সংসদে ৩ বিলের প্রতিবেদন, ‘সক্রিয়’ শব্দ নিয়ে বিতর্ক

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০: ০৫
জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। ছবি: সংসদ বাংলাদেশ টিভি
জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। ছবি: সংসদ বাংলাদেশ টিভি

জাতীয় সংসদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিলের ওপর স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে বিরোধী দলের সদস্যের ভূমিকা হিসেবে ‘সক্রিয় অংশগ্রহণ’ কথাটি রাখা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সংসদের চলতি অধিবেশনের কার্যপ্রণালী অনুযায়ী বিল তিনটি উপস্থাপন করা হয়। বিলগুলো হলো—‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল আইন সংশোধন বিল ২০২৬’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের দাবি, তারা আলোচনায় সক্রিয় ছিলেন না; বরং বিলের দুর্বলতা ও সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে কমিটি থেকে ওয়াকআউট করেছিলেন। ফলে রিপোর্টে ‘সক্রিয়’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে ট্রেজারি বেঞ্চ ও বিরোধী দলের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক চলে।

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল ও মানবাধিকার কমিশন বিল

সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব ও ৭১ বিধির আলোচনা শেষে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ নৌশাদ জমীরকে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬’-এর ওপর স্থায়ী কমিটির রিপোর্ট উপস্থাপনের আহ্বান জানান।

বিলটি উপস্থাপন করে নৌশাদ জমীর বলেন, কমিটি গত ৩০ আগস্ট বৈঠকে মিলিত হয়ে বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করে। পরীক্ষাকালে বিরোধী দলের সদস্যদ্বয় ভিন্নমত পোষণ করে ইসলামিক স্কলার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। অতঃপর কমিটি সংশোধিত আকারে এটি পাসের সুপারিশ করে। ডেপুটি স্পিকারের ঘোষণার পর রিপোর্টটি সংসদে উত্থাপিত হয়।

এরপর নৌশাদ জমীর ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬’-এর রিপোর্ট উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বৈঠকে উপস্থিত থেকে কমিটির সব সদস্য বিলটি পরীক্ষায় ‘সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ’ করেন। তবে আলোচনার প্রারম্ভে বিরোধী দলীয় সদস্যদ্বয় বক্তব্য প্রদান না করে কমিটি কক্ষ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে কমিটি বিলটি সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করে।

‘সক্রিয়’ শব্দ নিয়ে নজিবুর রহমানের আপত্তি

নৌশাদ জমীরের বক্তব্যের পরপরই বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নজিবুর রহমান দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘রিপোর্টের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে আমি এবং আল ফারুক আব্দুল লতিফ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। আবার ৫ নম্বরে বলা হচ্ছে আমরা আলোচনা না করে কক্ষ ত্যাগ করেছি। এটি স্ববিরোধী। তিন নম্বরে সংশোধনী এনে বলতে হবে—আমরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করিনি।’

তিনি কমিটি ত্যাগের লিখিত যুক্তি সংসদে তুলে ধরে বলেন, ‘সরকার ভুক্তভোগী জনগণ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ রহিত করেছে। অধিকতর শক্তিশালী আইনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে অত্যন্ত দুর্বল ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড-বহির্ভূত বিল আনা হয়েছে। এছাড়া স্থায়ী কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বাধ্য করে কমিটিকে একটি ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই আমরা কোনো আলোচনায় অংশ না নিয়ে ওয়াকআউট করেছি। সুতরাং এখানে ‘সক্রিয়’ নয়, বড়জোর ‘নিষ্ক্রিয় অংশগ্রহণ’ লেখা যেতে পারে।’

এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সভাপতি নৌশাদ জমীর ব্যাখ্যা দেন যে, সদস্যরা বিলটি পরীক্ষার শুরুতে বক্তব্য দেওয়ায় সেটিকে ওই পর্যন্ত অংশগ্রহণ ধরে নিয়ে রিপোর্ট প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিতর্কে অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিরোধী দলীয় সদস্যরা যখন বক্তব্য দিয়েছেন এবং নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তার অর্থই হলো তারা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এরপর তারা ওয়াকআউট করলেও বাকি সদস্যরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই আলোচনায় অংশ নেননি—এমন দাবি তাদের নিজেদের বক্তব্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নোট অব ডিসেন্ট দেওয়ার এখতিয়ার সবার আছে। তবে ব্যারিস্টার নজিবুর রহমান যে বক্তব্যটি আজ সংসদে দিলেন, সেটি উত্থাপনের বিরোধিতার সময়েই দেওয়া যেত। কমিটির রিপোর্টে ‘সক্রিয়’ বা ‘নিষ্ক্রিয়’ শব্দ না লিখে শুধু ‘অংশগ্রহণ’ লিখলেই চলত। স্পিকার চাইলে তার ক্ষমতাবলে ‘সক্রিয়’ শব্দটি বাদ দিতে পারেন। যেহেতু লিখিতভাবে নোট অব ডিসেন্ট জমা দেওয়া হয়নি, তাই সেটি মূল রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত হয়নি; তবে আজকের এই আলোচনা সংসদের রেকর্ডে লিপিবদ্ধ থাকবে।’

বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘বিতর্কটি যতটুকু না আইনি, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। আমাদের সংসদ সদস্যের দাবি সামান্য—‘সক্রিয়’ শব্দটি বাদ দেওয়া হোক এবং তাদের লিখিত প্রতিবাদের বিষয়টি রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। অসম্পূর্ণ রিপোর্টকে সম্পূর্ণ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।’

স্পিকার এ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করে জানান, বিলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দফাওয়ারি আলোচনার সময় সব পক্ষ বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পাবে। এরপর মানবাধিকার কমিশন বিলের রিপোর্টটি সংসদে গৃহীত হয়।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে বিতর্ক

এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬’-এর রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, সালাউদ্দিন আহমেদ, মীর শাহ আলম, রফিকুল ইসলাম, মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, শিরিন সুলতানা, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ আব্দুল বাতেনসহ কমিটির সদস্যরা বিলটি পরীক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তবে বিরোধী দলের দুই সদস্য আলোচনার পূর্বেই বক্তব্য দিয়ে ওয়াকআউট করেন।

রিপোর্ট উপস্থাপনের পর কমিটির সদস্য ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল বাতেন ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘আমি এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল বাতেন শুরুতেই ওয়াকআউট করেছি। পূর্ববর্তী অধ্যাদেশ বাতিল করে যে নতুন বিল আনা হয়েছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বার্থকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং ভিকটিমদের স্বার্থ অবহেলিত হয়েছে। আমরা যেখানে আলোচনায় অংশই নিইনি, সেখানে ‘সক্রিয় অংশগ্রহণ’ শব্দটি কোনোভাবেই কার্যকর নয়। এটি বাদ দেওয়া দরকার।’

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, কমিটির রিপোর্টে এই ‘সক্রিয় অংশগ্রহণ’ শব্দ সংসদ সচিবালয়ের একটি ধরাবাঁধা বা কপি-পেস্ট ভাষা, এটি আমাদের আবিষ্কার নয়। স্পিকার ভবিষ্যতে চাইলে এটি পরিবর্তন করতে পারেন।

বিলের গুণগত মান নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এক বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অন্য বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করানোর বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি নির্ধারণ করবে আদালত, কোনো তদন্ত কর্মকর্তা নয়। বিলের সংশোধনীর সময় বিরোধী দল এগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনার সুযোগ পাবে।’

এ পর্যায়ে দীর্ঘ আট বছর তথাকথিত ‘আয়নাঘরে’ গুমের শিকার হওয়া বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন স্পিকার।

ব্যারিস্টার আরমান বলেন, ‘২০২৫ সালে জাতিসংঘ ও দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে যে অধ্যাদেশটি হয়েছিল, সেখানে জাতীয় কমিশনকে যেকোনো বন্দিশালায় বিনা নোটিশে প্রবেশের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। অথচ বর্তমান বিলে এমন এক আমলাতান্ত্রিক ও বিভ্রান্তিকর তদন্তপ্রক্রিয়া রাখা হয়েছে, যাতে গুমের বিচার হারিয়ে যাবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী জেনে-শুনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এই দায়মুক্তির বার্তা দিচ্ছেন যে—তোমরা যা খুশি করো, তোমাদের ধরার কেউ নেই। এটি অত্যন্ত অসদুদ্দেশ্যমূলক।’

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘২০২৫ সালের অধ্যাদেশে দীর্ঘসূত্রিতা ছিল এবং ভুক্তভোগীদের বহু ভোগান্তির শিকার হতে হতো। নতুন বিলে ভিকটিম বা তার পরিবারকে সরাসরি আদালতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় আমৃত্যু কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের বিধানসহ ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন এখনও বিনা নোটিশে যেকোনো স্থানে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে আদালতে প্রমাণযোগ্য তথ্যের ক্ষেত্রে আইনগত কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে। বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ নেই, আমরা আন্তর্জাতিক মানের এবং ফাঁকফোকরবিহীন একটি আইন করতে চাই।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত