ad

বাংলাদেশের শেষ উর্দু কবিদের একজন ফ্যাহমি চলে গেলেন

সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমি গত হয়েছেন ৩০ আগস্ট ২০২৬ সালে। স্ট্রিম গ্রাফিক
সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমি গত হয়েছেন ৩০ আগস্ট ২০২৬ সালে। স্ট্রিম গ্রাফিক

হায় ফ্যাহমি…

তালিব ও আ’সি, নিয়ায ও সাকি ও কুরবান শরফ

এক এক করে সবাই আগেই চলে গেছে

বিমর্ষ হৃদয় কাল পর্যন্ত ছিল ফ্যাহমি, গমখোয়ার আর শামিম

আজ এসেছে খবর ফ্যাহমিও বিদায় নিয়ে গেছে

আহ ফ্যাহমি…

তালিব ও আ’সি নিয়ায ও সাকি ও কুরবান শরফ

ইক ইক করকে সভি প্যাহলে হি রুখসাত হো গ্যায়ে

দিল গিরফতা কাল তলক থে ফ্যাহপমি গমখোয়ার ও শামিম

আজ য়ে আয়ি খবর ফ্যাহমি ভি রুখসাত হো গ্যায়ে

এই ছোট শোকগাথা লিখেছেন ঢাকার কবি শামিম জামানভি। তাঁর কবিবন্ধু সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমির মৃত্যুতে। ফ্যাহমি গত হয়েছেন ৩০ আগস্ট ২০২৬ সালে।

আসাদ চৌধুরী বাংলাদেশের উর্দু কবিতার একখানা সংকলন করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন, বাড়ির কাছে আরশি নগর। এই পড়শিদের সহনাগরিকেরা চেনেন না। তাই এই নাম। সেই সংকলনে সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমির একখানা গজলের অনুবাদ রেখেছিলেন তিনি। তলায় কবির ছোট পরিচিতি ছিল এরকম:

সিন নুন ফাহমী (সৈয়দ নাসিরউদ্দীন ফাহমী)-র শৈশব কেটেছে সৈয়দপুরে। জন্ম ৩ মার্চ, ১৯৪৮। পিতা সৈয়দ ফেদা হোসেন। সৈয়দপুরেই চাকরি করেন। সৈয়দপুরকে ঘিরে প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত শিল্প-সাহিত্য-আন্দোলনের একজন শরিক-কবি। শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কে সমাজ ও দেশ-সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা তাঁর রচনাতেও খুঁজে পাওয়া যাবে।

গজলের অনুবাদ কেবল আছে সংকলনে। মূল উর্দু বা বাংলা লিপিতে মূল কবিতার উচ্চারণ দেওয়া নেই। বহু পরিশ্রমে বার সময় নিয়ে সংগৃহীত সেই মূল কবিতাগুলোর পাঠও হারিয়ে গেছে। আসাদ চৌধুরীও চলে গেছেন। চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন কানাডার এক সমাধিপ্রান্তরে। মূল কবিতাগুলো আর পাওয়া যাবে না। অনুবাদে কয়েকটা পঙক্তি এরকম:

প্রেম-পীরিতের আইন মেনেই শাস্তি দিয়ো

আগে জানাও, কী অপরাধ ছিল আমার॥

দুঃখ-ব্যথা কমিয়ে আনা এতই কঠিন?

প্রাণের খোলা হাসিই পারে এসব ব্যথা নিভিয়ে দিতে॥

বাসতো যারা আমায় ভালো কোথায় তারা খোয়া গেল?

আমাকে দাও দয়া করে ঠিক ঠিকানা তাদের॥

হৃদয় পাখি কয়েদখানায় থাকবে বল আর কত কাল?

আ রে ফাহমী, মুক্ত বাতাস স্বাদ নিক এই কয়েদিটির॥

বাংলাদেশের উর্দু কবিদের দীর্ঘদিন ধরে আপনভাবে চিনতেন আসাদ চৌধুরী। ধানমন্ডির এক বাড়িতে মুশায়রা আর নৈশভোজ শেষে দশ-বারো রকমের মশলা দিয়ে পান সাজতে সাজতে একদিন বলেছিলেন, উর্দু কবিরা কবিতায় দুষ্টুমি করবার বিন্দুমাত্র সুযোগ ছাড়ে না। তাই তিনি অনুবাদ করলেও কবিতা অনুবাদে ধরা দেয় না। এই কবিতাও অনুবাদের ফাঁদ এড়িয়ে গেছে। তবে আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমির কণ্ঠের জোয়ারি। সপ্রতিভ উজ্জ্বল চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছে সৈয়দপুরের মুশায়রায়। বয়জ্যেষ্ঠ কবি। সবার শেষে কবিতা পড়বেন। সারা রাত জেগে কবিতা শোনা শ্রোতাদের মনোযোগ ধরে রাখা সহজ কথা নয়। তবে ফ্যাহমি তা পারতেন। খুব ভালোভাবে পারতেন।

সেটা বোধহয় ২০১৪ বা ১৫ হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ জানালেন অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী। কয়েক দিনব্যপী নিরিখ সাহিত্য সম্মেলনে এক সন্ধ্যা বরাদ্দ থাকবে বাংলাদেশের উর্দু কবিতা নিয়ে। ঢাকা থেকে কবি আসাদ চৌধুরী, শামিম জামানভি, হাসান ইবনে ইসমাইল আর এই অধম লেখক রওনা হলাম।

আয়োজক থেকে অংশগ্রহণকারী—সবাই একটু শঙ্কিত ছিলাম। বাংলাদেশের উর্দু কবিতার পর্বটি সম্মেলনের শ্রোতারা কীভাবে নেবেন? কারও কোমল চেতনা আহত হলে তার প্রতিক্রিয়াও যে খুব কোমল হবে না, সে আশঙ্কাও ছিল। সেখানে গিয়ে দেখলাম সৈয়দপুর থেকে কয়েকজন কবিও এসেছেন। স্বরচিত উর্দু কবিতা শোনাবেন তাঁরা। এদের মধ্যে সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমিও ছিলেন। মাঝারি আকার। শ্যামলা বরণ। তখনও সর্বদা মাথায় টুপি রাখা শুরু করেননি। কাঁচা-পাকা চুল। রসিক মানুষ। চোখে মুখে সেই রসাভাস নজর এড়ায় না। শঙ্কা ভাগাভাগি তো হলো। কিন্তু কমলো না।

সন্ধ্যার আয়োজন আশাতীত সাড়া পেল। ইতিবাচক। কবিরা গজল শোনালেন। তার তাৎক্ষণিক অনুবাদও হলো। কবিরা অভিভূত। এত বড় আয়োজনে দীর্ঘদিন তাঁরা ডাক পাননি।

এর পরদিন ট্রেনে করে সবাই রওনা হওয়া গেল সৈয়দপুরে। সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত আসাদ চৌধুরী। এর কারণ শোনা গেল যেতে যেতে।

১৯৬৩-’৬৪ এর কথা। ৬৩’র ডিসেম্বর বা ৬৪’র জানুয়ারির দিকে সৈয়দপুরে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়নের দু’জন নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য ও রাশেদ খান মেনন আসাদ চৌধুরীকে বললেন, ‘সৈয়দপুরে মুশায়েরা হবে। তুমি চলো।’ গিয়ে দেখেন বিশাল আয়োজন। মাঠে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার লোক। কোনো কবিতা নিয়ে যাননি কবি। তখন সালাউদ্দিন মাহমুদ বলে ওদের একজন কবি বললেন, ‘কবিতা বানা লো’। কোনোমতে চার লাইন কি ছয় লাইনের একটি কবিতা লিখলেন তৎক্ষণাৎ। আহমেদ সাদী উর্দুতে ট্রানস্লেট করলেন।

তারপর কবিতা পাঠের আসর শুরু হলো। পরে আসাদ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘প্রথমদিকে তো জুনিয়ররা পড়ে। তাই আমার পর্ব পরে। ত্রিশ-চল্লিশ হাজার লোকের সামনে কোনোদিন কবিতা পড়িনি। বলতে কি, এর আগে আমি কবিতাই কোথাও পড়িনি। জীবনে প্রথম কবিতা পড়লাম বাইরে। যে কারণে সৈয়দপুরের প্রতি আমার অসম্ভব দুর্বলতা’।

তো সেই সৈয়দপুরে আসাদ চৌধুরীর আগমনে মুশায়রার আয়োজন হলো। স্বাভাবিক অভ্যাসে অপেক্ষা করে আছি যে সন্ধ্যায় কবিতা পড়া শুরু হবে। ফ্যাহমি সাহেবের বৈঠকখানায় সন্ধ্যায় চা-পর্ব শেষ হলো। পান-তামাকে পার হলো আরও ঘণ্টাখানেক। ততক্ষণে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত।

এরপর আরেক বাড়িতে রাতের খাবার। তারপর খাড়া চামচের চা। মানে, চায়ে এত চিনি দেয়া হয় যে তাতে চামচ গুঁজে রাখলে কাপের চিনিতে চামচ খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

সব শেষ হতে হতে রাত প্রায় এগারটা। ততক্ষণে আমি মুশায়রার কথা ভুলে গেছি। হঠাৎ দেখি সবাই নড়েচড়ে বসছেন। শোনা গেল আয়োজনে বোধহয় এতক্ষণে লোকজন এসে পড়েছেন।

রাস্তার পাশে নির্মাণ কাজ আধাআধি শেষ একটা জায়গা। ওপরে ছাদ আছে। দেয়াল পুরোটা ওঠেনি। সেখানে মেঝেতে বসবার আয়োজন। কয়েক’শ লোক হাজির কবিতা শুনবেন বলে। আসলে উর্দু কবিতা পাঠের আসরের এটাই দস্তুর। সেই মতো রাত বারটা নাগাদ শুরু হলো কবিতা পড়া। শেষ হবে ভোরে।

কমবয়সীদের কবিতা দিয়ে শুরু হলো আসর। রাত আড়াইটা নাগাদ আড়মোড়া ভাঙতে উঠে বের হয়ে দেখি আয়োজনের সামনের রাস্তার পাশে দেয়াল ঘেঁষে সারি সারি সাইকেল ঠেস দিয়ে রাখা। সাইকেল প্রতি একজন করে সব মিলিয়ে গোটা পঞ্চাশেক দাঁড়িয়ে। কেউ সাইকেলে বসে। এরা সবাই শহরের লোকজন। ছোট ব্যবসায়ী। কেউ দোকানের, রেস্তোরাঁর কর্মচারী। ফুটপাথের চা দোকানদার। সবজি বিক্রেতা। রাতে দোকানপাট বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে থেমে গেছেন কবিতা শুনবেন বলে। আয়োজন শেষ পর্যন্ত তারা ছিলেন। কবিতা শুনেছেন। আসাদ চৌধুরীর বলা সৈয়দপুরে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার লোকের কবিতা শোনার আয়োজন নিয়ে সন্দেহ কেটে গেল।

শেষের দিকে গজল পড়লেন শামিম জামানভি। শেষে কবিতা পড়ার আমন্ত্রণ পেলেন সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমি। ততক্ষণে অন্ধকার কাটছে আকাশ থেকে। তবে ভোর হয়নি। ভোরের আগের সেই প্রতারণাময় আলো—ফলস ডন। এর পর আবার অন্ধকার হয়ে তারপর আসল ভোর হবে। তার নাম ‘সুবহে সাদিক’। সত্যিকারের ভোর।

একটা কবিতা শেষ করলেন ফ্যাহমি। বাইরের দিকে তাকিয়ে শামিম জামানভি বন্ধু ফ্যাহমিকে কৌতুকের আমেজে বললেন, ‘ফ্যাহমি, ভৈরবীর সময় তো হয়ে গেল’। এতক্ষণ সাধারণ আবৃত্তি করছিলেন ফ্যাহমি। বন্ধুর কথা শুনে চকিতে বললেন, ‘কী বললে, ভৈরবী?’ বলেই সুরে গজল ধরলেন। উর্দু কবিরা তাদের নিজের কবিতা নিজেরাই সুর দিয়ে পড়েন। একে বলে ‘তারান্নুম কে সাথ পঢ়না’।

তখন রেকর্ড করে রাখার মতো মোবাইল ফোন সুলভ হয়নি। তাঁর সেই পাঠের কোনো রেকর্ড নেই। বাংলাদেশের অনেক উর্দু কবির মতো নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমির কোনো কবিতার সংকলনও বের হয়নি। স্মৃতিতে সেই গজলের দুটো শের রয়ে গেছে:

চঢ়কে দার ও রসন য়ে কেয়া দে গ্যায়া

কোয়ি দিওয়ানা দরসে ওয়াফা দে গ্যায়া

উর্দু কবিতার সেই ধ্রুপদি মেজাজের শের। ফাঁসির মঞ্চে উঠে সে কী দিয়ে গেল! এক পাগল যেন দিয়ে গেল ভালোবাসায় বিশ্বস্ত থাকার পাঠ।

এর পরের শেরের আগে একটু টীকা দিলেন। এই দেশে তাঁর জন্ম। কিন্তু এখনো সহনাগরিকদের কাছে গঞ্জনা সইতে হয় অপরিচিতের মতো। সেই গঞ্জনা এই মাটির প্রতি ভালোবাসা যেন আরও বাড়িয়ে দেয়:

হাঁসকে তুমনে কুরেদা জো যখমে কুহন

অওর দর্দে মুহাব্বাত মযা দে গ্যায়া

মৃদু হেসে তুমি যখন পুরোনো ক্ষত আবার সজীব করে যাও, প্রেমের বেদনা তখন নতুন করে আনন্দ দিয়ে যায়।

ভোরের একটু আগে শেষ হলো মুশায়রা।

সৈয়দ নাসিরউদ্দিন ফ্যাহমি চলে গেলেন। রয়ে গেছেন শুধু গমখোয়ার আর শামিম জামানভি। বাংলাদেশের শেষ দুইজন উর্দু কবি। একদা উচ্ছল এক ফুলবাগানের নিঃসঙ্গ দুই গানের পাখি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত