ইশারা-ইঙ্গিত নয়, ভাষাই হোক নারী অভিবাসীদের রক্ষাকবচ

জীবিকার তাগিদে বিদেশে যাওয়া নারী অভিবাসীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ভাষাগত দুর্বলতার কারণে বাধ্য হন কেবল ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ চালাতে। ভাষাহীনতার এই নীরব সংকট পদে পদে তাদের বঞ্চনার শিকার করছে। একইসঙ্গে দেশে ফেরার পর তারা সামাজিকভাবে নিগৃহীতও হচ্ছেন। প্রবাসে তাঁদের নিরাপত্তা এবং দেশে ফেরার পর সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে ব্যবহারিক ভাষা প্রশিক্ষণ ও করণীয় নিয়ে লিখেছেন মহিব্বুল্লাহ আল মারুফ

মহিব্বুল্লাহ আল মারুফ
মহিব্বুল্লাহ আল মারুফ

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কাজের জন্য বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৩২ জনই গেছেন সৌদি আরবে, প্রায় সবাই গৃহকর্মী হিসেবে। অথচ ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে নারী অভিবাসনের হার ৪১ শতাংশ কমে গেছে।

সম্প্রতি আমি ঢাকার বাংলাদেশ-কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিকেটিটিসি)–এ বিদেশফেরত ২০০ জন নারী অভিবাসীর ওপর একটি জরিপ চালাই। তাঁদের প্রত্যেককে একটি সহজ প্রশ্ন করেছিলাম—আপনি যে পরিবারে কাজ করতেন, তাদের সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলতেন? উত্তরটি ছিল বিস্ময়কর। ৬৫ শতাংশ নারী বলেছেন, তাঁরা মূলত ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমেই কাজ চালিয়েছেন। আরবি নয়, ইংরেজিও নয়—শুধু হাতের অঙ্গভঙ্গি আর মুখের অভিব্যক্তি! মাত্র ২২ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা বেশির ভাগ সময় আরবিতে কথা বলতে পারতেন।

একবার ভাবুন। একজন নারী চার বছর ধরে রান্না করছেন, ঘর পরিষ্কার করছেন, শিশুদের দেখাশোনা করছেন, বয়স্ক মানুষের সেবা করছেন কিন্তু নিয়োগকর্তার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম কেবল হাতের ইশারা। প্রতিবছর বাংলাদেশ কার্যত এই নীরবতাকেই বিদেশে পাঠিয়ে চলেছে।

এই নীরবতার শুরু অবশ্য সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর নয়; শুরু হয় বাংলাদেশেই। বিদেশে যাওয়ার আগে ৪৫ শতাংশ নারী আরবিতে একটি শব্দও বলতে পারতেন না। আরও ৩৬ শতাংশ জানতেন শুধু কয়েকটি শব্দ বা ছোটখাটো বাক্য। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের চারজনেরও বেশি নারী এমন একটি বাড়িতে কাজ শুরু করেছেন, যেখানে নিজের কথা ঠিকমতো বোঝানোর সামর্থ্যই তাঁদের ছিল না।

পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই তাঁরা বিদেশে যান। তাই অভিবাসনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত মূল্যও তাঁদের জন্য অনেক বেশি। জরিপে দেখা গেছে, ১২ শতাংশ নারী দেশে ফিরেছেন তালাকপ্রাপ্ত বা স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। অনেক স্বামী বিদেশ থেকে ফেরা স্ত্রীকে আর গ্রহণ করতে চাননি, অথচ সেই স্ত্রীর পাঠানো অর্থ গ্রহণ করতে তাঁদের কোনো আপত্তি ছিল না।

পরে তাঁরা ভাষা শিখেছেন ঠিকই, কিন্তু সেটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নয়; টিকে থাকার প্রয়োজনে। দেশে ফেরার সময় তাঁদের প্রায় অর্ধেক আরবিতে কথোপকথন চালাতে পারতেন। এর সুফলও স্পষ্ট। যাঁরা ভালোভাবে আরবি বলতে শিখেছিলেন, তাঁদের ৪৫ শতাংশ অন্যের সাহায্য ছাড়াই নিয়োগকর্তার নির্দেশ বুঝতে পারতেন। সীমিত আরবি জানা নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। একইভাবে ২২ শতাংশ নারী নিজেরাই হেল্পলাইনে ফোন করতে পারতেন, যেখানে সীমিত ভাষাজ্ঞানসম্পন্নদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ।

শুধু তা-ই নয়, ভালো আরবি জানা নারীরা জানিয়েছেন, তাঁরা নিয়োগকর্তার কাছ থেকে বেশি সম্মান পেয়েছেন। নিজেদের চাহিদা ও সমস্যার কথা বেশি বলতে পেরেছেন এবং বিদেশে তুলনামূলক দীর্ঘ সময় কাজ করতে পেরেছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, অভিবাসী শ্রমিকের ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ভাষাজ্ঞান। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশ থেকে ফেরা গৃহকর্মীদের নিয়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি অন্তত এক ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমার জরিপ সেই বাস্তবতার একটি সংখ্যাগত চিত্র তুলে ধরেছে—ভাষাহীনতার মূল্য কতটা বড় হতে পারে।

এই নারীদের জীবন-বাস্তবতার দিকে তাকালেই পুরো ছবিটি আরও পরিষ্কার হয়। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের গড় বয়স ৩৪ বছর। প্রতি পাঁচজনের চারজনের বয়স ৩০ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে। প্রায় ৭০ শতাংশই বিবাহিত। তাঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক বা তারও কম। আর প্রতি চারজনের একজনের বেশি কখনোই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি। তিন-চতুর্থাংশ নারী আরবি হরফ পড়তে পারেন না। ফলে বইনির্ভর ভাষা প্রশিক্ষণ তাঁদের কাজে আসার কথা নয়।

তাঁদের বেশির ভাগই স্ত্রী ও মা। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই তাঁরা বিদেশে যান। তাই অভিবাসনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত মূল্যও তাঁদের জন্য অনেক বেশি। জরিপে দেখা গেছে, ১২ শতাংশ নারী দেশে ফিরেছেন তালাকপ্রাপ্ত বা স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। অভিবাসন নিয়ে কাজ করা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)–এর গবেষণাতেও একই চিত্র উঠে এসেছে। অনেক স্বামী বিদেশ থেকে ফেরা স্ত্রীকে আর গ্রহণ করতে চাননি, অথচ সেই স্ত্রীর পাঠানো অর্থ গ্রহণ করতে তাঁদের কোনো আপত্তি ছিল না।

নারীদের পুরো একটি ভাষা শেখানোর চেষ্টা না করে তাঁদের দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা শেখাতে হবে। যেমন রান্নাঘরের জিনিসপত্রের নাম, গৃহস্থালির কাজের শব্দ, খাবার, বিশ্রাম, অসুস্থতা, ওষুধ, কাজের সময় এবং বেতনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বাক্য। তাঁদের এমন ভাষা শেখাতে হবে, যা বাস্তব জীবনে তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগবে।

জরিপের একটি ফল আমাকে বিস্মিত করেছে। আরবি ভাষা জানলেই যে আয় বাড়ে, তার কোনো প্রমাণ মেলেনি। চুক্তিতে নির্ধারিত মাসিক মজুরির মধ্যম হার ছিল ১ হাজার সৌদি রিয়াল, আর বাস্তবেও অধিকাংশ নারী সেই পরিমাণই পেয়েছেন। যাঁরা সাবলীল আরবি বলতে পারতেন, তাঁদের আয় সীমিত ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন নারীদের চেয়ে বেশি ছিল না।

তবু ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ নারী বিশ্বাস করেন, আরবি ভালো জানলে তাঁদের বেতনও বাড়ত। বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত। সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মীদের মজুরি মূলত বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। সেখানে একজন কর্মীর দক্ষতা দিয়ে নির্ধারিত বেতন খুব একটা বদলানো যায় না। বরং সৌদি সরকার নিয়োগকর্তাদের নিয়োগ-ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা কমিয়েছে, কিন্তু গৃহকর্মীদের বেতন বাড়ায়নি।

তবে আরবি ভাষাজ্ঞানের প্রকৃত গুরুত্ব অন্য জায়গায়—নিজের অধিকার রক্ষায়। আর এখানেই সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের এক-চতুর্থাংশের বেশি চুক্তিতে উল্লেখিত বেতনের চেয়ে কম পেয়েছেন। আবার প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেতন দেরিতে দেওয়া হয়েছে বা আটকে রাখা হয়েছে।

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সৌদি আরব গৃহকর্মীদের বেতন 'মুসানেদ' প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইলেকট্রনিকভাবে পরিশোধ বাধ্যতামূলক করেছে। এর ফলে নগদ লেনদেনের পরিবর্তে প্রতিটি বেতন পরিশোধের ডিজিটাল রেকর্ড থাকবে। অর্থাৎ বেতন দেওয়া হয়েছে কি না, তা এখন সহজেই প্রমাণ করা সম্ভব। এটি নিঃসন্দেহে গৃহকর্মীদের জন্য একটি বড় সুরক্ষা। কিন্তু একজন নারী যদি নিজের ফোনে আসা বার্তা পড়তেই না পারেন, নিয়োগকর্তাকে নিজের অ্যাকাউন্ট নিবন্ধনের কথা বলতে না পারেন, কিংবা আরবিতে অভিযোগ জানাতে না পারেন, তাহলে এই ব্যবস্থার সুবিধা তাঁর কাছে খুবই সীমিত হয়ে যায়। কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা তখনই কার্যকর হয়, যখন ভুক্তভোগী সেটি ব্যবহার করতে পারেন।

জরিপে আমি নারীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিদেশে যাওয়ার আগে তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী। ৮০ দশমিক ৩ শতাংশ নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বিপরীতে মাত্র ১০ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি মজুরিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁদের কাছে নিরাপদ থাকা, বেশি আয় করার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আনন্দের বিষয় হলো, এই প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাংলাদেশের ইতিমধ্যেই রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের অর্ধেক কিছু না কিছু আরবি শিখেছিলেন। তাঁদের ৯২ শতাংশই সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

নীতির দিক থেকেও ঘাটতি নেই। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে যেতে ইচ্ছুক নারীদের জন্য ৩০ দিনের আবাসিক হাউসকিপিং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ নারী দুই সপ্তাহ বা তারও কম সময় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। আর মাত্র ৩৯ শতাংশ বলেছেন, সেই প্রশিক্ষণ তাঁদের কাজে লেগেছে। অর্থাৎ সমস্যা নীতিতে নয়, বাস্তবায়নে।

যেসব নারী তালাকপ্রাপ্ত বা স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশে ফিরেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে আবার বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় উন্নত জীবনের স্বপ্ন থেকে আসে না। বরং তা হয়ে ওঠে সামাজিক প্রত্যাখ্যান থেকে বাঁচার এবং নিজের জীবন নতুন করে গড়ার একটি পথ।

এই নারীরাই রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। অথচ একই সময়ে সামগ্রিক শ্রম অভিবাসন নেমে এসেছে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তাই তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানসম্মত প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা কোনো ব্যয় নয়; বরং দেশের অর্থনীতির জন্য একটি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।

তবু বাস্তবতা হলো, ৭৬ শতাংশ নারী বিদেশে গেছেন দালাল বা অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে। মাত্র ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ গেছেন লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে। তাই সরকারের উচিত বায়রার সঙ্গে সমন্বয় করে নিশ্চিত করা যে, অভিবাসনের পথে যেভাবেই কেউ আসুক না কেন, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রত্যেক নারী যেন বাধ্যতামূলক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।

আমার গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, সেটি কোনো প্রশ্নপত্রের অংশ ছিল না। বারবার নারীরা আমাকে বলেছেন, তাঁরা আবার সৌদি আরবে ফিরে যেতে চান। তবে এর কারণ এই নয় যে সেখানে তাঁদের জীবন সহজ ছিল। বরং অনেকের কাছে দেশে ফিরে আসার পরের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

অনেক নারী বলেছেন, দেশে ফিরে তাঁরা প্রতিবেশীদের কটূক্তি ও সন্দেহের মুখে পড়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, স্বামী তাঁদের আর গ্রহণ করতে চাননি। আবার অনেক পরিবার তাঁদের গর্বের কারণ হিসেবে দেখার বদলে সমাজের চোখে লজ্জার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে। একজন বিদেশফেরত নারী একটি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছে যেন সবাই ভাবছে তিনি কোনো অন্যায় করে এসেছেন।

যেসব নারী তালাকপ্রাপ্ত বা স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেশে ফিরেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে আবার বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় উন্নত জীবনের স্বপ্ন থেকে আসে না। বরং তা হয়ে ওঠে সামাজিক প্রত্যাখ্যান থেকে বাঁচার এবং নিজের জীবন নতুন করে গড়ার একটি পথ।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখে—আমরা কি শুধু নারীদের বিদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, নাকি তাঁদের নিরাপদ জীবন ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে আসার ব্যবস্থাও করছি?

এখন কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।

প্রথমত, নারীদের পুরো একটি ভাষা শেখানোর চেষ্টা না করে তাঁদের দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা শেখাতে হবে। যেমন রান্নাঘরের জিনিসপত্রের নাম, গৃহস্থালির কাজের শব্দ, খাবার, বিশ্রাম, অসুস্থতা, ওষুধ, কাজের সময় এবং বেতনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বাক্য। তাঁদের এমন ভাষা শেখাতে হবে, যা বাস্তব জীবনে তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগবে।

৭৬ শতাংশ নারী বিদেশে গেছেন দালাল বা অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে। মাত্র ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ গেছেন লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে। তাই সরকারের উচিত বায়রার সঙ্গে সমন্বয় করে নিশ্চিত করা যে, অভিবাসনের পথে যেভাবেই কেউ আসুক না কেন, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রত্যেক নারী যেন বাধ্যতামূলক পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।

দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। যেহেতু বেশির ভাগ নারী আরবি হরফ পড়তে পারেন না, তাই শুধু বইনির্ভর শিক্ষা কার্যকর হবে না। শুনে শেখা, কথা বলার অনুশীলন এবং বাস্তব পরিস্থিতির মাধ্যমে শেখানোই হবে বেশি কার্যকর।

তৃতীয়ত, সরকারের বিদ্যমান ৩০ দিনের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার নিয়মটি কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। বিদেশ যাওয়ার আগে বিএমইটির ছাড়পত্র পাওয়ার শর্ত হিসেবে এই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি একটি সংক্ষিপ্ত মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে প্রশিক্ষণের সনদ শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং বাস্তব দক্ষতার প্রমাণ দেয়।

বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও প্রশিক্ষণ অবকাঠামো ইতিমধ্যেই রয়েছে। আমার জরিপে দেখা গেছে, বিদেশফেরত নারীদের অর্ধেক এখন কাজ চালানোর মতো আরবি বলতে পারেন। অর্থাৎ শেখা সম্ভব—প্রয়োজন শুধু সঠিক পদ্ধতি ও পর্যাপ্ত সুযোগ।

প্রতিবছর বাংলাদেশ হাজার হাজার নারীকে বিদেশে পাঠায় গৃহকর্মের মতো কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজে। কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, বিদেশে যাওয়া নারীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত।

আমরা অন্তত এটুকু করতে পারি—তাঁদের এমন ভাষা শেখাতে পারি, যা বিপদের সময় তাঁদের কথা বলার শক্তি দেবে, নিজের অধিকার রক্ষার সুযোগ দেবে এবং তাঁদের জন্য এমন একটি দেশ নিশ্চিত করতে পারি, যেখানে ফিরে এসে তাঁরা অবহেলা নয়, সম্মান ও স্বীকৃতি পাবেন।

  • মহিব্বুল্লাহ আল মারুফ: বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এ কর্মরত।
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত