‘সেদিন আমাদের ডাক পড়েছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সালাম জানানোর’— প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে মুজিবনগর সরকারের শপথ

তোজাম্মেল আযম
তোজাম্মেল আযম
মুজিবনগর থেকে ফিরে

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০: ০২
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তত পাঁচ শতাধিক মানুষ স্মৃতি কমপ্লেক্সটিকে ভাঙচুর চালায়। স্ট্রিম ছবি

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (পরিবর্তিত নাম মুজিবনগর) শুধু একটি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়নি; সেখানে জন্ম নিয়েছিল এক ইতিহাসও।

সকালের রোদ তখন নরম। আমগাছের ছায়া মাটিতে ছোপ ছোপ আলো ফেলেছে। ১৩ এপ্রিল মুজিবনগর আম্রকাননে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ১৯৭১-এর সেই দিনটিতে এই মাটিই ছিল উত্তাল ইতিহাসের কেন্দ্র।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার। ১৭ এপ্রিল সেই সরকার শপথগ্রহণ করে। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে বিলুপ্তি হয় মুজিবনগর সরকারের।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের ঐতিহাসিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বৈদ্যনাথতলা গ্রামের সাধারণ মানুষ সরাসরি অংশ না নিলেও, তাদের সহযোগিতা ছাড়া এই সরকার গঠন এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল হতে পারত না।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য সব ধরনের সহায়তা করেছিল গ্রামবাসীরা। যেমন মঞ্চ নির্মাণ, অতিথিদের জন্য খাবার ও পানীয় সরবরাহ, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

সূর্য সেদিন ছিল নির্মম। বৈশাখের খরতাপ যেন মাটিকেও দগ্ধ করছিল। কিন্তু সেই তাপদাহ উপেক্ষা করে মেহেরপুরের ১২ জন আনসার সদস্য সেদিন সাধারণ পোশাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানিয়েছিলেন নবগঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে।

মুজিবনগর সংগ্রাম কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আইয়ুব হোসেন। স্ট্রিম ছবি
মুজিবনগর সংগ্রাম কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আইয়ুব হোসেন। স্ট্রিম ছবি

দেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুজিবনগর সংগ্রাম কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘১৬ এপ্রিল আমাদের জাতীয় নেতারাসহ ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা মুজিবনগরে এসে স্থান নির্ধারণ করে যান। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা ও সফল করার দায়িত্ব ছিল বিএসএফের ওপর। ১৭ এপ্রিল কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের একত্রিত করে বিশাল গাড়িবহর নিয়ে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সবাই মুজিবনগরে হাজির হয়েছিলেন।’

সেদিন মুজিবনগর সরকারের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দোয়াজ আলী। স্ট্রিম ছবি
দোয়াজ আলী। স্ট্রিম ছবি

সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দোয়াজ আলী বয়সের ভারে হাঁপিয়ে উঠেছেন। স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘সেদিন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার, নদীয়ার জেলা প্রশাসক শ্রী ডি সি মুখার্জি এবং বিএসএফের ৭৬ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচ আর চক্রবর্তী দুজনে সাদা পোশাক পরে আসেন। আমি সংগ্রাম কমিটির সভাপতি জেনে আমবাগানের একটি স্থানকে চিহ্নিত করে একটি তোরণসহ মঞ্চের চতুর্দিক বাঁশ দিয়ে ঘেরার নির্দেশ দিয়ে ফিরে গেলেন। তখনও জানি না তারা এখানে কীসের অনুষ্ঠান করবে।’

নির্দেশমতো এলাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে চৌকি, কাপড়, দড়ি, ঝাড় থেকে বাঁশ এবং দেবদারুর পাতা এনে স্থানীয়দের সহায়তায় তোরণ ও মঞ্চ তৈরি করেন দোয়াজ আলী। সারারাত ধরে এই কাজ করেন তারা। খুব সকালে ভারতীয় হেলিকপ্টার আকাশে মহড়া দিতে শুরু করেন। এরপরপরই মুজিবনগর সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে অসংখ্য জিপ ও ট্রাক ঢুকতে শুরু করে।

দোয়াজ আলী বলেন, ‘এই সমস্ত গাড়ি করে আমাদের জাতীয় নেতারাসহ বিদেশি সাংবাদিক ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা আসেন। বিএসএফ পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। অনুষ্ঠানের জন্য চেয়ার, মাইক, টেবিল সবই আসে ভারত থেকে। এমনকি অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সাধারণ জনতাকে যে মিষ্টি ও পাউরুটি দেওয়া হয়েছিল সেটাও এসেছিল ভারত থেকে।’

এরপর বাজানো হয় জাতীয় সঙ্গীত—‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।

অধ্যাপক বাকের আলী। স্ট্রিম ছবি
অধ্যাপক বাকের আলী। স্ট্রিম ছবি

মুজিবনগরের দারিয়াপুর ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক বাকের আলী সেই শপথ অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেছিলেন। তিনি জানান, সেদিন খুব সকালে জাতীয় নেতৃবৃন্দ মুজিবনগরে উপস্থিত হন। তিনি তাদের চিনতেন না। স্থানীয় নেতারা তাঁকে জাতীয় নেতাদের সামনে নিয়ে যায়। তখন তাঁকে অনুষ্ঠানে কোরআন তেলাওয়াতের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ তাঁর নাম লিখে নিলেন এবং রিহার্সালের সময় তেলাওয়াত শুনলেন। মাত্র ৩০ মিনিট অনুষ্ঠানটির স্থায়িত্ব থাকলেও উপস্থিত সকলের মধ্যে ছিল স্বাধীনতার উন্মাদনা ও জীবনবাজির শপথ।

মো. সিরাজ উদ্দীন। স্ট্রিম ছবি
মো. সিরাজ উদ্দীন। স্ট্রিম ছবি

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে সামরিক কায়দায় সালাম দিয়েছিলেন মেহেরপুরের ১২জন আনসার সদস্য। ইতোমধ্যে ১০ জন মারা গেছে। বেঁচে আছেন দুইজন। তাঁদেরই একজন বয়োবৃদ্ধ মো. সিরাজ উদ্দীন। প্রায় প্রতিদিন তিনি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে আসেন। তিনি বলেন, ‘সেদিন আমাদের ডাক পড়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সালাম জানানোর। আমরা গার্ড অব অনার দিয়েছিলাম ১২ জন আনসার। ওইদিনই ট্রেনিং দিয়েছিলেন তৎকালীন ঝিনাইদহের সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) মাহবুব উদ্দীন। তাঁর নেতৃত্বেই আমরা গার্ড অব অনার দিই সরকারকে।’

আজিম উদ্দীন। স্ট্রিম ছবি
আজিম উদ্দীন। স্ট্রিম ছবি

অন্য আনসার সদস্য আজিম উদ্দীন বলেন, ‘তখন আনন্দ, ভয় ও উত্তেজনা কাজ করছিল। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকসহ হাজারো মানুষের সামনে প্রথম সরকারকে সালাম জানানোর সময় মনে যে প্রশান্তি পেয়েছিলাম, তা বলে বোঝানো যাবে না। পরে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।’

সুভাষ মল্লিক। স্ট্রিম ছবি
সুভাষ মল্লিক। স্ট্রিম ছবি

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী সুভাষ মল্লিক বলেন, ‘ওদের হাতে আধুনিক অস্ত্র ছিল না, কিন্তু যে ভঙ্গিতে সালাম দিল, মনে হচ্ছিল এটাই স্বাধীন দেশের প্রথম সেনাবাহিনী।’

আহম্মদ খাঁ। স্ট্রিম ছবি
আহম্মদ খাঁ। স্ট্রিম ছবি

মুজিবনগর স্মৃতি প্রকল্প এলাকায় দেখা হয় প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষদর্শী আহম্মদ খাঁর সঙ্গে। সত্তরোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ রিকশা ভ্যানে করে শসা ফেরি করছেন। তিনি বলেন, ‘সে বছরই আমার বিয়ে হয়। ১৭ এপ্রিল শপথ অনুষ্ঠানের দিন হঠাৎ করেই অনেক মানুষ জড়ো হলো মুজিবনগরের এই আমবাগানে। তখন বাগানটি ভাগাড় হিসেবে গ্রামের মানুষ ব্যবহার করত। সেদিন আমিসহ একদল তরুণ বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুড়ি সংগ্রহ করে মানুষকে খেতে দিই। আশপাশের বাড়ি থেকে বউঝিরা পানি এনে মানুষের পিপাসা মেটায়। সেদিন সেই সরকারের পরিচালনায় দেশ স্বাধীন হয়।’

রোকসানা বেগম। স্ট্রিম ছবি
রোকসানা বেগম। স্ট্রিম ছবি

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের পাশ বাস করেন রোকসানা বেগম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই বৃদ্ধা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তখন আমি গৃহবধূ এই বাড়ির। বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে দরকার ছিল পানি। গ্রামের কিশোর-কিশোরিরা কলস কাঁখে নিয়ে কূপ থেকে পানি এনে দিচ্ছিল। আমরা আগে নিজেরা খাইনি, আগে তাদের পানি দিয়েছি। ওরা যখন আমাদের দেওয়া মুড়ি, রুটি আর পানি খাচ্ছিল, দেখে মনে হচ্ছিল, নিজের সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি।’

রফিকুল ইসলাম। স্ট্রিম ছবি
রফিকুল ইসলাম। স্ট্রিম ছবি

সেদিনের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন চারপাশে ছড়িয়ে ছিল গ্রামের তরুণরা। কেউ গাছে উঠে, কেউ দূরের পথের দিকে তাকিয়ে ছিল যদি পাকিস্তানি বাহিনীর কোনো নড়াচড়া দেখা যায়। একটি সংকেত ঠিক করা ছিল, কিছু হলে দ্রুত খবর পৌঁছে যাবে।’

ভবেরপাড়া গ্রামের প্রবীণ সুভাষ মল্লিক, বয়স এখন আশির কোঠায়। ১৯৭১ সালে ভবেরপাড়া মিশনের ফাদার ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তখন বুঝিনি এত বড় কিছু হতে যাচ্ছে। শুধু জানতাম, কিছু বড় মানুষ আসবে, দেশ বাঁচানোর কথা বলবে। পরে গ্রামের অনেকেই সরাসরি যুক্ত হন মুক্তিযুদ্ধে। কেউ আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ খাবার দিয়েছেন।’

ঐতিহাসিক এই স্থানটিকে সংরক্ষণ করে রাখতে ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের। পরে ১৯৯৬ সালে ওই স্থানে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স স্থাপন করে তৎকালীন সরকার। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তত পাঁচ শতাধিক মানুষ স্মৃতি কমপ্লেক্সটিকে ভাঙচুর চালায়।

মাহবুবুল হক মন্টু । স্ট্রিম ছবি
মাহবুবুল হক মন্টু । স্ট্রিম ছবি

এব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাহবুবুল হক মন্টু বলেন, ‘৫ আগস্ট পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি পক্ষ এখানকার ভাস্কর্যগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিমাসের একটি শুক্রবার আমি আমার সন্তানকে নিয়ে মুজিবনগর আসি। ছেলেকে দেখিয়ে বলতাম, এখানে তোমার দাদুদের গল্প দাঁড়িয়ে আছে। এখন আমি তাকে কী দেখাব?’

আজকের মুজিবনগর শান্ত। কিন্তু সেই ১২ আনসারের সালাম, ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মৃদু উচ্চারণ, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, তৃষ্ণার্ত মানুষের হাতে তুলে দেওয়া এক কলস পানি— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য ইতিহাস।

সম্পর্কিত