স্ট্রিম ডেস্ক

চার দশক আগের ঘটনা। সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কোণঠাসা হওয়ার পর হাজারো ইরানি তরুণ সেনা আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেই সামরিক সাফল্যকে স্থায়ী বিজয়ে রূপ দিতে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি আরও এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়া সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন খোমেনি। তিনি ভবিষ্যৎ শত্রুদের বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চড়া মূল্য দিতে হবে।
ইরাকের সঙ্গে সংঘাত আধুনিক ইরানি রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় লাখ লাখ মানুষ। বহু বছর পর ইরান আবারও ঠিক একই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। সামনে প্রশ্ন একটাই: যুদ্ধ নাকি শান্তিচুক্তি?
ইরাক যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া সেই বিপ্লবী নেতারাই এখন ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। তাঁদের মতে, সাদ্দামের আগ্রাসনের মতো বর্তমান মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণও ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধের জয়-পরাজয় কেবল অস্ত্রের শক্তিতে নির্ধারিত হবে না। কোন পক্ষ কতদিন টিকে থাকতে পারে, তার ওপরই আসল বিজয় নির্ভর করবে। অন্যদিকে দেশটির মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শিবির আলোচনার টেবিলে সাফল্য পেতেই বেশি আগ্রহী।
ছয় মাসের সংঘাতের পর এই মতবিরোধের কারণে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তের অধিকারী নেতা মোজতবা খামেনি এখনো লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়েছেন।
ইরানের বিবদমান সব রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে দাবি করছে যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হয়েছে। বিজয়ের প্রকৃত অর্থ কী, তা নিয়ে ক্ষমতার অন্দরে আদর্শিক বিভেদ দেখা দিয়েছে। একপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বাধীন বাস্তববাদী ও টেকনোক্র্যাট নেতারা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি, মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং দেশের অবকাঠামোর ক্ষতি সামনে এনে স্থায়ী চুক্তির পক্ষে কথা বলছেন তাঁরা। নিজেদের শক্তিমত্তা থাকা অবস্থাতেই সংকট সমাধানে জোর দিচ্ছেন এই নেতারা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৪৭ বছরের পুরোনো দ্বন্দ্ব মেটানোই দেশের জন্য উপকারী হবে বলে মনে করেন তাঁরা। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে সমঝোতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে এই পক্ষ।
চলতি মাসে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘কোনো না কোনো মুহূর্তে এই যুদ্ধ থামাতেই হবে। আমাদের শক্তি ও আত্মমর্যাদা থাকা অবস্থায় যুদ্ধ শেষ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পুরো বিশ্ব ইতিমধ্যে আমাদের বিজয় স্বীকার করে নিয়েছে।’
বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছেন কট্টরপন্থীরা। তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস। তাদের বিশ্বাস, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে ওয়াশিংটন বদ্ধপরিকর। অর্ধশতাব্দী ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করে আসছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তাদের সেসব বক্তব্যের পক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে ইরানি জনগণের সামনে হাজির হয়েছে।
ক্ষমতাসীন সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তারা ‘পশ্চিমা ঘেঁষা’ হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। দেশের সমস্যাগুলোকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে চুক্তির পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি তাদের।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল সিএনএনকে বলেন, ‘কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রকে চরম অবিশ্বাস করে। ট্রাম্পের কারণে তারা অতীতে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলেই তাদের বিশ্বাস।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভালো চুক্তি কিংবা সমঝোতা নয়, তাদের কাছে যুদ্ধে হেরে না যাওয়াই হলো আসল জয়।’
হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর পেজেশকিয়ান সুযোগ পেয়ে ক্ষমতায় এসেছেন বলে মনে করে এই গোষ্ঠী। জুনে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষর তাদের আরও ক্ষুব্ধ করেছে। দেশের অর্থনৈতিক ধ্বংস ও ব্যর্থ চুক্তির সম্পূর্ণ দায় তারা পেজেশকিয়ানের ওপর চাপাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিভেদ এতটাই তীব্র হয়েছে যে অর্থনৈতিক সংকট ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে সরকারের বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষকে চুক্তিতে বাধ্য করতে কৃত্রিম জ্বালানি সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে দাবি করছেন কট্টরপন্থীরা। কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-মানান রাইসি প্রশ্ন তোলেন, ‘অর্থনীতি কি আসলেই পুরোপুরি অচলাবস্থায় পড়েছে, নাকি আপনারা ইচ্ছা করে এমন অচলাবস্থার ভয় দেখাচ্ছেন? সবকিছু যুদ্ধের ওপর চাপানো হচ্ছে।’
অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া ব্যর্থ চুক্তিগুলোর কথা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন কট্টরপন্থীরা। ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে ২০১৫ সালে সই হওয়া পরমাণু চুক্তি ট্রাম্প একতরফাভাবে বাতিল করেছিলেন। আলোচনার মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্র দুইবার ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছে।
কট্টরপন্থীদের দাবি, আঞ্চলিক সশস্ত্র বাহিনী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত ড্রোন এবং শিয়া ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভর করাই দেশের জন্য নিরাপদ। এসব নীতিই তাদের সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা দিয়েছে। পশ্চিমা ঘেঁষা রাজনীতিকদের কূটনীতি দেশকে রক্ষা করতে পারেনি।
সানাম ভাকিলের মতে, কট্টরপন্থীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে যে ট্রাম্পের কাছ থেকে কোনো সুবিধার চুক্তি আদায় সম্ভব নয়। আর আপাতত সম্ভব হলেও ট্রাম্প সেই চুক্তিতে অটুট থাকবেন—এই বিশ্বাস তাদের নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘায়িত করে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করাতেই তাদের বেশি আগ্রহ।
কট্টরপন্থী পক্ষের আইনপ্রণেতা কামরান গাজানফারি দাবি করেন, মধ্যপন্থীরা সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘তারা একটি অপমানজনক শান্তিচুক্তি মেনে নেওয়ার জন্য জনমত তৈরি করছে। শত্রু বারবার প্রমাণ করেছে আমরা যত ছাড়ই দিই না কেন, তারা কখনো সন্তুষ্ট হবে না। আমাদের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া তারা আর কিছুতেই থামবে না।’
মধ্যপন্থীদের উদ্দেশ্যে গাজানফারি বলেন, ‘শহীদ ইমাম আলী খামেনি তাদের বহুবার সতর্ক করেছিলেন। তারা কেন শিক্ষা নিচ্ছে না? তাদের কথাবার্তায় কেবল দাসত্ব আর আত্মসমর্পণের সুর।’
ট্রাম্পের অস্থির কূটনীতি ও চুক্তির প্রতি আন্তরিকতার অভাব কট্টরপন্থীদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে। সানাম ভাকিল বলেন, ‘ট্রাম্প পরিস্থিতি শান্ত করতে কোনো সাহায্য করছেন না। তিনি একবার ইরানকে মহান করার কথা বলেন, আবার পরমুহূর্তেই টুইট বার্তায় ধ্বংসের হুমকি দেন। এই দ্বিমুখী আচরণ ইরানি নেতৃত্বের ভেতরে ভীতি ও অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
একদিকে, কট্টরপন্থীদের হাতে জাতীয় সংবাদপত্র, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, রাজপথের বিক্ষোভকারী এবং সামরিক বাহিনীর বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ট্রাম্প কূটনীতির আড়ালে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও তাদের বিশ্বাস। অন্যদিকে ইরানের বাস্তববাদী রাজনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক জুয়া খেলছেন।
এই বিভেদের মধ্যেও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখনো নীরব। নিজের শাসনক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতা পোক্ত করার এই সময়ে ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করার রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাইছেন না তিনি।
শুক্রবার মধ্যপন্থী কর্মকর্তাদের প্রশংসা করেছেন সর্বোচ্চ নেতা। তবে দেশের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ্যে বড় করে না দেখানোর বিষয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, দুর্বলতা প্রকাশ পেলে শত্রুপক্ষ উৎসাহিত হবে এবং মিত্রদের মনোবল ভেঙে পড়বে।
সিএনএনের বিশ্লেষণ

চার দশক আগের ঘটনা। সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কোণঠাসা হওয়ার পর হাজারো ইরানি তরুণ সেনা আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেই সামরিক সাফল্যকে স্থায়ী বিজয়ে রূপ দিতে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি আরও এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়া সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন খোমেনি। তিনি ভবিষ্যৎ শত্রুদের বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চড়া মূল্য দিতে হবে।
ইরাকের সঙ্গে সংঘাত আধুনিক ইরানি রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম মূল ভিত্তি ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় লাখ লাখ মানুষ। বহু বছর পর ইরান আবারও ঠিক একই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। সামনে প্রশ্ন একটাই: যুদ্ধ নাকি শান্তিচুক্তি?
ইরাক যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া সেই বিপ্লবী নেতারাই এখন ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। তাঁদের মতে, সাদ্দামের আগ্রাসনের মতো বর্তমান মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণও ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধের জয়-পরাজয় কেবল অস্ত্রের শক্তিতে নির্ধারিত হবে না। কোন পক্ষ কতদিন টিকে থাকতে পারে, তার ওপরই আসল বিজয় নির্ভর করবে। অন্যদিকে দেশটির মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শিবির আলোচনার টেবিলে সাফল্য পেতেই বেশি আগ্রহী।
ছয় মাসের সংঘাতের পর এই মতবিরোধের কারণে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তের অধিকারী নেতা মোজতবা খামেনি এখনো লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়েছেন।
ইরানের বিবদমান সব রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে দাবি করছে যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হয়েছে। বিজয়ের প্রকৃত অর্থ কী, তা নিয়ে ক্ষমতার অন্দরে আদর্শিক বিভেদ দেখা দিয়েছে। একপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বাধীন বাস্তববাদী ও টেকনোক্র্যাট নেতারা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি, মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং দেশের অবকাঠামোর ক্ষতি সামনে এনে স্থায়ী চুক্তির পক্ষে কথা বলছেন তাঁরা। নিজেদের শক্তিমত্তা থাকা অবস্থাতেই সংকট সমাধানে জোর দিচ্ছেন এই নেতারা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৪৭ বছরের পুরোনো দ্বন্দ্ব মেটানোই দেশের জন্য উপকারী হবে বলে মনে করেন তাঁরা। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে সমঝোতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে এই পক্ষ।
চলতি মাসে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘কোনো না কোনো মুহূর্তে এই যুদ্ধ থামাতেই হবে। আমাদের শক্তি ও আত্মমর্যাদা থাকা অবস্থায় যুদ্ধ শেষ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পুরো বিশ্ব ইতিমধ্যে আমাদের বিজয় স্বীকার করে নিয়েছে।’
বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছেন কট্টরপন্থীরা। তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস। তাদের বিশ্বাস, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে ওয়াশিংটন বদ্ধপরিকর। অর্ধশতাব্দী ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করে আসছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তাদের সেসব বক্তব্যের পক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে ইরানি জনগণের সামনে হাজির হয়েছে।
ক্ষমতাসীন সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তারা ‘পশ্চিমা ঘেঁষা’ হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। দেশের সমস্যাগুলোকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে চুক্তির পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি তাদের।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল সিএনএনকে বলেন, ‘কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রকে চরম অবিশ্বাস করে। ট্রাম্পের কারণে তারা অতীতে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলেই তাদের বিশ্বাস।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভালো চুক্তি কিংবা সমঝোতা নয়, তাদের কাছে যুদ্ধে হেরে না যাওয়াই হলো আসল জয়।’
হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর পেজেশকিয়ান সুযোগ পেয়ে ক্ষমতায় এসেছেন বলে মনে করে এই গোষ্ঠী। জুনে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষর তাদের আরও ক্ষুব্ধ করেছে। দেশের অর্থনৈতিক ধ্বংস ও ব্যর্থ চুক্তির সম্পূর্ণ দায় তারা পেজেশকিয়ানের ওপর চাপাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিভেদ এতটাই তীব্র হয়েছে যে অর্থনৈতিক সংকট ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে সরকারের বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষকে চুক্তিতে বাধ্য করতে কৃত্রিম জ্বালানি সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে দাবি করছেন কট্টরপন্থীরা। কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-মানান রাইসি প্রশ্ন তোলেন, ‘অর্থনীতি কি আসলেই পুরোপুরি অচলাবস্থায় পড়েছে, নাকি আপনারা ইচ্ছা করে এমন অচলাবস্থার ভয় দেখাচ্ছেন? সবকিছু যুদ্ধের ওপর চাপানো হচ্ছে।’
অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া ব্যর্থ চুক্তিগুলোর কথা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন কট্টরপন্থীরা। ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে ২০১৫ সালে সই হওয়া পরমাণু চুক্তি ট্রাম্প একতরফাভাবে বাতিল করেছিলেন। আলোচনার মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্র দুইবার ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছে।
কট্টরপন্থীদের দাবি, আঞ্চলিক সশস্ত্র বাহিনী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত ড্রোন এবং শিয়া ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভর করাই দেশের জন্য নিরাপদ। এসব নীতিই তাদের সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা দিয়েছে। পশ্চিমা ঘেঁষা রাজনীতিকদের কূটনীতি দেশকে রক্ষা করতে পারেনি।
সানাম ভাকিলের মতে, কট্টরপন্থীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে যে ট্রাম্পের কাছ থেকে কোনো সুবিধার চুক্তি আদায় সম্ভব নয়। আর আপাতত সম্ভব হলেও ট্রাম্প সেই চুক্তিতে অটুট থাকবেন—এই বিশ্বাস তাদের নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘায়িত করে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করাতেই তাদের বেশি আগ্রহ।
কট্টরপন্থী পক্ষের আইনপ্রণেতা কামরান গাজানফারি দাবি করেন, মধ্যপন্থীরা সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘তারা একটি অপমানজনক শান্তিচুক্তি মেনে নেওয়ার জন্য জনমত তৈরি করছে। শত্রু বারবার প্রমাণ করেছে আমরা যত ছাড়ই দিই না কেন, তারা কখনো সন্তুষ্ট হবে না। আমাদের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া তারা আর কিছুতেই থামবে না।’
মধ্যপন্থীদের উদ্দেশ্যে গাজানফারি বলেন, ‘শহীদ ইমাম আলী খামেনি তাদের বহুবার সতর্ক করেছিলেন। তারা কেন শিক্ষা নিচ্ছে না? তাদের কথাবার্তায় কেবল দাসত্ব আর আত্মসমর্পণের সুর।’
ট্রাম্পের অস্থির কূটনীতি ও চুক্তির প্রতি আন্তরিকতার অভাব কট্টরপন্থীদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে। সানাম ভাকিল বলেন, ‘ট্রাম্প পরিস্থিতি শান্ত করতে কোনো সাহায্য করছেন না। তিনি একবার ইরানকে মহান করার কথা বলেন, আবার পরমুহূর্তেই টুইট বার্তায় ধ্বংসের হুমকি দেন। এই দ্বিমুখী আচরণ ইরানি নেতৃত্বের ভেতরে ভীতি ও অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
একদিকে, কট্টরপন্থীদের হাতে জাতীয় সংবাদপত্র, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, রাজপথের বিক্ষোভকারী এবং সামরিক বাহিনীর বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ট্রাম্প কূটনীতির আড়ালে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও তাদের বিশ্বাস। অন্যদিকে ইরানের বাস্তববাদী রাজনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের রাজনৈতিক জুয়া খেলছেন।
এই বিভেদের মধ্যেও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখনো নীরব। নিজের শাসনক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতা পোক্ত করার এই সময়ে ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করার রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাইছেন না তিনি।
শুক্রবার মধ্যপন্থী কর্মকর্তাদের প্রশংসা করেছেন সর্বোচ্চ নেতা। তবে দেশের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ্যে বড় করে না দেখানোর বিষয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, দুর্বলতা প্রকাশ পেলে শত্রুপক্ষ উৎসাহিত হবে এবং মিত্রদের মনোবল ভেঙে পড়বে।
সিএনএনের বিশ্লেষণ
.png)

বিভেদ ভুলে মুসলিম বিশ্বকে তাদের ‘আসল শত্রু’র বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি। রোববার (৩০ আগস্ট) লিখিত বিবৃতিতে এই আহ্বান জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে ইঙ্গিত করে মুজতবা খামেনি বলেন, শত্রুপক্ষ বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ঐক্য নষ্ট করতে চায়। এ জন্য তা
১৯ মিনিট আগে
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া উলচি ফ্রিডম শিল্ড সংক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আধুনিক যুদ্ধের ড্রোন প্রযুক্তি, জিপিএস বিভ্রাট এবং সাইবার হামলার ঝুঁকি মাথায় রেখে এই যৌথ মহড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পাশে থেকে লড়াই কর
২ ঘণ্টা আগে
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের সমালোচনা করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিতাড়নে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালত। আদালত বলেছেন, এমন পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের বাক্স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন করে।
৪ ঘণ্টা আগে
বিশ্বের প্রথম ড্রোনবাহী জাহাজ ‘টাইপ ০৭৬’ এর চূড়ান্ত সমুদ্র মহড়া চালিয়েছে চীন। দেশটির সবচেয়ে উন্নত উভচর এই জাহাজের ডাকনাম ‘সিচুয়ান’। এই মহড়ার পরপরই জিজে-২১ নামের স্টিলথ অ্যাটাক ড্রোনেরও উড়াল পরীক্ষা চালিয়েছে পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবাহিনী।
৬ ঘণ্টা আগে