ad

৬৫ হাজার বছরের ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রিসবেন জাদুঘরে

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ২০: ০৫
কুইনস্ট্রিটে ব্রিসবেন জাদুঘর। ছবি লেখকের সৌজন্যে
কুইনস্ট্রিটে ব্রিসবেন জাদুঘর। ছবি লেখকের সৌজন্যে

ইতিহাসের প্রতি আমার এক ধরনের টান আছে। ২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আগে প্রথমবার ঢাকায় এসেছিলাম। ব্যস্ত এই মহানগরীতে প্রথম যে জায়গা দেখতে গিয়েছিলাম সেটি ছিল জাতীয় জাদুঘর।

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ব্রিসবেন। আর এই শহরের প্রাণকেন্দ্র কুইন স্ট্রিট। এই রাস্তায় ১৯৩০ সালে উদ্বোধন হওয়া দুটি ঐতিহ্যবাহী ভবন এখনো সবার নজর কাড়ে। একটি হলো ট্রেজারি ভবন, অন্যটি ব্রিসবেন সিটি হল। স্থাপত্য, নকশা ও আভিজাত্যে ভবন দুটি আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। ব্রিসবেন সিটি হলে রয়েছে একটি দর্শনীয় ক্লক টাওয়ার। উচ্চতার কারণে এটি অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। এছাড়া ভবনের সামনে স্থাপিত ব্রিটিশ রাজা জর্জ চতুর্থের কালো পাথরের ভাস্কর্যও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আছে ধাতুতে তৈরি কয়েকটি ক্যাঙ্গারুও।

শিল্পীর তুলিতে ব্রিসবেন নগরের গোড়াপত্তন। ছবি লেখকের সৌজন্যে
শিল্পীর তুলিতে ব্রিসবেন নগরের গোড়াপত্তন। ছবি লেখকের সৌজন্যে

ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটি সবার জন্য উন্মুক্ত। যেকোনো দর্শনার্থী বিনা খরচে ভবনটি ঘুরে দেখতে পারেন। পরিদর্শন করতে পারেন চার তলায় স্থাপিত ব্রিসবেন জাদুঘর। সেখানে ঘুরে দেখার পাশাপাশি ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানারও সুযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢুঁ মেরেছিলাম ব্রিসবেন জাদুঘরে। কোনো টিকিট ছাড়াই লিফটে উঠে গেলাম জাদুঘরের দোতলায়। লিফট থেকে নেমে বাঁ পাশে চোখে পড়ল ব্যাগ রাখার অত্যাধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা। আপনার ব্যাগ বা বহন করা জিনিসপত্র অন্য কারও সাহায্য ছাড়াই নির্দিষ্ট কোড দিয়ে লকারে রাখতে পারবেন। পরে সেই কোড ব্যবহার করেই আবার সেগুলো নিয়ে নেওয়া যায়। শুধু মনে রাখতে হবে নম্বরটি। যারা সংখ্যা সহজে মনে রাখতে পারেন না, তারা নম্বরটি মোবাইলে টুকে রাখতে পারেন।

জাদুঘরে দর্শণার্থী। ছবি লেখকের সৌজন্যে
জাদুঘরে দর্শণার্থী। ছবি লেখকের সৌজন্যে

ব্যাগ রেখে জাদুঘরে ঢোকার সময় মূল দরজার সামনে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম। গলায় ঝোলানো ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে চওড়া হাসিতে দায়িত্বরত ব্যক্তি জানালেন, গ্যালারিতে আমি যত ইচ্ছা ছবি তুলতে পারি। তবে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বন্ধ রাখতে হবে। উজ্জ্বল আলোয় কিছু শিল্পকর্ম বা প্রদর্শনীর ক্ষতি হতে পারে বলে এখানে ফ্ল্যাশ ব্যবহার নিষিদ্ধ। জাদুঘরে ঢুকেই দেখা হলো মেজর জেনারেল স্যার থমাস ম্যাকডুগাল ব্রিসবেনের একটি প্রতিকৃতির সঙ্গে। সোনালি ফ্রেমের ভেতর থেকে তিনি যেন অভ্যর্থনা জানালেন। মনে হলো তিনি বলছেন, আমার শহরে স্বাগত।

শত বছরের ইতিহাসে ব্রিসবেন শহরটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই ব্রিটিশ নাগরিকের নাম। সেনা কর্মকর্তা থমাস ব্রিসবেন (১৭৭৩-১৮৬০) ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের গভর্নর। উদ্যমী, উদ্ভাবনী ও দক্ষ এই প্রশাসক নিউ সাউথ ওয়েলসের বাইরে অস্ট্রেলিয়ায় আধুনিক বসতি সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছিলেন। আর এই কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন আরেক ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা জন অক্সলি।

মেজর জেনারেল স্যার থমাস ম্যাকডুগাল ব্রিসবেন। ছবি লেখকের সৌজন্যে
মেজর জেনারেল স্যার থমাস ম্যাকডুগাল ব্রিসবেন। ছবি লেখকের সৌজন্যে

ব্রিটিশ এই লেফটেন্যান্টকে ব্রিসবেন দায়িত্ব দিয়েছিলেন নতুন একটি লোকালয় খুঁজে বের করতে। জন অক্সলি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আরেক লীলাভূমি মোরাটন উপকূলে একটি নদীর সন্ধান পান। নদীটির উজানে দুই তীরে ছিল বসবাসের উপযোগী ভূমি। আবহাওয়াও ছিল মনোরম। এই এলাকায় শত শত বছর ধরে বাস করে আসছিলেন অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা। জন অক্সলি সিডনিতে ফিরে গিয়ে নতুন একটি নদী ও লোকালয়ের কথা ব্রিটিশ প্রশাসনকে জানান। আর এই নদী ও লোকালয়ের নামকরণ স্যার থমাস ব্রিজবেনের নাম অনুসারে করতে তিনি প্রস্তাব করেন। পরে কার্যকর করেন ব্রিটিশ রাণী।

এরপর ১৮২৪ সালে এখানে বসতি স্থাপন শুরু হয়। নগরের বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠতে শুরু করে ১৯৩৪ সালে। বসবাসের জন্য শহরটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ১৮৩৯ সালে। স্যার থমাস ব্রিসবেনের মতোই জন অক্সলিকেও আজও মনে রেখেছে অস্ট্রেলিয়া। ব্রিসবেনে এক লোকালয়ের নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। এছাড়া স্কুলে বিভিন্ন কার্যক্রম ও খেলাধুলায় শিক্ষার্থীদের জন্য যেসব দল গঠন করা হয়, সেগুলোর একটির নাম অক্সলি। আমার ৮ বছরের সন্তান আয়রনসাইড স্টেট স্কুলে পড়ার সময় এই ‘অক্সলি’ দলের সদস্য ছিল।

জাদুঘরে দর্শণার্থীরা। ছবি লেখকের সৌজন্যে
জাদুঘরে দর্শণার্থীরা। ছবি লেখকের সৌজন্যে

জাদুঘরের প্রথম গ্যালারিতে থমাস ব্রিসবেন ছাড়াও আছে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও ঐতিহাসিক তথ্য সম্বলিত বোর্ড। এমন একটি বোর্ডে তুলে ধরা হয়েছে ব্রিসবেনে বসবাসরত মানুষের হাজার বছরের ইতিহাস। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, এই ভূখণ্ডে অন্তত ৬৫ হাজার বছর আগেও মানুষের বসবাস ছিল। এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন মানববসতির অঞ্চল। তবে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে ১৮২৪ সালে, এরপরই এই অঞ্চলে ইউরোপীয় বসতি স্থাপনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

এরপর চোখে পড়বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই শহরের অবদান ও অবস্থানের চিত্র। ১৯৪১ সালে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবার ও ফিলিপাইনের মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রবাহিনীর কাছে ব্রিসবেন শহরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ এই ব্রিসবেন শহর থেকেই পরিচালনা করেছিলেন। এছাড়া যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিক ও সেনা কর্মকর্তারা অবকাশ যাপনে এই শহরে আসতেন। এ কারণে এই শহরটি জাপানি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।

কুইনস্ট্রিটে ব্রিসবেন জাদুঘরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
কুইনস্ট্রিটে ব্রিসবেন জাদুঘরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

১৯৪৩ সালের মে মাসে জাপানি নৌবাহিনী ব্রিসবেনের কাছে অস্ট্রেলিয়ার একটি জাহাজে হামলা চালায়। এটি সামরিক জাহাজ ছিল না, বরং যুদ্ধাহতদের সেবার জন্য তৈরি হাসপাতাল জাহাজ। এতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৬৮ জন অস্ট্রেলিয়ান নারী-পুরুষ। তাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন চিকিৎসক ও নার্স। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের ছবি সাজানো আছে জাদুঘরের দেয়ালে।

এরপর জাদুঘরের মূল কক্ষ। এই অংশে প্রচুর ছবি। নগরের প্রথম ভবন, প্রথম গির্জা, প্রথম কোনো রেলওয়ে রোড ইত্যাদির প্রমাণ্য উপস্থাপন। এই ঘরেই মূলত দর্শনার্থীরা বেশি সময় পার করে থাকেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শহরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস। তবে এসবের মধ্যে ‘ব্রিসবেন: ১৮২৮-১৯২৮’ শিরোনামের ছবিতে আপনার দৃষ্টি আটকে যাবে। কারণ এই এক ছবিতেই উঠে এসেছে ব্রিসবেনের আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও নতুন নগরসভ্যতা সৃষ্টির ইতিহাস।

কুইনস্ট্রিটে ব্রিসবেন জাদুঘরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে
কুইনস্ট্রিটে ব্রিসবেন জাদুঘরে। ছবি লেখকের সৌজন্যে

এ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ আপনি চিন্তা করতে পারবেন সমৃদ্ধ এই শহরের বেড়ে ওঠা এবং অতীত ইতিহাস নিয়ে। জাদুঘরের এই অংশে ব্রিসবেন শহরের ওপর ১০০টি শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। এগুলো নিশ্চিতভাবেই যে কাউকে বিমোহিত করবে। নিয়ে যাবে হাজার বছর পেছনের এক সভ্যতায়।

এছাড়া মূল হলের পাশে রয়েছে আরও তিনটি গ্যালারি যেখানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। আমি যখন জাদুঘরে গিয়েছিলাম তখন ছিল ফুলের প্রদর্শনী। যার নাম ছিল ‘রিঅ্যারেঞ্জড: আর্ট অব দ্য ফ্লাওয়ার’। এই প্রদর্শনীতে ফুলের ছবি ও চিত্রকর্ম এতটাই জীবন্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, হঠাৎ করেই ফুলের সুবাস বা স্নিগ্ধতা আপনাকে ছুঁয়ে যাবে।

ব্রিসবেন শহরে গেলে, এই জাদুঘরে অবশ্যই একবার পা দেবেন। বিশ্বাস করুন আপনার সময়ের অপচয় হবে না। হাজার বছরের সভ্যতার সূতিকাগারে নিশ্চিতভাবেই আপনি চিন্তার খোরাক পাবেন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত