রাঙ্গাবালীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, জলাবদ্ধতায় মুগডালচাষিদের মাথায় হাত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাঙ্গাবালী, পটুয়াখালী

রাঙ্গাবালীতে জলাবদ্ধতায় ডুবছে মুগডালখেত। সংগৃহীত ছবি

পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ-উপজেলা রাঙ্গাবালীতে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ফসলের জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। উপজেলার মৌডুবি ইউনিয়নের ভূঁইয়াকান্দা গ্রামে খৈয়ারখালে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণে পানিনিষ্কাশন হচ্ছে না।

সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার মৌডুবি ইউনিয়নের খৈয়ারখালে পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় এবং খালে বাঁধ দিয়ে অবৈধ পুকুর করায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কিছু জায়গায় হাঁটুপানি, আবার কিছু জায়গায় কোমরপানিতে তলিয়ে রয়েছে মুগডালখেত। অনেকেই আবার খেত থেকে মুগডাল তোলার চেষ্টা করছেন। জমিতে পানি থাকায় মুগডাল পচে গেছে।

উপজেলার মৌডুবি ইউনিয়নের ভূঁইয়াকান্দা গ্রামের শাজাহান পণ্ডিত এ বছর ৯ একর জমিতে মুগডাল চাষ করেন। প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই ফসলের সময় বৃষ্টিতে তলিয়ে যায়। ধান এবং মুগডাল চাষ করতে পারি না। এখানে খৈয়ারখাল আছে কিন্তু পানি যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এই খালের মুখে একটা কালভার্ট আছে, তা-ও বন্ধ করে রাখছে কিছু লোক। আমরা চাষিরা বন্ধ করা কালভার্ট খুলতে গেলে দখলদাররা তা খুলতে দেয় না।’

খৈয়ারখালে খালে গত ১৭ বছর ধরে এই সমস্যা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছর মেম্বার-চেয়ারম্যান আসে আর যায় কিন্তু তারা আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। সরকারের কাছে আমাদের দাবি এই খৈয়ারখালে একটি কালভার্ট বা স্লুইস করে দিলে হয়তো কৃষক বাঁচবে।'

একই এলাকার আরেক কৃষক হাজী ফোরকান বলেন, ‘আমার প্রায় ৭ একর জমির মুগডাল সব নষ্ট হয়ে গেছে। এই পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করলে আমরা মরে যাব। আমাদের এখন কী উপায় হবে, তা সরকার জানে।’

জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া মুগডালখেত। স্ট্রিম ছবি
জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া মুগডালখেত। স্ট্রিম ছবি

শুধু মৌডুবি না, একই চিত্র উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের ফুলখালী, ভূঁইয়ারহাওলা, রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের আমিলীবাড়িয়া গ্রামে। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এই জলাবদ্ধতা অন্যতম কারণ অবৈধ বাঁধ দেওয়া এবং খালে কোনো কালভার্ট না থাকা। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কৃষক বাঁচাতে হলে খাল খনন এবং অবৈধ বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নিতে হবে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, রাঙ্গাবালী উপজেলায় এ বছর ২ হাজার ২০ হেক্টরে জমিতে মুগডাল আবাদ হয়েছে। বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২২ কোটি টাকা। তবে বৃষ্টির কারণে প্রায় সাড়ে ৪ শ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, চলমান বৃষ্টিতে ফসলের খেতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে মুগডালে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সাড়ে চার শ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যদি স্লুইস বা কালভার্ট দেওয়া হয়, তাহলে কৃষকদের ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।

তিনি আরও বলেন, রাঙ্গাবালী উপজেলায় ছোট-বড় ২৮টি স্লুইসগেট রয়েছে, যার অধিকাংশই অকার্যকর। তাতে কোথায় যদি জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, পানিনিষ্কাশন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু কিছু মাঠ আছে, যে মাঠের সাথে কোন ধরনের স্লুইসগেট নেই। সেখান থেকে পানি নিষ্কাশন সম্ভব হয় না। এসব জায়গায় যদি স্লুইসগেট স্থাপন করা যায় এবং যে স্লুইসগেট অকার্যকর, সেগুলো যদি সংস্কার করা হয়—তাহলে এই জলাবদ্ধতা নিরসন হওয়া সম্ভব। এ ছাড়া কিছু কিছু খালে স্থানীয়রা বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করেন। এতে যে পানির যে স্বাভাবিক প্রবাহ সেটি ব্যাহত হয়। এর ফলে কৃষকরা যেমন সেচ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অন্যদিকে অতি বৃষ্টিতে সেই পানিনিষ্কাশন সম্ভব হয় না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) খায়রুল হাসান বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন খেতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। যদি স্লুইসগেটের অব্যবস্থাপনার কারণে হয়ে থাকে, তাহলে পানি উন্নয়নের বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি খালে যদি অবৈধভাবে কেউ বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করে, তাহলে সেই বাঁধ কেটে দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু অবৈধ বাঁধ কাটা অভিযান শুরু করেছি। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

সম্পর্কিত