সরকারের ৬ মাস/আইনশৃঙ্খলায় হযবরল কাটেনি, বেড়েছে হত্যা-নিপীড়ন-পুলিশের ওপর হামলা

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ৩০
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

গণঅভ্যুত্থানের পর কার্যত ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা নির্বাচিত সরকারের সময়েও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। উল্টো বিএনপি সরকারের শুরুর ছয় মাসে হত্যা, নারী-শিশু নির্যাতন, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবনতির তথ্য উঠে এসেছে পুলিশ প্রতিবেদনে। বেড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাও।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধবিষয়ক রেকর্ড বিশ্লেষণে এসব তথ্য জানা গেছে। এই ১১ মাসের মধ্যে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে ছিল অন্তবর্তীকালীন সরকার। সংসদ নির্বাচনে জয় পাওয়া বিএনপি সরকার গঠন করে ১৭ ফেব্রুয়ারি।

পুলিশ প্রতিবেদনে শুধু মাসিক হিসাব থাকায় মামলার দৈনিক গড় ধরে দুই সরকারের ১৬৫ দিনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছে স্ট্রিম।

পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬ মাসে দেশে হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭০৯টি, অর্থাৎ দিনে গড়ে ৯টি। সেই হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ১৬৫ দিনে এমন মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫৬৬টি।

ওই ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৩৬৭টি। দৈনিক ৫২টি হিসাবে ১৬৫ দিনে ৮ হাজার ৫৪৬টি। এই সময়ে দিনে অপহরণের মামলা হয়েছে প্রায় তিনটি; ১৬৫ দিনে ৪৯২টি। আর অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ ১৬৫ দিনে গড়ে ২৭টি হিসাবে চুরির মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৪৫৫টি।

পুলিশের ওপর হামলার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬৬টি পুলিশ অ্যাসল্টের মামলা হয়েছে। সেই হিসাবে গড়ে দিনে একবারের বেশি আক্রান্ত হয়েছে পুলিশ।

দুই সরকারের ১৬৫ দিনে তুলনামূলক বিশ্লেষণে, হত্যা মামলা দিনে ৯টি থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ১০টি। নারী-শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে এমন মামলার সংখ্যা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি– দিনে ১০টি। পুলিশ অ্যাসল্টের মামলাও দিনে একটি থেকে বেড়ে প্রায় দুটি হয়েছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির দাবি করা হচ্ছে। তবে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে হত্যা, নারী-শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলাসহ বড় অপরাধে মামলা বেড়েছে। কমেছে শুধু অপহরণ ও চুরির মামলা।

মামলার সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত খুনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৮৯টি। দিনে গড়ে প্রায় ১০টি ধরে বিএনপি সরকারের ১৬৫ দিনে খুনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬৫০টি। নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় এই সময়ে গড়ে দিনে মামলা হয়েছে ৬২টি; ১৬৫ দিনে ১০ হাজার ৪৪টি।

গত ছয় মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩১৭টি পুলিশ অ্যাসল্টের মামলা হয়েছে। ১৬৫ দিনের হিসাবে ২৯০টি।

গত ছয় মাসে অপহরণের মামলা সামান্য কমে হয়েছে ৫১২টি। আর গড় হিসেবে চুরির মামলা কমে হয়েছে ৪ হাজার ৪০৭টি।

সবমিলে দুই সরকারের ১৬৫ দিনে তুলনামূলক বিশ্লেষণে, হত্যা মামলা দিনে ৯টি থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ১০টি। নারী-শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে এমন মামলার সংখ্যা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি– দিনে ১০টি। পুলিশ অ্যাসল্টের মামলাও দিনে একটি থেকে বেড়ে প্রায় দুটি হয়েছে।

মব ও গণপিটুনিতে মৃত্যু বেড়েছে

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অন্যতম সমালোচিত ছিল মব ও আইন নিজের হাতের তুলে নেওয়া। তবে পুলিশের প্রতিবেদনে মবের ঘটনার কোনো রেকর্ড থাকে না। সাধারণত নির্দিষ্ট অপরাধ ধরে এসব ক্ষেত্রে মামলা হয়।

বর্তমান সরকার মব নিয়ন্ত্রণের দাবি করলেও মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সংস্থাটির তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে সন্দেহ থেকে গণপিটুনি ও মব করে ১৩৪ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে এর আগের ৬ মাসে এ ধরনের হত্যার শিকার হয়েছিলেন ১০৯ জন।

শঙ্কা বাড়াচ্ছে লুটের অস্ত্র, বোমা উদ্ধারের ঘটনা

প্রথাগত অপরাধ বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। গণঅভ্যুত্থানের দিন থানা থেকে লুট হওয়া অনেক অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। সেগুলো অপরাধীদের হাতে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সময়ে জেল পালানো কিছু দাগি আসামি এখনও অধরা।

এ ছাড়া সম্প্রতি রাজধানীর একাধিক স্থানে বোমা ও বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য নিয়ে পরিকল্পিত হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দ্বন্দ্ব ও অন্তর্কোন্দলে গত ছয় মাসে অন্তত ৪০০ সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ৭৭ জন নিহতের পাশাপাশি আহত হয়েছে অন্তত ২৯৭৪ জন।

পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

সার্বিক বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন স্ট্রিমকে জানান, তুলনামূলক বিশ্লেষণে সবশেষ ৬ মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যদিও এর পেছনে কিছু বিষয় কাজ করেছে। এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অন্যতম। নির্বাচনের আগে-পরে অপরাধমূলক অনেক কর্মকাণ্ড হয়। এ ছাড়া বৈশ্বিক প্রবণতা হচ্ছে, শীতের থেকে গরমকালে বেশি অপরাধ হয়।

তার দাবি, সম্প্রতি অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) সহজ করা হয়েছে। এতে অপরাধ রেকর্ডের হার বেড়েছে। পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। এতেও অনেকে ভয় ছাড়া থানায় গিয়ে মামলা বা অভিযোগ করতে পারছেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, মামলার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে দেশের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ, হয়রানি ও হুমকি-ধমকির কারণে অনেকে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মব, নারী-শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনায় পুলিশের কাছে যান না। এতে অপরাধের সার্বিক চিত্র পাওয়া যায় না।

তবে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়নে মামলার পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ। এটি দিয়ে অনুমান করা যায় কোন অপরাধ বেশি ঘটছে আর কোনটি কম হচ্ছে।

পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

পুলিশের পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বললেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দাবি, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।

গত ১৭ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিন পূর্তিতে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সন্তুষ্টির বিষয়টি দেশের জনগণই মূল্যায়ন করবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি সাধিত হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী এটি আরও সুসংহত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।

রাজধানীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলায় ২৯ কার্যদিবসে রায়ের কথা উল্লেখ করে নারী-শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি করেন তিনি।

এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি মোজাফফর হোসেনকে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার, আলোচিত তনু হত্যা মামলায় আসামি গ্রেপ্তার, শরিফ ওসমান হাদী হত্যায় ভারতে গ্রেপ্তার আসামিদের এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাইতে গ্রেপ্তার ও দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও বলেন মন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের মতো অপরাধী ও ভূমিদস্যুদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ সংস্কার ও পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েই গেছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে স্ট্রিমকে জানান, গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও দায়িত্বশীল আচরণে যে ঘাটতি ছিল তা এখনও কিছু ক্ষেত্রে রয়ে গেছে। অভ্যুত্থানের পর নাগরিকদের আইন না মানার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল সেটিও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।

নারী-শিশু নির্যাতন নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশে এই ধরনের নির্যাতনের ঘটনা পরিসংখ্যানগতভাবে মাঝে মধ্যে কম দেখা গেলেও বাস্তবে এটি সবসময়ই বেশি থাকে। এখানে শুধু আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রেই বিচার কিংবা আইনগত ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত নারী-শিশু নির্যাতনের সব ঘটনা সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এটি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।

পুলিশ ওপর হামলা, আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা নিয়ে এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, ৫ আগস্টের আগে পুলিশ সাধারণ মানুষের চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করেছিল। পরবর্তীতে পেশাদারিত্ব ধরে রেখে যে কাজগুলো করা দরকার, সেগুলোও তারা অনেকক্ষেত্রে করতে পারেনি। সবকিছু মিলে পুলিশ বাহিনী এখনও ভঙ্গুর। এই সুযোগে অপরাধী এবং বিভিন্ন কারণে তাদের ওপর ক্ষুব্ধরা পুলিশের ওপর মারমুখী হচ্ছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

আইনশৃঙ্খলায় হযবরল কাটেনি, বেড়েছে হত্যা-নিপীড়ন-পুলিশের ওপর হামলা