আমীন আল রশীদ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা চলছে। এর মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, সেটি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে। গত ২৭ আগস্ট বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিন বিকালে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মূলত বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষা ব্যবস্থা। এতে অন্য কারো উদ্বেগের অবকাশ নেই।’ চুক্তিতে যোগ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক হলেও এ নিয়ে এখনো আলোচনার সময় আসেনি বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুজন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এই জোটে যোগ দিতে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সৌদি আরব, যদিও আমন্ত্রণের ধরন স্পষ্ট নয়। এর মধ্যে গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানান ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। অন্যদিকে গত ২৭ আগস্ট পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, নতুন কোনো দেশ মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিতে চাইলে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পরামর্শ করে তা বিবেচনা করা হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া, সেখান থেকে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নেতাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের অস্পষ্ট অবস্থানসহ নানা কারণে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা, আওয়ামী লীগ আমলে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সীমান্ত হত্যা, নদীর পানি বণ্টন ও ভারতের কথিত ‘দাদাগিরি’ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নতুন ও জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি সত্যিই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হবে? যদি হয় তাহলে এটি হবে বাংলাদেশের জন্য কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে অংশগ্রহণের প্রথম ঘটনা—যা ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—বাংলাদেশের এই নীতির পরিপন্থি।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এই পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার ও নিরস্ত্রীকরণ, প্রতিটি জাতির নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণের অধিকার এবং সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থনের কথাও বলা হয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর যে সংবিধান গৃহীত হয়, সেখানে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাখ্যা এভাবেই ছিল। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যখন সংবিধানে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। সেখানে সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে একটি নতুন উপদফা যুক্ত করে বলা হয়: রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবেন। তবে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়ে অনুচ্ছেদটি বাহাত্তরের আলোকে ফিরিয়ে আনা হয়। অর্থাৎ বর্তমানে যে সংবিধানে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে ‘ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার’ করার বিষয়টি নেই।
বিএনপি যদি অষ্টাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে পরিবর্তন আনে, তাহলে সম্ভবত ২৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে জিয়াউর রহমানের আমলে গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বহাল করে ‘মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদারের’ বিষয়টি যুক্ত করবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধান করে এরইধ্যে সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিরোধী দলের কাছে নাম চাওয়া হলেও তারা এই কমিটিতে কারো নাম দেয়নি। গত ৪ আগস্ট কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, জুলাই সনদ, বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতির আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হবে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সরকারের আগ্রহের পেছনে জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব আছে বলে মনে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার একটি দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়া যেমন মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেও তেমন একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি চুক্তিটিকে ‘মুসলিম বিশ্বের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বাংলাদেশ এর অংশ হতে আগ্রহী বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বলেছেন, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বহুমাত্রিক করতে সরকার কাজ করবে।
পররাষ্ট্রনীতিসম্পর্কিত সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তন করা হলেও কোনো প্রতিরক্ষা বা সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করা জরুরি। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বড় ঝুঁকি হলো, ন্যাটোর আদলে এতে কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করার বিধান রয়েছে। প্রতিক্রিয়ার ধরন অভিন্ন না হলেও প্রত্যেক সদস্যকে তা মোকাবিলায় ভূমিকা নিতে হবে, যার মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে কিংবা জোটভুক্ত কোনো দেশ অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে বাংলাদেশও তার অংশীদার হয়ে পড়তে পারে। সামরিক সক্ষমতায় সীমিত এবং প্রায় ২০ কোটি মানুষের চাপ সামলানো দুর্বল অর্থনীতির বাংলাদেশের জন্য এমন জোটে যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত কী অর্জন হবে—সেটিই তাই বড় প্রশ্ন। আর কোন সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে দুর্বল অর্থনীতির দেশের জন্য বেশি।
এই ধরনের সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো শত্রু বা সম্ভাব্য শত্রুর কাছ থেকে সমীহ আদায় করা এবং আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করে। আবার উল্টোও হতে পারে। যেমন সামরিক জোটে যোগদানকারী কোনো দেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র যদি তুলনামূলকভাবে বড় ও শক্তিশালী হয় এবং সেই রাষ্ট্রটি যদি শত্রুভাবাপন্ন হয়, তখন ওই শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সব সময়ই একধরনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে—যা যেকোনো সময় যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
তবে এ ধরনের প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার কিছু কৌশলগত সুবিধাও রয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া, অস্ত্র ও প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সাইবার নিরাপত্তায় সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এককভাবে এসব সক্ষমতা গড়ে তুলতে যে বিপুল ব্যয় প্রয়োজন, জোটের মাধ্যমে তা ভাগ করে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে জোট ছোট রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও দরকষাকষির ক্ষমতাও বাড়াতে পারে। একা যে রাষ্ট্র যতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কয়েকটি রাষ্ট্রের সম্মিলিত শক্তির অংশ হলে তার প্রভাব ও কৌশলগত বিকল্পও তত বাড়ে।
তবে সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার মূল ঝুঁকি হলো অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা। নিজে আক্রান্ত না হলেও জোটভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে সেটিকে নিজের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করে সেই অনুযায়ী সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে করে প্রতিটি দেশকেই তার সামরিক শক্তি বাড়াতে হয়। অর্থাৎ বাজেটে প্রতিরক্ষা খাত বরাদ্দ বেশি থাকতে হয়। অনেক সময় সামরিক শক্তি বাড়াতে গিয়ে জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ কাটছাঁট করতে হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশকে।
ধরা যাক, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে সই করল এবং একপর্যায়ে সদস্যরাষ্ট্র পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। তখন বাংলাদেশ সেই সংঘাতের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বা সামরিক দায় থেকে পুরোপুরি বাইরে থাকতে পারবে না। যদি পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে হয়, তাহলে ইতিহাসের এক গভীর পরিহাস তৈরি হবে। ১৯৭১ সালে যে ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই বাংলাদেশই পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে পারে। এমনকি কেউ কেউ একে ১৯৭১-এর ‘প্রতিশোধ’ হিসেবেও দেখাতে পারেন। কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার সুফল যেমন আছে, তেমনি রয়েছে অন্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। সেই ঝুঁকি সামাল দেওয়ার মতো সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বাংলাদেশের আদৌ আছে কি না—সিদ্ধান্তের আগে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার।
একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া এমন সিদ্ধান্ত নয় যে চাইলেই তা থেকে সরে আসা যাবে। এর সামরিক ও কূটনৈতিক দায় বহন করতে হবে ভবিষ্যৎ সরকার ও প্রজন্মকেও। তাই এমন সিদ্ধান্তে শুধু দলীয় সম্মতি নয়, প্রয়োজন বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা চলছে। এর মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না, সেটি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে। গত ২৭ আগস্ট বিকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিন বিকালে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মূলত বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষা ব্যবস্থা। এতে অন্য কারো উদ্বেগের অবকাশ নেই।’ চুক্তিতে যোগ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক হলেও এ নিয়ে এখনো আলোচনার সময় আসেনি বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুজন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এই জোটে যোগ দিতে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সৌদি আরব, যদিও আমন্ত্রণের ধরন স্পষ্ট নয়। এর মধ্যে গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানান ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। অন্যদিকে গত ২৭ আগস্ট পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, নতুন কোনো দেশ মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিতে চাইলে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পরামর্শ করে তা বিবেচনা করা হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া, সেখান থেকে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নেতাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের অস্পষ্ট অবস্থানসহ নানা কারণে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা, আওয়ামী লীগ আমলে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সীমান্ত হত্যা, নদীর পানি বণ্টন ও ভারতের কথিত ‘দাদাগিরি’ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নতুন ও জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি সত্যিই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হবে? যদি হয় তাহলে এটি হবে বাংলাদেশের জন্য কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে অংশগ্রহণের প্রথম ঘটনা—যা ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—বাংলাদেশের এই নীতির পরিপন্থি।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এই পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার ও নিরস্ত্রীকরণ, প্রতিটি জাতির নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণের অধিকার এবং সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থনের কথাও বলা হয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর যে সংবিধান গৃহীত হয়, সেখানে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাখ্যা এভাবেই ছিল। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যখন সংবিধানে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। সেখানে সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে একটি নতুন উপদফা যুক্ত করে বলা হয়: রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবেন। তবে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়ে অনুচ্ছেদটি বাহাত্তরের আলোকে ফিরিয়ে আনা হয়। অর্থাৎ বর্তমানে যে সংবিধানে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে ‘ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার’ করার বিষয়টি নেই।
বিএনপি যদি অষ্টাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে পরিবর্তন আনে, তাহলে সম্ভবত ২৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে জিয়াউর রহমানের আমলে গৃহীত পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বহাল করে ‘মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদারের’ বিষয়টি যুক্ত করবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রধান করে এরইধ্যে সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিরোধী দলের কাছে নাম চাওয়া হলেও তারা এই কমিটিতে কারো নাম দেয়নি। গত ৪ আগস্ট কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, জুলাই সনদ, বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতির আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হবে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সরকারের আগ্রহের পেছনে জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব আছে বলে মনে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যার একটি দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়া যেমন মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেও তেমন একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি চুক্তিটিকে ‘মুসলিম বিশ্বের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বাংলাদেশ এর অংশ হতে আগ্রহী বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বলেছেন, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বহুমাত্রিক করতে সরকার কাজ করবে।
পররাষ্ট্রনীতিসম্পর্কিত সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তন করা হলেও কোনো প্রতিরক্ষা বা সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করা জরুরি। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বড় ঝুঁকি হলো, ন্যাটোর আদলে এতে কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করার বিধান রয়েছে। প্রতিক্রিয়ার ধরন অভিন্ন না হলেও প্রত্যেক সদস্যকে তা মোকাবিলায় ভূমিকা নিতে হবে, যার মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে কিংবা জোটভুক্ত কোনো দেশ অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে বাংলাদেশও তার অংশীদার হয়ে পড়তে পারে। সামরিক সক্ষমতায় সীমিত এবং প্রায় ২০ কোটি মানুষের চাপ সামলানো দুর্বল অর্থনীতির বাংলাদেশের জন্য এমন জোটে যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত কী অর্জন হবে—সেটিই তাই বড় প্রশ্ন। আর কোন সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে দুর্বল অর্থনীতির দেশের জন্য বেশি।
এই ধরনের সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো শত্রু বা সম্ভাব্য শত্রুর কাছ থেকে সমীহ আদায় করা এবং আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করে। আবার উল্টোও হতে পারে। যেমন সামরিক জোটে যোগদানকারী কোনো দেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র যদি তুলনামূলকভাবে বড় ও শক্তিশালী হয় এবং সেই রাষ্ট্রটি যদি শত্রুভাবাপন্ন হয়, তখন ওই শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সব সময়ই একধরনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে—যা যেকোনো সময় যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
তবে এ ধরনের প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার কিছু কৌশলগত সুবিধাও রয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া, অস্ত্র ও প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সাইবার নিরাপত্তায় সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এককভাবে এসব সক্ষমতা গড়ে তুলতে যে বিপুল ব্যয় প্রয়োজন, জোটের মাধ্যমে তা ভাগ করে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে জোট ছোট রাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও দরকষাকষির ক্ষমতাও বাড়াতে পারে। একা যে রাষ্ট্র যতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কয়েকটি রাষ্ট্রের সম্মিলিত শক্তির অংশ হলে তার প্রভাব ও কৌশলগত বিকল্পও তত বাড়ে।
তবে সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার মূল ঝুঁকি হলো অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা। নিজে আক্রান্ত না হলেও জোটভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে সেটিকে নিজের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করে সেই অনুযায়ী সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে করে প্রতিটি দেশকেই তার সামরিক শক্তি বাড়াতে হয়। অর্থাৎ বাজেটে প্রতিরক্ষা খাত বরাদ্দ বেশি থাকতে হয়। অনেক সময় সামরিক শক্তি বাড়াতে গিয়ে জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ কাটছাঁট করতে হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশকে।
ধরা যাক, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে সই করল এবং একপর্যায়ে সদস্যরাষ্ট্র পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। তখন বাংলাদেশ সেই সংঘাতের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বা সামরিক দায় থেকে পুরোপুরি বাইরে থাকতে পারবে না। যদি পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে হয়, তাহলে ইতিহাসের এক গভীর পরিহাস তৈরি হবে। ১৯৭১ সালে যে ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই বাংলাদেশই পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে পারে। এমনকি কেউ কেউ একে ১৯৭১-এর ‘প্রতিশোধ’ হিসেবেও দেখাতে পারেন। কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার সুফল যেমন আছে, তেমনি রয়েছে অন্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। সেই ঝুঁকি সামাল দেওয়ার মতো সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বাংলাদেশের আদৌ আছে কি না—সিদ্ধান্তের আগে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার।
একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া এমন সিদ্ধান্ত নয় যে চাইলেই তা থেকে সরে আসা যাবে। এর সামরিক ও কূটনৈতিক দায় বহন করতে হবে ভবিষ্যৎ সরকার ও প্রজন্মকেও। তাই এমন সিদ্ধান্তে শুধু দলীয় সম্মতি নয়, প্রয়োজন বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক
.png)

যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে। সমাজে মূল্যবোধের সংকট আছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই উদ্বেগ থেকে দেশের নাটক-সিনেমা থেকে প্রেমের গল্প বাদ দেওয়ার দাবি উঠলে প্রশ্নটি আর শুধু একটি রিটের থাকে না। তখন প্রশ্ন ওঠে—প্রেমের গল্প কি সত্যিই তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ? আর কোনো
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুক্তবাজার অর্থনীতি মানে শুধু উন্নয়ন নয়; একইসঙ্গে অসমতার দ্রুত বিস্তার। শহরের গ্লাস টাওয়ার আর গ্রামের অনিশ্চিত শ্রম—এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু কখনো একই ফ্রেমে সমানভাবে ধরা পড়ে না। উন্নয়ন হয় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলো—কার জন্য?
৫ ঘণ্টা আগে
বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় যেসব ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে, সেগুলো দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছেই প্রধান সমস্যা বলে বিবেচিত। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে দলটির সরকার গঠনের সময়ও আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য সহনীয় করে আনা ও জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণ মূল চ্যালেঞ্জ বলে বর্ণিত হয়েছিল।
২০ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি দেশে প্রসাধনসামগ্রী, তেল বা দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করলে এই আলোচনা খুবই জরুরি। ঠিক একইভাবে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মিশে থাকা আরও একধরনের ভয়ংকর রাসায়নিক সম্পর্কে পাঠকদের জানাতে ও সচেতন করতেই আমার এই লেখা।
২৮ আগস্ট ২০২৬