কক্সবাজারে বাড়ছে পানিবাহিত রোগ, বেরিয়ে আসছে বন্যার ক্ষত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
কক্সবাজার

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ২১: ৪০
কক্সবাজারের চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পানিবাহিত রোগীর ভিড়। স্ট্রিম ছবি

সপ্তাহব্যাপী টানা বৃষ্টিতে হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায় কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার করাইয়াঘোনার বাসিন্দা কামাল উদ্দিনের (৬২) বাড়ি। বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেলে কামাল উদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, বন্যায় চার দিন বাড়িতে আটকে ছিলাম। বের হওয়ার উপায় নাই। জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগছি। এখন ডাক্তার বলছেন, নিউমোনিয়া হয়েছে। নিজেও বিছনায় পড়লাম, বাড়িঘরও এলোমেলো হয়েছে। কোনটা সামাল দেব!

ওই দিনই হাসপাতালে পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন জেলার নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুইত্যাখালী গ্রামের আবু তাহের (৩৮)। তিনি ভর্তি হয়েছেন সর্দি-কাশি নিয়ে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে একই ওয়ার্ডে আজ ভর্তি হয়েছেন চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের শাহ ওমর নগরের সাদ্দাতুল রাবিন (২০)।

১০০ শয্যার চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আজ ১১২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশু ৬৩ জন, নারী ২৯ ও পুরুষ ১০ জন। ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬০ জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। বাকিরা ডায়রিয়া, সর্দি-কাশিসহ অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছেন বলে জানান হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স (ইনচার্জ) মর্জিনা আক্তার।

চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মিসকাত উদ্দীন আহমদ বলেন, বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের মধ্যে নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ও চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। হাসপাতালের পাশাপাশি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মোবাইল মেডিকেল টিম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে।

গত ৪ থেকে ১২ জুলাই কক্সবাজারে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত রোববার রাত থেকে বন্ধ হয়েছে বৃষ্টিপাত। আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবুদল হান্নান জানান, সোমবার বেলা ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে কেবল ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

কক্সবাজার সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই রাত থেকে রোববার রাত পর্যন্ত জেলায় টানা বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড়ধস, ঢলের পানিতে ডুবে ও দেয়ালচাপায় ১৫ রোহিঙ্গাসহ অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যার পানি নামার পর থেকে দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের হার চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায়। এর মধ্যে চিকিৎসা নিতে অনেকেই হাসপাতালে ভিড় করছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলায় ৮৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ১৬টি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ৭২টি টিম কাজ করবে। মেডিকেল টিম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চিকিৎসাসেবা, রোগ নজরদারি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ২ লাখ ৮৫ হাজার প্যাকেট ওরস্যালাইন, ৮ হাজার ৮৯০ ব্যাগ কলেরা স্যালাইন, ১ লাখ ৫৫ হাজার ১৭০টি জিংক ট্যাবলেট, ২৪ লাখ পানি বিশুদ্ধীকরণ ট্যাবলেট, ১৫ হাজার ৩৩৩ ব্যাগ নরমাল স্যালাইনসহ পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধ মজুত রয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ছাবের জানান, বন্যা-পরবর্তী ডায়রিয়া, কলেরা, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা জরুরি ওষুধের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখায় অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হয়েছে। সম্ভাব্য পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক রোগ নজরদারি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বেরিয়ে আসছে বন্যার ক্ষত

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রবল বৃষ্টিপাতে জেলার ১০টি উপজেলার ৪৯ শতাংশ এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে দেড় শতাধিক গ্রামে পানিবন্দি ছিল অন্তত আড়াই লাখ মানুষ।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য মতে, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদী পাড়ের চকরিয়া, পেকুয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলার ৪০ ইউনিয়ন। এ ছাড়া রামু, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও, সদর, উখিয়া ও টেকনাফে বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেতখামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য মতে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির সংখ্যা ১ হাজার ৬১৩, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩০, সেতু ও কালভার্ট ৭৯। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার।

এর মধ্যে চকরিয়ায় সাতজনের মৃত্যু ছাড়াও ৩০০ বসতবাড়ি, ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক, ২০ সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলায় একজনের মৃত্যু ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৯০ বসতবাড়ি, ১৯০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০ সেতু ও কালভার্ট। পেকুয়ায় দুজনের মৃত্যু ছাড়াও ৪৫০ বাড়িঘর, ১৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ২ সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহেশখালীতে একজনের মৃত্যু ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০০ বসতবাড়ি, ১২০০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু। এ ছাড়া রামু, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও, সদর, উখিয়া ও টেকনাফে বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খেতখামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, বন্যাদুর্গত এলাকার জন্য ৪৫০ মেট্রিকটন চাল ও ৩০ লাখ নগদ অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৯৮ মেট্রিক টন চাল ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। আরও ত্রাণের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ি ঢল ও সৃষ্ট বন্যায় বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধের ৪০ জায়গায় ভেঙেছে। মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালীর একটি স্থানে ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। পানি কমে যাওয়ার পর এসব এলাকা জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত