জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

একাত্তরের ‘বন্দুক হাতে এক লাজুক তরুণী’ শিরিন বানু মিতিলের স্মৃতি সংরক্ষণ না হওয়ায় ক্ষোভ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
পাবনা

বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল। স্ট্রিম কোলাজ

হাতে রাইফেল। চোখে-মুখে দেশকে হানাদার মুক্ত করার অদম্য তেজ। পরনে ছেলেদের শার্ট-প্যান্ট, মাথায় ছোট করে ছাঁটা চুল। প্রথম দেখায় উপায় নেই তিনি নারী, না পুরুষ। এভাবেই ছদ্মবেশে একাত্তরের রণাঙ্গনে শত্রুসেনাদের বুক কাঁপিয়ে ছিলেন পাবনার সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল।

ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান মুক্তিযুদ্ধের সময় শিরিন বানুকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল ‘এ শাই গার্ল উইথ এ গান’ (বন্দুক হাতে এক লাজুক তরুণী)। আকাশবাণী বেতার থেকে প্রখ্যাত ভাষ্যকার দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগঘন কণ্ঠ সারা বিশ্বে পৌঁছে দিয়েছিল মিতিলের বীরত্বগাঁথা। তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আজ অনেকটাই বিস্মৃত এই ‘বীরকন্যা’।

এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত ১০ খণ্ডের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ’, পাবনার বীর মুক্তিযোদ্ধা রবিউল ইসলাম রবির ‘পাবনা ১৯৭১’ ছাড়াও পাবনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি গ্রন্থ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণায় তাঁর গৌরবগাঁথা উচ্চারিত হয়েছে বারবার। এরপরও তাঁর স্মৃতি ধরে রাখার উদ্যোগ নেই নিজ জেলা ও ছাত্ররাজনীতির বিচরণ ক্ষেত্র এডওয়ার্ড কলেজে। এ নিয়ে হতাশ ক্ষুব্ধ তাঁর সহযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষকেরা।

পাবনার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৫০ সালে ২ সেপ্টেম্বর পাবনা শহরের নানাবাড়িতে জন্ম নেন শিরিন বানু মিতিল। বামপন্থি রাজনীতিক বাবা-মায়ের আদর্শ তাঁকেও প্রভাবিত করেছিল। তাঁর মা সেলিনা বানু ছিলেন পাবনা জেলার ন্যাপের সভাপতি এবং পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। বাবা খন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ছিলেন পাবনা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত। পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে পড়াকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) পাবনা শাখার সভাপতিও নির্বাচিত হন মিতিল। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আদর্শ বুকে নিয়ে একাত্তরে অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে।

প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা জসীম উদ্দিন মণ্ডল (মাঝে) ও সহযোদ্ধা রবিউল ইসলাম রবি সঙ্গে মিতিল। সংগৃহীত ছবি
প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা জসীম উদ্দিন মণ্ডল (মাঝে) ও সহযোদ্ধা রবিউল ইসলাম রবি সঙ্গে মিতিল। সংগৃহীত ছবি

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মিতিলের দুই ফুফাতো ভাই জিন্দান ও জিঞ্জির যুদ্ধের ময়দানে রওনা হন। ২১ বছরের তরুণী মিতিলও তখন ঘরে বসে থাকেননি। তিনি ফুফাতো ভাইদের পোশাক পরে, শার্ট-প্যান্ট পরে পুরুষ সেজে যুদ্ধে অংশ নেন। একাত্তরের ২৮-২৯ মার্চে পাবনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩৬ জন হানাদার পাক সেনা নিহত হয়েছিল। সেই রণক্ষেত্রে পুরুষের বেশে লড়াই করা মিতিলকে দেখে তখন সহযোদ্ধারা বুঝতেই পারেনি, এই রোগা পাতলা এই তরুণ আসলে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের তুখোড় ছাত্রনেত্রী শিরিন বানু।

২০১৬ সালে এক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিরিন বানু মিতিল বলেছিলেন, ‘নারী হিসেবে সে সময়কার সমাজে সম্মুখযুদ্ধে যাওয়া ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার। কিন্তু আমি তো ছাড়বার পাত্র নই। শেষে আমার সহযোদ্ধাদের রাজি করায়ে পুরুষের পোশাক পরে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পোশাক পরার পর সবাই আশ্বস্ত হলো, আমাকে চেনা যায় না।’

শিরিন বানু মিতিলের একাত্তরের সহযোদ্ধা সাংবাদিক রবিউল ইসলাম রবি বলেন, ‘২৭ মার্চ পাবনা পুলিশ লাইনের যুদ্ধে মিতিল পুরুষের বেশে অংশ নেন। হালকা পাতলা গড়ন, আর মাথায় ছোট চুলের কারণে তাকে মেয়ে হিসেবে চেনা যায়নি। পরদিন পাবনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়, যাতে মিতিলই ছিলেন একমাত্র নারী যোদ্ধা। এই যুদ্ধে ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন।’

‘পাবনা ১৯৭১’ বইয়ের লেখক রবিউল ইসলাম রবি জানান, ৩১ মার্চ পাবনার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে একটি কন্ট্রোল রুম বসানো হয়। পরে ৯ এপ্রিল পাবনার নগরবাড়ী ঘাটের কাছে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এ সময় কন্ট্রোল রুমের পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয় মিতিলকে। এ ছাড়া নগরবাড়ী ঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে যুদ্ধ করেন মিতিল। পরে আকাশপথে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের মুখে পাবনাসহ কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।

দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় মিতিলকে নিয়ে প্রতিবেদন সম্পর্কে সাংবাদিক রবিউল ইসলাম রবি জানান, হানাদার বাহিনীর আক্রমণ তীব্র হলে বামপন্থি নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশার সঙ্গে মিতিল কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যান। পথে ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাদের। কিছুদিন পর ভারতের দ্যা স্টেটসম্যান পত্রিকায় মিতিলের ছবিসহ প্রতিবেদন ছাপা হলে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তখন সারা বিশ্বে মিতিলের নাম ছড়িয়ে পড়লেও এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা তার নাম।

ভারতের প্রখ্যাত দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান গত বছর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবসে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্ট দেয় এক্স হ্যান্ডেলে। সংগৃহীত ছবি
ভারতের প্রখ্যাত দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান গত বছর বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবসে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্ট দেয় এক্স হ্যান্ডেলে। সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ নবম খণ্ডের তথ্যে জানা যায়, দেশে ছাড়ার পর শিরিন বানু মিতিল তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের পশ্চিমবঙ্গে বাসায় ছিলেন কিছুদিন। প্রথমে বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে ঘুরে ঘুরে মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দল গঠন শুরু করেন। এ রকম মোট ৩৬ জন নারী নিয়ে ভারতের গোবরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এক পর্যায়ে এই সদস্য সংখ্যা ২৪০ ছাড়িয়ে যায়। অস্ত্রের অভাব থাকায় নারীদের সবার হাতে অস্ত্র সরবরাহ করা সম্ভব ছিল না। তাই প্রথম দলের একটি অংশ আগরতলায় যায় মেডিক্যাল কোরের সদস্য হিসেবে। বাকিরা বিভিন্ন এলাকায় ভাগ হয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কলকাতায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য, কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন শিরিন বানু মিতিল।

১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর নানাবাড়ি পাবনা শহরের দিলালপুর মহল্লার খান বাহাদুর লজ-এ জন্ম শিরিন বানু মিতিল। তাঁর বিয়ে হয় কুমিল্লায়। তাঁর দুই মেয়ে ও ১ ছেলে। বড় মেয়ে তাসনিম ও ছেলে তাহসিন বেসরকারি সংস্থার চাকরিজীবী। ছোট মেয়ে তন্বী জার্মান প্রবাসী। স্বাধীনতার পর মিতিল ‘প্রিপ ট্রাস্ট’ নামের বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের (এনজিও) পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ তিনি ঢাকায় মারা যান। রণাঙ্গনের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা এখন অনেকটাই বিস্মৃতপ্রায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অজুহাতে দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হয়েছিল তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা।

শিরিন বানু মিতিলের সহযোদ্ধা সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মুক্তিযোদ্ধা সুলতান আহমেদ বুড়ো বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর এই অসামান্য মুক্তিযোদ্ধাকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হয়েছিল তার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। জীবিত থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থগিত করে রাখা হয়েছিল তাঁর নাম। এখন তো আর কেউ স্মরণও করে না। অথচ তার বীরত্বগাঁথা পাঠ্যপুস্তকে স্থান পাওয়ার দাবি রাখে।’

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম বলেন, ‘পাবনায় অনেক মুক্তিযোদ্ধার নামে প্রতিষ্ঠান, স্মৃতিকেন্দ্র করা হয়েছে। কিন্তু শিরিন বানু মিতিলের স্মৃতি রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লিখিত ইতিহাসেও তার অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। নতুন প্রজন্মের কাছে তার স্মৃতি ধরে রাখতে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে তাঁর নামে হল ও স্মৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানাই।’

মিতিলের মামাতো ভাই অ্যাডভোকেট তসলিম হাসাম সুমন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে যে সাহসিকতা মিতিল দেখিয়েছেন, তার যোগ্য মূল্যায়ন হয়নি। তিনি যে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। সেখানেও তার স্মৃতি ধরে রাখতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নতুন প্রজন্মকে তাঁর সাহসিকতার ইতিহাস জানানো উচিত ছিল। এ নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও কোনো প্রত্যাশা আর করি না।’

সম্পর্কিত