দুই বছর পর থানচির নিজ পাড়ায় ফিরল তিন বম পরিবার

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
থানচি (বান্দরবান)

পার্বত্য চট্টগ্রাম। স্ট্রিম গ্রাফিক্স
পার্বত্য চট্টগ্রাম। স্ট্রিম গ্রাফিক্স

দুই বছর পর বান্দরবানের থানচিতে নিজ পাড়ায় ফিরেছেন বম জনগোষ্ঠীর তিন পরিবারের ১৮ সদস্য। বম জনগোষ্ঠীর নেতা ও সেনাবাহিনীর আশ্বাসে ভারতের মিজোরাম থেকে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন পরিবারের প্রধানেরা।

গতকাল রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বাকলাই পাড়া সেনাবাহিনীর সাব-জোন ক্যাম্পের সহায়তায় নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তন করে। তিন পরিবারের সদস্যদের শেরকর ও প্রাতা পাড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় শেরকর পাড়ার কারবারি তুমথন বম ও প্রাতা পাড়ার কারবারি পার্কেল বম উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল ফিরে আসা তিন পরিবারের মধ্যে থানচি সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে শেরকর পাড়ার দুই পরিবারের ১৫ সদস্য এবং একই ওয়ার্ডে প্রাতা পাড়ার একটি পরিবারের ৩ সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে শিশু ও কিশোরও রয়েছে।

এসব পরিবারের প্রধান ভানরৌখম বম, রুয়াতখুপ বম ও লালচম বম জানান, ২০২৪ সালে থানচি ও রুমায় দুটি ব্যাংকের শাখায় ডাকাতির ঘটনায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) সদস্যদের ধরতে সেনাবাহিনীর চিরুনি অভিযানের সময় তারা ভারতে মিজোরামে চলে যান।

ভানরৌখম বম (২৭) বলেন, মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য দেশে থাকলে কখনো নিজের বাড়ির মতো লাগে না। এত দিন পর নিজের গ্রামে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। নিজের মাটি ও মানুষের কাছে ফিরে এসেছি, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ। রুয়াতখুপ বম (৪৬) বলেন, ‘বাড়িঘর, আত্মীয়-স্বজন ও নিজের পাড়ার কথা সবসময় মনে পড়ত। মিজোরামে থাকলেও মন পড়ে থাকত স্বদেশে। অনেক বছর পর আবার নিজের জায়গায় ফিরেছি।’ লালচম বম (৫৫) বলেন, স্বদেশ ও মাতৃভূমি ছেড়ে সুখে নেই। নানা কষ্টের মধ্যে দুই বছর পার করেছি। এখন নিজের পাড়ায় ফিরে এসেছি। পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই।

বম পরিবারগুলো সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে বাকলাই পাড়া সেনা ক্যাম্পকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে কেএনএফ সদস্যরা। তাদের সঙ্গে রাতভর বন্দুকযুদ্ধের পর সেনাবাহিনীর চিরুনি অভিযানের মুখে রুমা ও থানচি উপজেলার কয়েকশ বম পরিবার জঙ্গলের আশ্রয় নিয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল বান্দরবানের রুমায় কৃষি ব্যাংকের শাখা ও পরের দিন ৩ এপ্রিল থানচিতে সোনালী ব্যাংকের শাখায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। কেএনএফ সদস্যরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে চিরুনি অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। এ সময় নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত দিয়ে ভারতের মিজোরামসহ বিভিন্ন এলাকায় সরে যায় বম পরিবারগুলো।

এদিকে চলতি বছর বম সোশ্যাল কাউন্সিলের নেতা ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নিরপরাধ বম পরিবারগুলোর নিরাপদের ফেরার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। এতে ১১ সেপ্টেম্বর মিজোরামের শিলকর থেকে রাঙামাটির শিলকোপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তিনটি বম পরিবার। সেখানে তাঁদের হেফাজতে নেয় ১২ বিজিবির থেগামুখ বিওপি। পরদিন রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাঙামাটি থেকে তারা বান্দরবানের থানচি উপজেলায় অবস্থিত বাকলাইপাড়া সাব-জোন ও ক্যাম্পে পৌঁছালে সেনা সদস্যরা তাদের অভ্যর্থনা জানায়। বান্দরবান রিজিয়নের আইসি বিভাগ (১৬ ইবি) তাঁদের গ্রহণ করে।

বম পরিবারের প্রধানেরা বলেন, প্রথমে সপরিবারে অনেক দিন জঙ্গলের আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। পরে ভারতের মিজোরামে চলে যান। চলতি বছর সেনাবাহিনীর আশ্বাসের পর বম সমাজের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত আমরা স্বদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতি পরিবারকে নগদ ১৫ হাজার টাকা, ৫০ কেজি চাল, ১০ কেজি ডাল, ৫ লিটার তেল, ৫ কেজি করে পেঁয়াজ, আলু ও লবণ, ১টি সোলার প্যানেল ও ব্যাটারিসহ গৃহসামগ্রী দেওয়া হয়।

সোমবার সকালে বাকলাই পাড়া আর্মি ক্যাম্প কমান্ডার ক্যাপ্টেন সাফকাত মুবাররাত চৌধুরী বলেন, প্রায় দুই বছর আগে নিরাপত্তার কারণে সীমান্ত পেরিয়ে অচেনা আশ্রয়ের সন্ধানে যাওয়া পরিবারগুলো এবার ফিরেছে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিতে। তাদের এই প্রত্যাবর্তন শুধু তিনটি পরিবারের ফিরে আসার ঘটনা নয়, এটি শেকড়ের টান, স্বদেশের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যাশারও প্রতিচ্ছবি। তাদের নিজ দেশে বসবাসের উপযোগী ও পুনর্বাসনের পরিবেশ তৈরিতে সেনাবাহিনীর সব সময় আন্তরিক আছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত