নওগাঁয় আউশ ধানের ফলনে আশা, দামে হতাশা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নওগাঁ

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কালিগ্রাম গ্রামের কৃষক মোজাফফর হোসেন নতুন তোলা আউশ ধান বিক্রি করতে এসেছিলেন আবাদপুকুর হাটে। তবে আশানুরূপ ফলনের আনন্দ তার উবে যায় বাজারে ধানের দাম শুনে।

মোজাফফর বলেন, ‘ধানের দাম খুব কম। এই দামে বিক্রি করলে চাষের খরচই উঠবে না। কিন্তু সংসারের খরচ তো চালাতে হবে। তাই বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।’

মোজাফফরের মতোই একই দুশ্চিন্তায় মহাদেবপুর উপজেলার মহিষবাতান গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন। ১২ মণ জিরাশাইল ধান নিয়ে উপজেলা সদরের হাটে গিয়েছিলেন তিনি। প্রতি মণ ৮৮০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘দাম শুনে আর কী হবে। আমাদের দুঃখ-কষ্ট কেউ দেখে না। ধান বাজারে আনতে ভাড়া দিতে হয়েছে। এখন বিক্রি না করে বাড়ি নিয়ে গেলে আবার ভাড়া লাগবে। অথচ গত বছর একই ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা বিক্রি করেছিলাম।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে নওগাঁয় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৪৭৩ হেক্টরে। কৃষি বিভাগের হিসাবে প্রতি একরে উৎপাদন খরচ পড়েছে গড়ে ৬৪ হাজার টাকা, যা বিঘাপ্রতি প্রায় ২১ হাজার টাকা।

জেলার হাটগুলোতে জিরাশাইল, কাটারি ও বিআর-২৮ জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকা দরে। কৃষকদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় জাতভেদে দাম কমেছে মণে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এদিকে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচও।

কৃষকদের হিসাবে চিত্রটি আরও কঠিন। বিঘাপ্রতি গড়ে ২০ থেকে ২২ মণ ধান পাওয়া গেলেও বর্তমান বাজারদরে এই ধান বিক্রি করে আয় হচ্ছে মাত্র ১৬ থেকে ১৯ হাজার টাকা। এতে ফলন ভালো হয়েও অনেক ক্ষেত্রে উঠছে না কৃষকের উৎপাদন খরচও।

ধান কাটার পরপরই কৃষকদের সামনে একসঙ্গে এসে পড়ে কয়েকটি আর্থিক চাপ—কারও ঋণের কিস্তি, কারও জমির বর্গার টাকা। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও নির্ভর করে ধান বিক্রির ওপর। তাই বাজারদর পছন্দ না হলেও ধান মজুত করে রাখার সুযোগ থাকে না এদের অনেকের সামনেই।

মান্দা উপজেলার মৈণম গ্রামের কৃষক দিলীপ দাস চার বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আউশ আবাদ করেছেন, চাষের জন্য নিয়েছেন সমিতির ঋণও। তিনি বলেন, ‘চার বিঘা জমিতে আউশ চাষ করতে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কমে যাওয়ায় ঋণের টাকা পরিশোধ এবং সংসারের ব্যয় মেটানো নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’

নওগাঁর চকগৌরি এলাকার ধান ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে ধানের বাজার নিম্নমুখী। আউশ ধান বাজারে আসার পর থেকেই দর কমতে শুরু করেছে। দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ ধানের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।’

তিনি জানান, বর্তমানে কাটারি ধান বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকায়, জিরাশাইল ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় এবং বিআর-২৮ ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা মণ দরে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি একর আউশ ধান উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা। প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে কৃষক লাভবান হতে পারতেন।’

তিনি আরও বলেন, উৎপাদক পর্যায়ে ধানের দাম কমলেও তার প্রভাব পড়ছে না স্থানীয় চালের বাজারে— মোটা ও সরু জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছে। এর ফলে দেশে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমেছে। সামনে আমন মৌসুমও রয়েছে। পরিস্থিতি এমন থাকলে আমন মৌসুমেও কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত