এমএসএফের প্রতিবেদন/আগস্টে বেওয়া‌রিশ লাশ ৭১, ‘ম‌বে’ নিহত ৩৫

নারী-শিশু হত্যার ঘটনা বেড়ে ৯১, বেড়েছে দলবদ্ধ ধর্ষণও

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে দেশে মব সহিংসতায় অন্তত ৩৫ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছেন। এর আগে গত জুলাই মাসে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছিলেন ৩১ জন এবং অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছিল ৫৬টি।

জুলাই ও আগস্টের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সোমবার (৩১ আগস্ট) এসব তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য, নিজস্ব মানবাধিকার মনিটরিং এবং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের মাধ্যমে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটি।

এমএসএফ জানিয়েছে, আগস্টে কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও মব সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন এবং বিশেষ অভিযানে ব্যাপক গ্রেফতার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, মাদক ব্যবসা, বাকবিতণ্ডা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ, চাঁদাবাজি, জমি বিরোধ এবং অন্যান্য স্থানীয় বিরোধকে কেন্দ্র করে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে কেন্দ্র করেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। জুলাইয়ে মব সহিংসতায় ৩১ জন নিহত ও ৫৮ জন আহত হলেও, আগস্টে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫ এবং আহতের সংখ্যা ৭৪ জনে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতায় আগস্টে আহতের সংখ্যা জুলাইয়ের ৯৫ জন থেকে বেড়ে ২৬৭ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা ৭ জন থেকে কমে ৫ জন হয়েছে। বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ এবং বিভিন্ন দলের অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদলীয় সংঘর্ষে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে উঠে এসেছে এমএসএফের পর্যবেক্ষণে।

আগস্টে বিশেষ অভিযানে গ্রেফতারের সংখ্যাও বেড়েছে। জুলাইয়ে ৫ হাজার ১৯৬ জন গ্রেফতার হলেও আগস্টে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬১৮ জনে। এমএসএফের মনিটরিং অনুযায়ী, এসব গ্রেফতারের বড় অংশ মাদক-সংশ্লিষ্ট।

এদিকে আগস্টে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারকে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে এমএসএফ। জুলাইয়ের ৫৬টির তুলনায় আগস্টে ৭১টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে ৫৫ জন পুরুষ ও ১৪ জন নারী। বাকি ২ জনের লিঙ্গ ও বয়স শনাক্ত করতে পারেনি সংগঠনটি।

যথাযথ তদন্ত ছাড়া এসব ঘটনাকে সরাসরি হত্যাকাণ্ড, গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে সমার্থক হিসেবে বিবেচনা না করে প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে এমএসএফ।

চলমান সীমান্ত পরিস্থিতিতেও মানবাধিকার বিষয়ে উদ্বেগ আগের মতোই রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। আগস্টে সীমান্তে গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আহত হওয়ার পাশাপাশি নির্যাতন, আটক এবং ভারতীয় সীমান্ত থেকে পুশ-ইন ও পুশ-ইনের চেষ্টার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টা জুলাইয়ের ১০০ থেকে আগস্টে ১৫টিতে নেমে এসেছে।

সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে আগস্টে। জুলাইয়ে এ ধরনের ৮টি ঘটনার বিপরীতে আগস্টে ২৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ সময় ফরিদপুর ও চট্টগ্রামে প্রতিমা ভাঙচুর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলা, প্রাণহানি ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কয়েকটি সূচকে উন্নতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু জুলাইয়ের ২ জন থেকে আগস্টে ১ জনে এবং কারা হেফাজতে মৃত্যু ৯ জন থেকে ৫ জনে নেমেছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা অবশ্য ৩৬টি থেকে বেড়ে ৩৭টি হয়েছে। একই সময়ে একজন সাংবাদিক গ্রেফতার এবং আরেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

নারী-শিশু হত্যার ঘটনা বেড়ে ৯১, বেড়েছে দলবদ্ধ ধর্ষণও

এদিকে এমএসএফের নারী ও শিশু, মাদক ও অনলাইন জুয়াসংক্রান্ত পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মোট ৩২৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৩০৬।

আগস্টে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা জুলাইয়ের ৫২ থেকে বেড়ে ৯১টিতে দাঁড়িয়েছে। দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭ থেকে বেড়ে ১২টি এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৩ থেকে বেড়ে ৫টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বলাৎকারের ঘটনা ৫ থেকে বেড়ে ৬টি হয়েছে।

তবে ধর্ষণের মোট ঘটনা ৮৫ থেকে কমে ৭০টিতে নেমেছে। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ৩৪ থেকে কমে ২১টিতে দাঁড়িয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ৪২ থেকে ৪০টিতে এবং নবজাতক উদ্ধারের ঘটনা ১১ থেকে ৩টিতে নেমেছে।

অন্যদিকে নারী ও শিশুদের আত্মহত্যার ঘটনা জুলাইয়ের ২৮ থেকে বেড়ে আগস্টে ৩৯টি হয়েছে। অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা ১৩ থেকে ১৪টিতে এবং বেআইনি সালিশের ঘটনা ৩ থেকে বেড়ে ৪টিতে দাঁড়িয়েছে।

এমএসএফ বলছে, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মোট ঘটনা মাত্র ২১টি বা প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়লেও হত্যাকাণ্ড, দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো গুরুতর সহিংসতার বেড়ে যাওয়া বিশেষ সতর্কসংকেত।

সংস্থাটি মনে করে, সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের শাসন ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, মব সহিংসতা ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, নির্বিচার গ্রেফতার প্রতিরোধ, সাংবাদিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত