আর্ট মিউজিয়ামে চক্কর—৭/কেলভিংগ্রোভে গিয়ে সালভাদর দালির সামনে
চিত্রশিল্পী তৌহিন হাসান ঘুরে দেখেছেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব আর্ট মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি। প্রতিটি সংগ্রহশালায় ক্যানভাস থেকে ক্যানভাসে তিনি খুঁজেছেন শিল্পের ভাষা; রঙ, আলো আর তুলির আঁচড়ে অনুভব করেছেন শিল্পীদের জীবন, সময় ও সৃষ্টির গল্প। সেই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হলো নতুন ধারাবাহিক ‘আর্ট মিউজিয়ামে চক্কর’। এর সপ্তম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। চোখ রাখুন প্রতি রোববার বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।

স্কটল্যান্ডে পা রেখেছি দিন চারেক হলো, এডিনবরায়। এর পরের পরিকল্পনা নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্ট। যেতে হবে আইরিশ সাগর পাড়ি দিয়ে। স্কটল্যান্ডের সমুদ্রতীরবর্তী একটি বন্দর কেয়ার্নরান থেকে ফেরি ছেড়ে যায়। তার টিকিট কাটা ছিল আগেই। তার আগে পরিকল্পনামাফিক গ্লাসগো শহর ঘুরে যাব এক চক্কর।
যুক্তরাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় জাদুঘর ও শিল্পকলা গ্যালারি ‘কেলভিংগ্রোভ আর্ট গ্যালারি অ্যান্ড মিউজিয়াম’ গ্লাসগো শহরে অবস্থিত। নেট ঘেঁটে আগেই জানা ছিল, প্রতিবছর প্রায় দশ লাখেরও বেশি মানুষ এই মিউজিয়াম পরিদর্শনে আসে। এখানে শিল্পকর্ম, প্রাকৃতিক ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, অস্ত্রশস্ত্র, প্রাণীবিজ্ঞান, স্কটিশ ইতিহাস এবং বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার নিদর্শন—সব মিলিয়ে আট হাজারেরও বেশি বস্তু প্রদর্শিত হয়। কোনোভাবেই এই গ্যালারি দেখা মিস করা ঠিক হবে না- মনে মনে এরকম একটা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। তাছাড়া মিউজিয়ামে প্রবেশের জন্য কোনো ফি লাগে না, তাই আগে থেকে এন্ট্রি টিকিট বুক করার ঝামেলাও ছিল না।
এডিনবরা থেকে গ্লাসগোর দূরত্ব প্রায় আশি কিলোমিটার। বাস বা ট্রেনে যাতায়াত সহজ, কিন্তু আমার পছন্দ ছিল ট্রেন। কারণ এসব ট্রেন দ্রুতগতির এবং সময়ও কম লাগে। তাছাড়া ভ্রমণের কালে সময় বাঁচানো খুব জরুরি একটা বিষয়, বিশেষ করে বেশি দূরত্বের যাতায়াতের ক্ষেত্রে। তাতে সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে নির্ধারিত গন্তব্যে অনেক বেশি ঘোরাঘুরি করা যায়।
-89bf90.jpeg)
তবে স্বল্প দূরত্বে আমি বাস বা লোকাল যানবাহন পছন্দ করি বেশি, তাতে আশপাশে চোখ বোলাতে বোলাতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাড়ি দেওয়া বেশ আনন্দের। এডিনবরা ওয়েভারলি রেল স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে গ্লাসগো সেন্ট্রাল স্টেশনে যেতে আমার পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মতো সময় লেগেছিল।
২
গ্লাসগো সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে এয়ারবিএনবির অ্যাপার্টমেন্ট খুব কাছেই। একেবারে হাঁটা দূরত্বের মধ্যে। দুপুরের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে। কেলভিংগ্রোভ আর্ট গ্যালারি ও মিউজিয়ামে যাওয়ার প্ল্যান করেছি পরের দিন।
গ্লাসগো শহরজুড়ে একটা বিষয় খুব নজর কাড়ল, পুরো শহরের আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে সীগাল। তাদের তীক্ষ্ণ স্বর প্রথম কয়েক ঘণ্টা কানে খুব লাগলেও পরে তা সয়ে গিয়েছিল। যেখানেই যাই, হাতে খাবার থাকলেই দু-একটা সীগাল কোথা থেকে যেন উড়ে কাছে এসেই যাবে, যদি একটু খাবার পাওয়া যায় এই লোভে।
গ্লাসগো শহরে (ইউরোপের সব শহরেই দেখেছি) ‘হপ অন-হপ অফ’ বাস সার্ভিস ট্যুরিস্টদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। একটি টিকিটে পুরো শহর ঘুরে দেখা যায় কয়েক ঘণ্টায়। বাসটি পুরো শহরজুড়ে চক্কর দিতে থাকে, বিভিন্ন স্টপেজে থেমে থেমে। চাইলে কোনো একটা স্টপেজে নেমে, চারদিক হেঁটে ঘোরাঘুরি করে, একই টিকিটে পরের বাসে আবার ওঠা যায়।
-e26f9a.jpeg)
এভাবে কেউ চাইলে বিভিন্ন স্টপেজে থেমে থেমে দিনভর পুরো শহর ঘুরে দেখতে পারে। টিকিটের মেয়াদ থাকে চব্বিশ ঘণ্টা। উপরন্তু পাওয়া যায় ট্যুর গাইডও। যাত্রাপথে বাসের ভেতর একজন গাইড মাইক্রোফোনে রাস্তার আশপাশের দৃশ্য কিংবা স্থাপনার ইতিহাস ও বর্ণনা করতে থাকেন। কেউ চাইলে গাইডের কাছ থেকে আরও বিস্তারিত জেনে নিতে পারেন বাসে বসেই।
পরদিন বারো পাউন্ড দিয়ে দিনের টিকিট কেটে উঠে পড়লাম হপ অন-হপ অফ বাসে। বাসটির যাত্রাপথে কেলভিংগ্রোভ আর্ট গ্যালারি ও মিউজিয়াম পড়ে। গাইড যখন মিউজিয়ামের ইতিহাস মাইক্রোফোনে বর্ণনা করা শেষ করল, আমি টুপ করে নেমে পড়লাম বাস থেকে। আর্ট গ্যালারির ভেতরে ঢুকব তাই। আমার সঙ্গে আরও কিছু পর্যটকও নামলেন এবং বাসটি চলে গেল তার রুট ধরে।
৩
কেলভিংগ্রোভ আর্ট গ্যালারি ঘুরে দেখার পর মনে হলো, এটি শিল্প, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও স্কটল্যান্ডের সংস্কৃতির এক বিশাল জগৎ। গ্যালারিটি ২২টি থিমভিত্তিক গ্যালারিতে সাজানো হয়েছে। এগুলোকে দুটি অংশে ভাগ করা হয়েছে—‘প্রকৃতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান’ এবং ‘শিল্প, নকশা ও সংস্কৃতি’।
লাল বেলেপাথরের বিশাল ভবনের ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই প্রথমেই পড়ে সেন্ট্রাল হল। তার আগে রয়েছে রিসেপশন, তথ্যকেন্দ্র, মানচিত্র, সুভেনির শপ ও ক্যাফে। এখান থেকেই পুরো গ্যালারির দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।

সেন্ট্রাল হলের উঁচু ছাদ, চারদিকে বারান্দা ও বিশাল আয়তনের মেঝের মাঝখানে দাঁড়ালে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে থাকে। এখানে অল্প স্বরে কথা বললেও তা প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। অনেক সময় দুপুরে এখানে অর্গান কনসার্ট হয়। অর্গানের শব্দ পুরো ভবনের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে প্রতিধ্বনিত হয়। উপরে তাকালে বোঝা যায়, ভবনের স্থাপত্য কতটা সৌন্দর্যমণ্ডিত ও শিল্পকলায় ভরপুর।
সেন্ট্রাল হলের পূর্বদিকে গেলে প্রথমেই বিশাল খোলা ইস্ট কোর্ট। এখানে সাধারণত বড় আকারের ভাস্কর্য, স্থাপনাশিল্প অথবা সাময়িক প্রদর্শনী হয়ে থাকে। এই অংশ থেকেই শিল্পকলা গ্যালারির যাত্রা শুরু।
কেলভিংগ্রোভে মোট বাইশটি গ্যালারি থাকলেও, সবগুলোতে চিত্রকর্ম নেই। যেসব কক্ষে মূলত পেইন্টিং প্রদর্শিত হয়, সেগুলোই শিল্পপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এসব কক্ষ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে প্রতিটি ঘর একটি নির্দিষ্ট শিল্পধারা, সময়কাল বা শিল্পীসমাজের গল্প বলে।
‘লুকিং অ্যাট আর্ট’ কক্ষটি মূলত চিত্রকলা বোঝার জন্য। এখানে ছবি কীভাবে দেখতে ও বুঝতে হয়, সেটিও শেখানো হয়। এখানে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ের ইউরোপীয় চিত্রকর্ম, স্কেচ থেকে চূড়ান্ত চিত্র তৈরির ধাপ, রঙের স্তর, ক্যানভাস সংরক্ষণের পদ্ধতি। ক্ষতিগ্রস্ত ছবি কীভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়, অনেক ছবির পাশে এক্স-রে ও ইনফ্রারেড স্ক্যানও দেখানো হয়, যাতে বোঝা যায় শিল্পী প্রথমে কী এঁকেছিলেন এবং পরে কী পরিবর্তন করেছেন।
‘দ্য গ্লাসগো বয়েজ’ কক্ষটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেইন্টিং গ্যালারি। গ্লাসগো বয়েজ ছিলেন উনিশ শতকের শেষভাগের একদল স্কটিশ শিল্পী, যারা স্টুডিওর বাইরে প্রকৃতির মধ্যে বসে ছবি আঁকতেন। এই কক্ষে তাঁদের কাজ দিয়ে সাজানো হয়েছে। এখানে পেইন্টিংয়ের ক্যানভাসে দেখা যায় গ্রামীণ স্কটল্যান্ড, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ, শিশুদের জীবন, প্রাকৃতিক আলোয় আঁকা ল্যান্ডস্কেপ ও বাস্তবধর্মী প্রতিকৃতি। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিল্পীরা হলেন জেমস গুথ্রি, স্যার জন ল্যাভরি, জর্জ হেনরি, এডওয়ার্ড আর্থার ওয়ালটন, উইলিয়াম ইয়র্ক ম্যাকগ্রেগর প্রমুখ। এই কক্ষের অন্যতম আকর্ষণীয় পেইন্টিংটি জেমস গুথ্রির ‘এ হিন্ডস ডটার’।
-9d596e.jpeg)
‘স্কটিশ কালারিস্ট’ গ্যালারিতে বিশ শতকের প্রথম ভাগের স্কটিশ আধুনিক শিল্পের বিকাশ দেখা যায়। যেসব শিল্পী তখন স্কটিশ চিত্রকলাকে আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন, তাঁদের কাজগুলো এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য শিল্পীরা হলেন স্যামুয়েল জন পেপলো, এফ. সি. বি. ক্যাডেল, জন ডানকান ফার্গুসন, জর্জ লেসলি হান্টার প্রমুখ। আধুনিক স্কটিশ চিত্রকলা হিসেবে তাঁদের কাজের মধ্যে দেখা যায় উজ্জ্বল রঙ, ঢিলেঢালা তুলির স্ট্রোক, ফরাসি ইমপ্রেশনিজম ও পোস্ট-ইমপ্রেশনিজমের প্রভাব, স্টিল লাইফ, সমুদ্রতীর, আইওনা দ্বীপের দৃশ্য এবং অভিজাত সমাজের প্রতিকৃতি। মোদ্দা কথা, পেইন্টিংয়ের ক্যানভাসে আলো ও রঙই মূল বিষয়।
ডাচ শিল্পীদের কাজ নিয়ে ‘ডাচ আর্ট’ গ্যালারি। এখানে ডাচ স্বর্ণযুগের শিল্পীদের কাজগুলো দেখা যায়। যেখানে প্রতিকৃতি, ধর্মীয় চিত্র, সমুদ্রদৃশ্য, ল্যান্ডস্কেপ ও দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা যায়। এরকম কাজগুলো আগেও ইউরোপের কয়েকটি গ্যালারিতে দেখেছি। যাই হোক, ডাচ গ্যালারিতে পরিচিত শিল্পীদের মধ্যে রেমব্রান্টের ‘এ ম্যান ইন আর্মার’ পেইন্টিংটি আগে বইয়ের পাতায় ছাপা অবস্থায় দেখেছি। এখানে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে আরও বেশি ভালো লাগছিল। এই গ্যালারির অন্যতম আরও দুজন শিল্পী হলেন ফ্রান্স হালস ও জ্যাকব ভ্যান রুইসডায়েল।
ফ্রেঞ্চ আর্ট’ গ্যালারি অংশটির শিল্পীরা আমার চিরচেনা এবং আমি তাঁদের অনুরাগী। যেমন ক্লদ মোনে, রেনোয়া, ক্যামিল পিসারো প্রমুখ। এই কক্ষে উনিশ শতকের ফরাসি শিল্পকলার বিবর্তন দেখা যায়।
৪
কেল্ভিংগ্রোভ আর্ট গ্যালারির সবচেয়ে বিখ্যাত পেইন্টিং কক্ষ ‘দালি’স গ্যালারি’। এই কক্ষের মূল আকর্ষণ একটাই, সালভাদর দালির আঁকা একটিমাত্র পেইন্টিং ‘ক্রাইস্ট অব সেন্ট জন অব দ্য ক্রস’। দালি এটি ১৯৫১ সালে এঁকেছিলেন। এটি যিশু খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য হলেও দালি একে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে এঁকেছেন। সাধারণত ক্রুশবিদ্ধ যিশুকে সামনে বা পাশ থেকে আঁকা হয়। কিন্তু এখানে দর্শক যেন আকাশের অনেক ওপরে অবস্থান করছে এবং সেখান থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে পুরো দৃশ্যটি দেখছে। আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চিত্রকর্মে যিশুর মাথায় কাঁটার মুকুট নেই, শরীরে রক্ত বা ক্ষতের চিহ্ন নেই, ক্রুশে পেরেকও দেখা যায় না। ক্রুশবিদ্ধ যিশুকে নিয়ে এই দৃষ্টিকোণ তখনকার শিল্পে (এমনকি এখনও) একেবারেই অভিনব।
এই পেইন্টিংকে ঘিরে পুরো ঘরের বিন্যাস এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, দর্শকের দৃষ্টি সরাসরি এই ছবির ওপর গিয়ে পড়ে। ছবিতে ক্রুশবিদ্ধ খ্রিস্টকে ওপর থেকে দেখা হয়েছে, আর নিচে শান্ত একটি উপসাগর ও নৌকা, যা প্রচলিত ধর্মীয় শিল্পের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। এটি কেলভিংগ্রোভের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পকর্ম। এর সম্পর্কে দালি বলেছিলেন, তিনি স্বপ্নে এই কম্পোজিশন দেখেছিলেন এবং মনে করেছিলেন এটিই হবে তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় চিত্র।
১৯৫২ সালে গ্লাসগো কর্পোরেশন আট হাজার দুইশ পাউন্ড দিয়ে ছবিটি কিনেছিল। তখন অনেকেই এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের কথা ছিল, একজন সমসাময়িক শিল্পীর ছবির জন্য এত টাকা খরচ করা ঠিক হয়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ছবিটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এখন এটি কেলভিংগ্রোভের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বেশি দর্শক টানে এমন শিল্পকর্মগুলোর একটি। আর এখন ছবিটির দাম কত? সেটা টাকার অঙ্কে হিসাব করাই কঠিন।
৫
গ্যালারির ভেতরে ঘুরতে ঘুরতে এর পেছনের ইতিহাসটা জানার আগ্রহ হলো।
এই কেল্ভিংগ্রোভ আর্ট গ্যালারি ও মিউজিয়াম গ্লাসগো শহরের শিল্প, শিক্ষা ও নাগরিক গর্বের বিকাশের ইতিহাসও বটে। উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লবের সময় গ্লাসগো দ্রুত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরীতে পরিণত হয়। সেই সময় শহরের নেতারা উপলব্ধি করেন যে, অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি শিল্প, বিজ্ঞান ও ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য একটি বৃহৎ জনসাধারণের জাদুঘরও প্রয়োজন।
-955c50.jpeg)
১৮৫৬ সালে গ্লাসগো শহর কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পসংগ্রাহক আর্কিবাল্ড ম্যাকলেনের সংগ্রহের ভিত্তিতে প্রথম সিটি আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করে। পরে ১৮৭০ সালে ‘কেলভিংগ্রোভ হাউস’ নামের একটি ভবনে ‘সিটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিউজিয়াম’ স্থাপন করা হয়। সেখানে প্রাকৃতিক ইতিহাস, শিল্পযন্ত্র, খনিজ, প্রাণীবিজ্ঞান ও প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহ প্রদর্শিত হতো। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সংগ্রহ এত বেড়ে যায় যে সেখানে আর জায়গা হচ্ছিল না।
এরপর ১৮৮৮ সালে কেলভিংগ্রোভ পার্কে ‘গ্লাসগো ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিবিশন’ অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীটি এতটাই সফল হয় যে এর লাভের একটি বড় অংশ নতুন আর্ট গ্যালারি ও জাদুঘর নির্মাণের জন্য রাখা হয়। একই সময়ে আর্কিবাল্ড ম্যাকলেনের শিল্পসংগ্রহ এবং সিটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিউজিয়ামের বৈজ্ঞানিক সংগ্রহ এক জায়গায় রাখার পরিকল্পনাও করা হয়।
১৮৯১ সালে জন ডব্লিউ. সিম্পসন এবং ই. জে. মিলনার অ্যালেন বর্তমান আর্ট গ্যালারি ও মিউজিয়ামের নকশা তৈরি করেন। ১৮৯৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন ডিউক অব ইয়র্ক, যিনি পরে রাজা পঞ্চম জর্জ হন।
১৯০১ সালে একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে কেলভিংগ্রোভ আর্ট গ্যালারি ও মিউজিয়ামের যাত্রা শুরু হয়। তখন এটি ‘প্যালেস অব ফাইন আর্ট’ নামে পরিচিত ছিল এবং আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিল্পকর্ম, ভাস্কর্য ও স্কটিশ ঐতিহাসিক সংগ্রহ প্রদর্শিত হয় সেখানে। পরের বছর, ১৯০২ সালের ১ অক্টোবর, জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এর এক শ বছর পর ২০০৩ সালে শতবর্ষ পূর্তির পর ভবনটির ব্যাপক সংস্কার করা হয় এবং ২০০৬ সালে জাদুঘরটি পুনরায় খুলে দেওয়া হয়।
এত বছর পর সেই ভবনের ভেতর দাঁড়িয়ে ইতিহাসটা মনে করার পর আবার বাইরে বেরিয়ে এলাম। আর্ট গ্যালারির সামনে এসে বাস স্টপেজে দাঁড়ালাম। আপাতত কোনো বাস নেই। ‘হপ অন-হপ অফে’র পরের কোনো একটা বাস এলে তাতে উঠে পড়ব, এই আশায় দাঁড়িয়ে রইলাম।
মিউজিয়ামের পাশেই বিশাল এলাকাজুড়ে কৃষিক্ষেত। মিউজিয়ামের অংশ কি না, জানি না। সেখানে দুজন মানুষ ট্রাক্টর চালিয়ে ঘুরে ঘুরে মাটি আলগা করছিলেন। সম্ভবত কোনো বীজ বুনবেন। কী ফসল স্কটল্যান্ডের মাটিতে ফলে, আমার ঠিক জানা নেই। তবে ইতিহাসের এতসব গল্পের মধ্যে হঠাৎ এই কৃষিকাজ দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল।
এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রায় ১০-১২ মিনিট কেটে গেল। তারপর বাস চলে এল। উঠে পড়লাম। পরের কোনো একটা স্টপেজ চোখে ভালো লাগলে নেমে পড়ব, চারদিক ঘুরে দেখব। সারাদিনের টিকিট তো হাতেই আছে। নামব, উঠব, আবার নামব। ঘুরতেই তো এসেছি...
.png)
-7c29dd-256x144.webp)







