নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন: অর্ধযুগেও আপিল নিষ্পত্তি হয়নি

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৩: ০৬
শীতলক্ষ্যা নদীর মোহনায় একে একে ভেসে ওঠে মরদেহ। ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ১২ বছর পূর্ণ হলো আজ। এক যুগ পেরিয়ে গেলেও আইনি জটিলতা ও আসামিপক্ষের সারসংক্ষেপ জমা দিতে বিলম্বের কারণে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলাটি এখনো ঝুলে আছে। ২০১৮ সালের রায়ের পর দণ্ডিতরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল ও লিভ টু আপিল দায়ের করলে ২০১৯ সাল থেকে মামলাটি সেখানে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২০১৯ সালে দণ্ডিত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। আদালতের নিয়ম অনুযায়ী, শুনানির আগে আপিলকারী পক্ষকে মামলার সারসংক্ষেপ জমা দিতে হয়। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর আপিল বিভাগ তাদের এই নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা এখনো তা সম্পন্ন করেননি।’

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও যোগ করেন, ‘আপিলকারীরা সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপক্ষ তাদের অংশ জমা দেবে। আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করছি, রাষ্ট্রপক্ষ এই বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক এবং আমরা দ্রুততম সময়ে শুনানি শেষ করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—দোষীরা যেন সাজা পায় এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন অন্যায়ের শিকার না হয়।’

মামলার বর্তমান অগ্রগতি ও সারসংক্ষেপ জমা না দেওয়া প্রসঙ্গে দণ্ডিত আসামি মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের আইনজীবী এস এম শাহজাহান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আরিফ আমার দীর্ঘদিনের মক্কেল। আগে তার স্ত্রীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হতো, তবে জানতে পেরেছি তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার বিষয়ে এখনো মক্কেলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা (ইনস্ট্রাকশন) পাইনি। নির্দেশনা পাওয়ামাত্রই আমরা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু করব।’

অন্যদিকে, আরেক দণ্ডিত আসামি লে. কমান্ডার (অব.) মাসুদ রানার আইনজীবী ফরহাদ আব্বাস স্ট্রিমকে বলেন, ‘এই মামলার নেপথ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। প্রকৃত দায়ীদের আড়াল করে অনেক নিরীহ মানুষকে এতে ভুক্তভোগী করা হয়েছে। এখন আপিল শুনানি হওয়া না হওয়া বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।’

‘ধৈর্য ভেঙে গেছে, আর কত চোখের পানি ঝরাব’

ন্যায়বিচারের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা সবচেয়ে বেশি ভারী হয়ে চেপেছে নিহতদের স্বজনদের ওপর। নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী নূপুর গত ১২ বছর এক অসম সংগ্রামে লিপ্ত। বিয়ের মাত্র ১০ মাসের মাথায় যখন স্বামীকে হারান, তখন তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

নিজের হতাশার কথা তুলে ধরে নূপুর স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের ধৈর্য ভেঙে গেছে। আর কত চোখের পানি ঝরাব? আমার মেয়ে রোজা এখন বড় হয়েছে, সে তার তিন চাচাকে বড় আব্বু-মেজো আব্বু বলে ডাকে। ১০-২০ টাকা পেলে সেটাকেই বাবার ভালোবাসা মনে করে। একটা চাকরি করে মাসে ১০-১২ হাজার টাকা উপার্জন করি। এই টাকায় সংসার চলে না। কেউ আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।’

একইভাবে হতাশা প্রকাশ করেছেন মামলার অন্যতম বাদী ও নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। আপিল বিভাগে আসামিপক্ষের বারবার সময় প্রার্থনায় রায় ঝুলে থাকা প্রসঙ্গে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা হতাশায় ভুগছি যে আদৌ বিচার পাব কি না। আসামিপক্ষ অনেক শক্তিশালী। ওরাই টাকা দিয়ে মামলাটিকে আটকে রাখে, ফাইলটা নিচে দাবিয়ে রাখে।’

নিজের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বিউটি বলেন, ‘সব সময়ই শুনতে পাই যে আসামিরা বেরিয়ে আসছে। তারা বেরিয়ে এলে তো আমাকেই আগে ধরবে। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে আমিই দাঁড়িয়েছিলাম। আজ ১২টা বছর হয়ে গেল, এখনো বিচার শেষ হলো না।’

আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণের দাবি ও আইনি বাস্তবতা

দীর্ঘ এক যুগ ধরে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সাতটি পরিবারই চরম দুর্দশায় রয়েছে। সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নূপুর— উভয়েই খুনি আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিউটি বলেন, ‘পরিবারগুলোর এখন অনেক করুণ অবস্থা। সরকারের কাছে দাবি, ওই খুনিদের এত এত টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে যেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করা হয়, যাতে তারা অন্তত সচ্ছলভাবে সন্তান নিয়ে চলতে পারে।’

তবে বর্তমান আইনি কাঠামোতে আসামির সম্পত্তি ক্রোক করে ভুক্তভোগীকে সরাসরি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী মনজিল মোরসেদ।

তিনি বলেন, ‘দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আসামির হয় ফাঁসি হবে, না হয় সে খালাস পাবে। আদালত থেকে ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আইনি সুযোগ নেই। তবে সরকারের সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির আওতায় ভুক্তভোগীদের প্লট, ফ্ল্যাট বা আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব, যা সম্পূর্ণ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।’

২০০৭ সালে এইচআরপিবির পক্ষ থেকে উন্নত বিশ্বের আদলে ‘ভিকটিম কমপেনসেশন ল’ বা ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘১২ বছরেও কোনো সুরাহা হয়নি-এ কথা পুরোপুরি ঠিক নয়। বরং ১২ বছরের মধ্যে মামলাটি আপিল বিভাগ পর্যন্ত আসতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার। দ্রুত বিচার কেবল ফাস্ট ট্র্যাক বা ভিআইপিদের ক্ষেত্রে ঘটে।’

হত্যাকাণ্ডের পর ফতুল্লা মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও ২১ আসামির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পর ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে নূর হোসেন এবং র‍্যাবের চাকরিচ্যুত ১৬ শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অধস্তন আদালতের সেই রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ১ হাজার ৫৬৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।

হাইকোর্টের রায়ে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবনসহ বাকি ৯ জনের কারাদণ্ড বহাল থাকে। ২০১৮ সালের সেই রায়ের পর দণ্ডিতরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল ও লিভ টু আপিল দায়ের করলে ২০১৯ সাল থেকে মামলাটি সেখানে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ আসামিপক্ষের আইনজীবীর সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেন। তবে আদালতের সবশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী আপিলকারী পক্ষ এখনো সারসংক্ষেপ জমা না দেওয়ায় বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে।

সম্পর্কিত