দুই বছরের মাথায় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় উদ্বোধন হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। বুধবার (৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সাবেক গণভবনে স্থাপিত এই জাদুঘরের উদ্বোধন ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

পরে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনীতে থাকা ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতন সংশ্লিষ্ট এবং অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বিভিন্ন নিদর্শন, আলোকচিত্র, দলিল ও স্মারক ঘুরে দেখেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, গণমানুষের অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের ইতিহাসভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অভ্যুত্থানের বীরত্বগাঁথা ও আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণা করে জুলাই যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনকে রূপান্তর করে গড়ে তোলা এই জাদুঘর এতদিন নানা জটিলতার কারণে চালু করা যায়নি। অবশেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। পরে ওই সরকারের অধীনেই জুলাইয়ের নানা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে সেই গণভবনে তৈরি করা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।

বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এর গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণ, সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই জাদুঘর।

আজ জাদুঘরটি শুধু আমন্ত্রিত অতিথি ও গণঅভ্যুত্থানে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে সাধারণ দর্শনার্থীরা অনলাইনে আবেদন করে জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন।

যা রয়েছে জাদুঘরে

এই জাদুঘরকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একদিকে শাসন-নিপীড়নের স্মারক ও নথি, অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের গবেষক হাসান ইনাম জানান, গণভবনের নিচতলায় একটি বিশেষ কক্ষ সাজানো হয়েছে ‘কলম রুম’ নামে, যেখানে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন বৈঠক করতেন। এই ঘরে গত ১৬ বছরের বিচারব্যবস্থা ধ্বংস করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর পরিচালিত নিপীড়ন, পিলখানার বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং গণমাধ্যমের ওপর অত্যাচারের ইতিহাস ছোট ছোট প্যানেলে তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, গণভবন থেকে উদ্ধার হওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো গোয়েন্দা তথ্য—যেমন কারা আন্দোলন পরিচালনা করছে, নিহতদের স্বজনদের রাজনৈতিক পরিচয় বা আন্দোলনের নেতৃত্ব কাদের হাতে ছিল। এছাড়া গত ১৬ বছরের বিভিন্ন নজরদারির নথিও প্রদর্শিত হচ্ছে। এমনকি যেসব র্যাব কর্মকর্তা ক্রসফায়ারে অংশ নিতে চাননি এবং অন্যত্র বদলির আবেদন করেছিলেন, সেসব নথিও এখানে স্থান পেয়েছে।

নিচতলার অন্যান্য কক্ষের বর্ণনায় গবেষক হাসান ইনাম বলেন, ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের শহীদদের স্মরণে একটি ডেডিকেটেড রুম রাখা হয়েছে, যেখানে তাদের স্মারক ও ছবি রয়েছে। একইভাবে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার ওপর একটি আলাদা ঘর রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের ঘটনা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) থেকে পাওয়া নির্যাতনের নানা উপকরণ—যেমন টর্চার চেয়ার ও ইলেকট্রিক শক দেওয়ার সরঞ্জাম প্রদর্শিত হচ্ছে। গুমের ভুক্তভোগীদের স্মারক নিয়ে সাজানো হয়েছে একটি পৃথক ঘর। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে থাকা বহুল আলোচিত সেই ‘লাল টেলিফোন’ও রাখা হয়েছে নিজ স্থানে।

দ্বিতীয় তলায় শহীদদের স্মৃতি ও গণমানুষের অংশীদারত্ব

দ্বিতীয় তলার পুরো প্রাঙ্গণে স্থান পেয়েছে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মারক। হাসান ইনাম জানান, এখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের নানা মুহূর্ত, ছবি ও গল্প স্থান পেয়েছে। আন্দোলনের নারীদের ভূমিকা ফুটিয়ে তুলতে ‘জুলাই উইমেন’ নামে একটি আলাদা কক্ষ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিবিসি, মনসুন আর্কাইভ, প্রথম আলো ও বাংলাদেশ ফটো আর্কাইভসহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য মাধ্যমের সংবাদ ও ছবির আর্কাইভ নিয়ে একটি আলাদা রুম তৈরি করা হয়েছে।

অন্য একটি কক্ষে শহীদদের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, তাদের ও তাদের মায়েদের আলোকচিত্র রাখা হয়েছে। ওপরতলায় দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে একটি ছোট লাইব্রেরি, যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের ইতিহাসসংক্রান্ত বইপত্র পড়ে দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আসবাবপত্র ও উদ্ধার হওয়া সামগ্রী

গণভবনের অভ্যন্তরীণ অবস্থা নিয়ে হাসান ইনাম জানান, জাদুঘরে নতুন কোনো আসবাবপত্র তেমন কেনা হয়নি। গণভবনে শেখ হাসিনার ব্যবহৃত আসবাবপত্রের ওপরই গ্যালারি সাজানো হয়েছে। শেখ হাসিনার খাটে ও তাক বা শেলফে রাখা হয়েছে শহীদদের জিনিসপত্র এবং খাটে লিখে রাখা হয়েছে শহীদদের নাম।

অন্যদিকে, ৫ আগস্ট গণভবন থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া নানা শাড়ি-কাপড় ও বিভিন্ন সামগ্রীর প্রায় অর্ধেকের মতো সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় ফেরত দিয়ে গেছেন, আর যা পাওয়া যায়নি তা অন্যান্য জিনিস দিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে।

প্রাঙ্গণে প্রতীকী কবর ও আয়নাঘর

ভবনের বাইরের খোলা প্রাঙ্গণ নিয়ে হাসান ইনাম জানান, বাইরে তৈরি করা হয়েছে চার হাজার প্রতীকী কবর। বিগত ১৬ বছরে নিহত, শহীদ ও গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে এই কবরগুলো তৈরি করা হয়েছে, যেগুলোর ফলকে চার হাজার মানুষের নাম রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে গোপন নির্যাতনকেন্দ্র ‘আয়নাঘর’-এর তিনটি ভিন্ন ধরনের

কনটেন্ট রাখবে না। এর কারণও তারা বলে না। জিজ্ঞেস করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

যেভাবে যাবেন

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে সর্বসাধারণ টিকিট কেটে জাদুঘরে ঢুকতে পারবেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকিট মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, একসঙ্গে অনেক দর্শনার্থী প্রবেশ করলে জাদুঘরের পক্ষে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক দর্শনার্থীর জন্য সময়ভিত্তিক স্লট বরাদ্দ থাকবে। অনলাইনে আবেদন করে যে স্লট পাওয়া যাবে, সে সময়েই দর্শনার্থীদের জাদুঘরে প্রবেশ করতে হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত