জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

৫২০০ টাকা মণ! কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্যে উৎপাদনে ধস খুলনার শিল্পাঞ্চলে

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
খুলনা

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬, ১৬: ২৯
দৌলতপুর জুট মিলে প্রায় দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। স্ট্রিম ডেস্ক

কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে খুলনা অঞ্চলের সরকারি ইজারার ও বেসরকারি পাটকলগুলো উৎপাদন সংকটে পড়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা পাটপণ্য উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এতে কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ওই কারখানাগুলোর বিপুল সংখ্যক শ্রমিক বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।

পাটকল মালিকরা জানান, মৌসুমের শুরুতে যে কাঁচা পাট মণপ্রতি প্রায় ৩২০০ টাকায় কেনা হয়েছিল, বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ৫২০০ টাকায়। দাম বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু বাজারে সে অনুপাতে পাটপণ্যের মূল্য বাড়েনি। ফলে পাটপণ্য উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

পাটকল মালিকদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কাঁচা পাট মজুত করে সিন্ডিকেট করায় দাম বেড়েছে। মজুতদাররাই এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের কারসাজির কারণে মূল্য আরও বাড়তে পারে। এতে কারখানা মালিকরা বিপাকে পড়েছেন।

পাট রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজেএএর সাবেক চেয়ারম্যান ফরহাদ আহমেদ আকন্দ বলেন, দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় পাটকল মালিকদের পক্ষে বাজার থেকে কাঁচা পাট কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের একটি অসাধু মহল কাঁচা পাট মজুত করে রেখেছে। তারাই মূলত বাজার অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এর ফলে দাম বেড়েছে। মজুতদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারাও বাজারে পাট ছাড়ছেন না।

তিনি আরও বলেন, আরও নানা সংকট রয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যায় না ঠিকমতো। এসব কারণে এই খাত এখন ধুঁকছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চলে সরকারি ইজারাকৃত ও বেসরকারি মিল মিলিয়ে মোট ২০টি পাটকল রয়েছে। এসব পাটকলে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদিত হয়। যার বড় একটি অংশ বিদেশে রপ্তানি হয়। তবে বর্তমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও রপ্তানি, দুই ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত দুই বছর ধরে বিভাগের ১০ জেলায় উৎপাদন প্রায় একই রয়েছে। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল নিয়ে খুলনা অঞ্চলের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৩৯ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে ৯৪ হাজার ৬৬৬ মেট্রিক টন কাঁচা পাট উৎপাদন হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৩৮ হাজার ২৬৮ হেক্টর জমিতে পাট উৎপাদন হয়েছে ৯১ হাজার ১৩৫ মেট্রিক টন।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, খুলনার দৌলতপুর এলাকার দৌলতপুর জুট মিলে প্রায় দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কাঁচা পাটের সংকটে শ্রমিকরা প্রতিদিন মিলে এসে কাজ না করেই সময় কাটাচ্ছেন।

পাটকলটির উৎপাদন কর্মকর্তা মো. ইসরাফিল মল্লিক বলেন, আগে ৩২০০ টাকা মণ দরে পাট কিনে প্রতিটি বস্তা আমরা ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতাম। সবশেষ ৪০০০ টাকা দরেও পাট কিনে আমরা কারখানা চালিয়েছি। লোকসান হলেও শ্রমিকদের দিকে তাকিয়ে কারখানা চালু রেখেছিলাম। কিন্তু এখন পাটের দাম ৫২০০ টাকা প্রতি মণ।

তিনি বলেন, এখন একটা বস্তা তৈরিতে খরচ হচ্ছে ১২০ টাকারও বেশি। কিন্তু ৮০ টাকার উপরে বিক্রয় মূল্য নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমরা গত দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছি।

কাঁচা পাটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এ বছর কাঁচাপাটের উৎপাদন মোটেও গত বছরের তুলনায় কম নয়। অথচ উৎপাদন কম হয়েছে জানিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধি করে রেখেছেন। সরকার যদি এটা তদারকি না করে তাহলে আমাদের কারখানা চালানো সম্ভব হবে না।

ফরচুন গ্রুপের মালিকানায় থাকা সরকারি দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিক কালাম সিকদার বলেন, গত প্রায় দেড় মাস ধরে মিলে আসি, বসে থাকি, কোনো কাজ নেই। কাঁচা পাট না থাকায় মালিক কারখানা চালাতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কাজ হারাতে পারি। কাজ না থাকলে আমরা কীভাবে সংসার চালাবো?

একই মিলের আরেক শ্রমিক রমজান মৃধা বলেন, গত তিন বছর ধরে এই মিলটা ভালোই চলছিল। কিন্তু কাঁচা পাট না থাকায় গত দেড় মাস আমরা বসে আছি। মালিক নিজে না বাঁচলে আমাদের বাঁচাবে কী করে?

বাজার পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে পাট অধিদপ্তর। সংস্থাটির খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরজিত সরকার বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সরজিত বলেন, একজন আড়তদার বা ডিলার এক মাসে সর্বোচ্চ ৫০০ মণ পাট মজুত করতে পারবেন। বিষয়টি ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কী না, তা আমরা নিয়মিত তদারকি করি। কোথাও বেশি মজুত পাওয়া গেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। দাম সহনীয় রাখতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আশা করছি দ্রুতই পাটের বাজার সহনীয় হবে।

সম্পর্কিত