বড় পরিসরে কবি নজরুলের জীবনীগ্রন্থ লেখার পরিকল্পনা করছে নজরুল ইনস্টিটিউট

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ১৯: ০৫
নজরুল ইনস্টিটিউট। স্ট্রিম ছবি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের যে জীবনীগ্রন্থগুলো বাজারে পাওয়া যায়, সেগুলো সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ নয় বলে মনে করেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লতিফুল ইসলাম শিবলী।

কবির জীবনের বিভিন্ন বিতর্ক, প্রেম, বিয়েসহ নানা প্রসঙ্গ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে একটি বৃহৎ পরিসরের জীবনীগ্রন্থ রচনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এই কাজের জন্য দেশের ২০ থেকে ৩০ জন গবেষকের একটি প্যানেল বা বোর্ড গঠন করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। একদল গবেষক এটি লিখবেন এবং অন্য একটি প্যানেল তা রিভিউ করবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন লতিফুল ইসলাম শিবলী। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আজ রোববার (২৪ মে) তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও ভাবনার কথা জানান স্ট্রিমকে

লতিফুল ইসলাম শিবলী জানান, তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্যতম একটি কাজ ছিল কাজী নজরুল ইসলামকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কবির স্বীকৃতি দেওয়া। তিনি বলেন, ‘জাতীয় কবি হিসেবে আমরা এতদিন যা জানতাম, সেটা আসলে মুখে মুখেই ছিল। এটার কোনো অফিশিয়াল স্বীকৃতি বা দলিল ছিল না। দায়িত্ব নেওয়ার চার মাসের মধ্যে আমরা এই কাজটি সম্পন্ন করতে পেরেছি।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

শিবলী জানান, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে সচেতনভাবেই কবিকে অবহেলা করা হয়েছে এবং জাতীয় কবি হিসেবে অফিশিয়াল স্বীকৃতি দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তবে এর আগের সময়েও উদ্যোগের অভাব ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি অরাজনৈতিক সরকারের সময়ে তিনি কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।

শিবলী জানান, দীর্ঘ ৪০ বছরে নজরুলের লেখাগুলোর ইংরেজি অনুবাদের কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি নজরুলের নির্বাচিত রচনার দুই খণ্ডের ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ ‘কুইনটিসেন্স অব নজরুল’ প্রকাশ করা হয়েছে। এটি একটি দ্বিভাষিক (বাংলা ও ইংরেজি) সংকলন।

এই প্রকাশনার সূত্র ধরে গতকাল শনিবার (২৩ মে) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে বইটি তুলে দেওয়া হয়েছে এবং ‘কালচারাল ডিপ্লোমেসি থ্রু আওয়ার ন্যাশনাল পোয়েট’ (আমাদের জাতীয় কবির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কূটনীতি) শিরোনামে একটি প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নজরুলের নির্বাচিত রচনার দুই খণ্ডের ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ ‘কুইনটিসেন্স অব নজরুল’ প্রকাশ করা হয়েছে। স্ট্রিম ছবি
নজরুলের নির্বাচিত রচনার দুই খণ্ডের ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ ‘কুইনটিসেন্স অব নজরুল’ প্রকাশ করা হয়েছে। স্ট্রিম ছবি

শিবলী জানান, দেশের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ৪৪টি দেশের সাংস্কৃতিক চুক্তি রয়েছে। এই গেটওয়ে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় নজরুলের সাহিত্যকে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি ‘নজরুল সাহিত্যের বিশ্বযাত্রা’ শিরোনামে বইটির ওপর একটি সেমিনারও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গবেষণা, প্রকাশনা ও ডিজিটাল আর্কাইভ

নজরুল ইনস্টিটিউটে গবেষণার জন্য একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি রয়েছে। গবেষকদের সুবিধার্থে এই লাইব্রেরি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার প্রস্তুতি রয়েছে বলে শিবলী জানান। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্রগুলো ইনস্টিটিউটের রিভিউ কমিটির মাধ্যমে যাচাই করে বই আকারে প্রকাশ করা হয়। ইনস্টিটিউটের এ পর্যন্ত নিজস্ব প্রকাশনার সংখ্যা প্রায় ৪০০টি। শিবলী মনে করেন, একক কোনো বিষয়ের ওপর এই সংখ্যা কম নয়, তবে তিনি এতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন।

ইনস্টিটিউট থেকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় দুটি জার্নাল প্রকাশিত হয়। তবে এসব কার্যক্রমের প্রচার আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে স্বীকার করেন তিনি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যাপারে তিনি জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে (nazrulinstitute.org) একটি ডিজিটাল আর্কাইভ করা হয়েছে, যেখানে পাঠকেরা বইগুলো বিনামূল্যে পড়তে ও ডাউনলোড করতে পারবেন। পর্যায়ক্রমে সেখানে নতুন বইসহ ‘নজরুল সমগ্র’ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা

নজরুল ইনস্টিটিউটের নতুন ভবনটি সম্পন্ন হয়েছে এবং খুব দ্রুতই এর পুরো দায়িত্ব বুঝে পাওয়া যাবে। এই নতুন ভবনে একটি আধুনিক লাইব্রেরি, পাঠাগার, কনফারেন্স রুম, ডুপ্লেক্স মিউজিয়াম এবং নিচে একটি ক্যাফেটেরিয়া থাকবে। এছাড়া ইতিমধ্যে ৩০০ আসনের একটি অডিটোরিয়াম রেনোভেট বা সংস্কার করা হয়েছে, যেখানে নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানান লতিফুল ইসলাম শিবলী।

চুক্তি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

লতিফুল ইসলাম শিবলী দুই বছরের চুক্তিতে এই প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত আছেন। তিনি জানান, সরকার চাইলে তিনি কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী। বিশেষ করে সাংবাদিকতার কোর্সটি তিনি নিজের তদারকিতে সম্পন্ন করতে চান। আর যদি চুক্তি না বাড়ে, তবে তিনি তাঁর চেনা জগৎ—লেখালেখিতে ফিরে যাবেন। তবে তিনি এমন একটি ভিত্তি রেখে যেতে চান যাতে পরবর্তী সময়ে যে কেউ এসে কাজগুলো যেন সহজে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।

সম্পর্কিত