নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার সুরক্ষিত থাকতে হবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ২০: ২৪
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

বগুড়া থেকে চোখের চিকিৎসা করাতে রাজধানীতে এসেছিলেন স্কুলশিক্ষক রনজিনা পারভিন। ভোরবেলা রিকশায় করে যাওয়ার পথে ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দিলে রাস্তায় পড়ে মারা যান তিনি। ঘটনাটি ঘটে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায়। এর আগে একই ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রাণ গেছে সোহেলি ইসলাম ও মুক্তা আক্তার নামের দুই নারীর। ছয় মাসে তিন নারীর এমন করুণ মৃত্যু রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতির প্রমাণ।

গত ছয় মাসে ঢাকায় ছিনতাইয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। ছিনতাইজনিত প্রাণহানির চারটি ঘটনার তিনটিই নারীর। মোটরসাইকেল থেকে চলন্ত রিকশাযাত্রীর ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেওয়ার কৌশলটি নারীর জন্য মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা নারীদের কেউ কেউ বাস কিংবা ট্রেন থেকে নেমে রিকশায় করে যাওয়ার সময় এমন ঝুঁকিতে পড়ছেন। টার্মিনাল বা স্টেশন থেকে গন্তব্য পর্যন্ত পথটি বিশেষ বিশেষ সময়ে ছিনতাইয়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতা কেবল নারীর চলাচলের স্বাধীনতা সংকুচিত করছে না; সমাজে গভীর নিরাপত্তাহীনতার বোধও তৈরি করছে।

ছিনতাইয়ের ভৌগোলিক চিত্রটিও স্পষ্ট। মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, উত্তরা—এই এলাকাগুলো বারবার উঠে আসছে আলোচনায়। পুলিশ নিজেই তিন শতাধিক ছিনতাইপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করেছে। কিন্তু তালিকা দীর্ঘ হলেও কার্যকর প্রতিরোধ নেই। পরিচিত স্পটে পরিচিত কৌশলে বারবার একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, ছিনতাইকারীরা পুলিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। চেকপোস্ট আছে, টহল আছে; কিন্তু কার্যকারিতা নেই। মানুষ বলছে, অনেক চেকপোস্টে দায়িত্বরতরা মুঠোফোনে ব্যস্ত; সড়ক ছেড়ে সরে যাচ্ছেন। এই শৈথিল্যের সুযোগই কি নিচ্ছে অপরাধীরা?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো পুলিশের মামলা গ্রহণে অনীহা। ভুক্তভোগীরা থানায় গেলে মামলার বদলে জিডি নেওয়া হচ্ছে। অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেওয়া মুঠোফোন নথিভুক্ত হচ্ছে ‘হারানো মুঠোফোন’ হিসেবে। এভাবে নথিভুক্তি দুটি কারণে ক্ষতিকর। প্রথমত, ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, অপরাধের প্রকৃত চিত্র থাকছে আড়ালে। ফলে সমস্যার গভীরতা বোঝা ও সমাধান কঠিন হয়ে পড়ছে।

মানুষ এমনিতেই নাকাল বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে; আয় বাড়েনি। কর্মহীনতার সমস্যাও প্রকট। এ অবস্থায় রাস্তায় বের হলে ছিনতাই-রাহাজানির ভয় আবার আঁকড়ে ধরছে তাদের। এই নানামুখি চাপ শান্তিপ্রিয় মানুষের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরাও কাজে মন দিতে পারছেন না। তাদের ওপরও চাঁদাবাজির অত্যাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছিনতাইয়ের উৎপাত। গুলশান থেকে কাফরুল, যাত্রাবাড়ী থেকে উত্তরা—সন্ধ্যার পর সড়কে নামতে ভয় পাচ্ছেন করপোরেট হাউসের কর্মীরাও। এই নিরাপত্তা ও আস্থাহীনতার বোধ সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

সমাধানের পথ জটিল নয়। মূলত দরকার প্রশাসনের সদিচ্ছা। ছিনতাইপ্রবণ স্পটগুলোতে নিয়মিত ও কার্যকর টহল নিশ্চিত করতে হবে। চেকপোস্টগুলোতে দায়িত্বে অবহেলার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়সারা জিডি করানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি কড়া অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাইকারী চক্রগুলো ভেঙে দিতে হবে। তবে সতর্ক থাকতে হবে, যেন মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয়। আর নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। আইন ও বিধিবিধানের ভেতরে থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি আনা সম্ভব। সেটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

এদেশের মানুষ রাষ্ট্রের কাছে অনেক কিছু চায় না। তবে তারা অবশ্যই চায় নিরাপদে চলাচল, ব্যবসা পরিচালনা ও ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা। এটা যে কোনো সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত