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া শহরে উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালায় রুশ বাহিনী। একই সময়ে উত্তর কোরিয়া তাদের পূর্ব উপকূল থেকেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইউক্রেনের রণাঙ্গন থেকে পাওয়া শিক্ষা উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশলে ব্যবহার করবে তারা।

এই নতুন পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির বড় দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মিত্রদের মধ্যে সামরিক দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার কৌশল নিয়েছিল। যেকোনো অঞ্চলের মিত্র দেশগুলো নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব নেবে, এমনটাই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশা। ট্রাম্প নিজেদের সামরিক সম্পদ অন্য দেশের জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারমূলক কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া যৌথভাবে সেই নীতিতে জল ঢেলে দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে দিতে পারে কিন্তু বিপদের ঝুঁকিকে এভাবে ভৌগোলিকভাবে আলাদা করা যায় না।


দায়িত্ব বণ্টন নীতি ও বৈশ্বিক সংকট

ট্রাম্প প্রশাসন ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে দায়িত্ব ভাগাভাগি ও দায়িত্ব স্থানান্তরের (বার্ডেন শিফটিং) কথা বলেছিল। এতে আরও বলা হয়, ধনী মিত্র দেশগুলো নিজ অঞ্চলের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা ও সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করবে।

২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলে (এনডিএস) ইউরোপের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। সীমিত মার্কিন সহায়তায় উত্তর কোরিয়াকে ঠেকানোর মূল দায়িত্ব দক্ষিণ কোরিয়াকেই নিতে বলা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের দায়িত্ব নিলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যান্য সংকটে নজর দিতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন শত্রুরা জোটবদ্ধ হতে পারে, এই ভয়েই দায়িত্ব বণ্টনের কৌশল বেছে নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। নির্দিষ্ট অঞ্চলে মিত্ররা যদি নিজস্ব শক্তি ধরে রাখতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র তখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জায়গায় সেনা পাঠাতে পারবে।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ট্রাম্পের সেই হিসাবকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। এক অঞ্চলের সংঘাত এখন অন্য অঞ্চলের নিরাপত্তাকে সরাসরি বদলে দিচ্ছে। উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ কামানের গোলা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে প্রায় ১৫ হাজার উত্তর কোরিয়ান সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী আরও ৩০ থেকে ৫০ হাজার সেনা পাঠাতে পারে পিয়ংইয়ং। যদিও উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বরং জেলেনস্কির দাবির পক্ষেই মত দিচ্ছে।

উত্তর কোরিয়ার সেনারা নিজ দেশে বসে এমন বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারত না। ড্রোন হামলা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং দ্রুত কৌশলগত পরিবর্তনের মতো আধুনিক রণকৌশল তারা ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শিখছে। যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে উত্তর কোরিয়া তাদের ড্রোন ও যুদ্ধকৌশলে ইতিমধ্যে বড় পরিবর্তন এনেছে।

পশ্চিমা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা কেমন, উত্তর কোরিয়া তা পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া থেকে ছোড়া উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা উত্তর কোরিয়ার এই বাস্তব সামরিক অভিজ্ঞতাকে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও উলচি সামরিক মহড়া ১১ দিন থেকে কমিয়ে ৫ দিনে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণও বড় আকারে কাটছাঁট করা হয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি সিউলের ওপর ক্ষোভ থেকেও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক অভিযানে সেনা পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। কোরিয়া উপদ্বীপের দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন ট্রাম্প।

মস্কোর সমর্থন ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত বিভ্রান্তি

রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতার বাইরেও মস্কোর কাছ থেকে আরও বড় সমর্থন পাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পাশে দাঁড়ানোর মতো মহাশক্তিধর অংশীদার পেয়েছে দেশটি। রাশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থনের কারণে উত্তর কোরিয়াকে একঘরে করা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। সামরিক সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে কী প্রযুক্তি দিচ্ছে, এই নিয়ে সিউল ও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।

পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের আঞ্চলিক দায়িত্ব বণ্টনের নীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। ইউরোপের রণাঙ্গনে উত্তর কোরিয়ার যে সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়াকে সেই বিপদ একা সামাল দিতে বলা হচ্ছে। যদি রাশিয়া কেবল ইউরোপে সংকট তৈরি করত এবং উত্তর কোরিয়া কেবল এশিয়ায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র দায়িত্ব আলাদা করে দিতে পারত। কিন্তু যখন ইউরোপের যুদ্ধ এশিয়ার শত্রুপক্ষের সামরিক জ্ঞান বাড়িয়ে দেয়, তখন দায়িত্ব আলাদা রাখার নীতি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব বাড়াতে নীতিগতভাবে প্রস্তুত। সিউলের মতে, দায়িত্ব বৃদ্ধির অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটন নিজেকে দূরে সরিয়ে নেবে। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার উপস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক খরচ রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-ম্যুংয়ের সরকার উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার পথ খুঁজছে। প্রেসিডেন্ট লি সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির বদলে স্থায়ী শান্তি চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এমন সময় ইউক্রেনকে যদি দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি সামরিক সহায়তা দেয়, তবে এই শান্তি আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়াকে রাশিয়ার সম্পর্কের কথাও ভাবতে হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে মস্কোর সঙ্গে সিউলের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব ছিল। ২০২১ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেওয়া এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মস্কোর ঘনিষ্ঠতায় সেই সম্পর্কে বড় ফাটল ধরেছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমাধান হলে বাণিজ্যের পুরোনো পথ আবার খুলে যেতে পারে। সিউল মস্কোর সঙ্গে সম্পর্কের সব দরজা চিরতরে বন্ধ করতে চায় না।

মিত্রদের যুক্ত করার ঐতিহাসিক প্রয়োজন

মিত্রদের দায়িত্ব ভাগাভাগি করার ধারণা অবাস্তব নয়। বিশ্বের প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে একক আধিপত্য বজায় রাখার মতো রাজনৈতিক ইচ্ছা বা আর্থিক সক্ষমতা আমেরিকার আর নেই। আমেরিকার সামরিক পরিকল্পনাকে নিজস্ব তৈরি করা ভৌগোলিক সীমানার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। ইউক্রেনের রণাঙ্গন থেকে পাওয়া উত্তর কোরিয়ান ক্ষেপণাস্ত্র ও সেনাদের তথ্য সরাসরি মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়া পরিকল্পনায় যুক্ত করতে হবে। উত্তর কোরিয়াকে দীর্ঘদিন নজরদারিতে রাখার সিউলের অভিজ্ঞতা ইউরোপীয় দেশগুলোর সুরক্ষায় কাজে লাগানো যেতে পারে। ইউরোপ ও এশিয়া উভয় জায়গার নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকায় আমেরিকা এই সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় সেতু হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

সমন্বয়ের মূল ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য আচরণ। ট্রাম্প প্রশাসনের আকস্মিক আচরণ এই সমন্বয়ের বড় দুর্বলতা। ট্রাম্প সামরিক মহড়া কাটছাঁট করবেন, এই খবর দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার বা মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আগে থেকে জানা ছিল না।

একই সময়ে কিম জং উনের সঙ্গে পুনরায় বৈঠকের সম্ভাবনাও জাগিয়ে তুলেছেন ট্রাম্প। তবে দেশটি ট্রাম্পের এই সাময়িক প্রস্তাবগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কিম ইয়ো জং জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে সম্প্রতি কোনো যোগাযোগ হয়নি। তিনি দাবি করেছেন, সামরিক মহড়া কমালেও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতামূলক নীতি বদলায়নি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের সম্পর্ক চমৎকার বলে উল্লেখ করে ভবিষ্যতে আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মৈত্রী পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে। আমেরিকাকে শুধু দায়িত্ব চাপানোর অভিভাবক হিসেবে থাকলে চলবে না। দায়িত্ব বণ্টনের অর্থ কেবল ইউরোপকে রাশিয়ার ভার দেওয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে উত্তর কোরিয়ার ভার দেওয়া নয়। শত্রুপক্ষ যখন বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে অস্ত্র, সেনা ও প্রযুক্তির আদান-প্রদান ঘটাচ্ছে, আমেরিকাকেও সব মিত্রদের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফরেইন পলিসির বিশ্লেষণ

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত