কুষ্টিয়ায় হামলা চালিয়ে পীর শামীমকে হত্যা

নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
দৌলতপুর ও কুষ্টিয়া

দৌলতপুরের ফিলিপনগরে শনিবার পীর শামীমের দরবারে হামলা। স্ট্রিম ছবি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিহত পীর শামীমের দরবার এখন ধ্বংসস্তূপ। একদিন আগেও যা ছিল সাজানো-গোছানো। গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) সেখানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রোববার (১২ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দীন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

শনিবারের হামলায় নিহত হন পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীর (৬৫)। তিনি উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকার মৃত জেছের আলী মাস্টারের ছেলে। এলাকায় তিনি গড়ে তোলেন ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যও ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছেন।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁকে (পীর শামীম) উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় পুলিশ সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

দৌলতপুরে পীর শামীমের দরবার পরিদর্শন করেন খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি। সংগৃহীত ছবি
দৌলতপুরে পীর শামীমের দরবার পরিদর্শন করেন খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি। সংগৃহীত ছবি

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এছাড়া দৌলতপুরের হোসেনাবাদের বাসিন্দা লালনশিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। যদিও শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।

ধর্ম অবমাননা শাস্তি দেশে প্রচলিত আইনেই হবে জানিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের আসা খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজ শেখ জয়নুদ্দিন বলেন, ‘যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাঁর (পীর) বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে আমাদের প্রচলিত আইনেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। এই ফিলিপনগর এলাকার মানুষের কাছ আমি চাইব, এখানে যেন আইনশৃঙ্খলার আর অবনতি না হয়। আমরা এর সঠিক বিচার করব।’

ঘটনার আগে প্রশাসনের কাছে গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, তথ্য পাওয়ার পরই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে পুলিশের ব্যর্থতার দায় তিনি নেননি। এখন পর্যন্ত কাউকে আটকও করা হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কাজ করছে বলে জানান তিনি।

এর আগে গতকাল সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিএনপি দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে। এই ঘটনায় কোনো ছাড় হবে না।

দৌলতপুরে পীর শামীমের দরবারে হামলা পর আগুন ঘরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা। স্ট্রিম ছবি
দৌলতপুরে পীর শামীমের দরবারে হামলা পর আগুন ঘরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা। স্ট্রিম ছবি

ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিজ গ্রামে

হামলায় দরবারের পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীর নিহত ছাড়াও আহত হয়েছেন তাঁর তিন অনুসারী। তাঁরা হলেন জুবায়ের, মোহন আলী ও জামিরুন নেছা। তাঁরা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

রোববার বেলা ১টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পীর শামীম জাহাঙ্গীরের মরদেহের ময়নাতদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হোসেন ইমাম জানান, গোটা শরীরে একাধিক জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মাথা, ঘাড়, পিঠে তুলনামূলক গভীর জখমের চিহ্নের আলামত দেখা যায়। মুখমণ্ডলে ১৫ থেকে ১৬টি ক্ষত চিহ্ন পাওয়া যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, জীবিতাবস্থায় পীর শামীম তাঁর প্রতিষ্ঠিত দরবার শরিফেই সমাহিত হতে চেয়েছিলেন। তবে নানা জটিলতায় পরিবার তাঁকে গ্রামের কবরস্থানে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেলা সাড়ে তিনটায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় কুষ্টিয়া থেকে মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়েছে।

দৌলতপুরে পীর শামীমের দরবারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা ইট। সংগৃহীত ছবি
দৌলতপুরে পীর শামীমের দরবারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা ইট। সংগৃহীত ছবি

ঘটনাস্থলের এখন যে অবস্থা

রোববার সকালে দরবারে গিয়ে দেখা যায়, দরবারের দুটি দালানের ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুরের পর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দুটি ঘর। যার মধ্যে একটিতে পীর নিজে বসবাস করতেন। সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সি নারী, পুরুষ, শিশু দরবারের এসে ঘুরে ঘুরে দেখছেন দরবারের ধ্বংসস্তূপ।

এলাকার লোকজন বলেন, গতকাল সকালে ঘোষণা দিয়ে শামীমের দরবার থেকে কিছু দূরেই আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে স্লোগান দিতে দিতে দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনার সময় কিছু পুলিশ সদস্য সেখানে উপস্থিতি ছিলেন।

এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কেউ মামলা করেনি জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহামুদ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা তারা দেখেছেন। ভিডিওটি পুরোনো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ... বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা আছে।

এর আগে শনিবার দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত স্থাপনাটিতে এ হামলার ঘটনা ঘটে। পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গতকাল পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সংবাদ পেয়ে ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে।

সম্পর্কিত