গ্রামীণ ব্যাংকের সুদহার বাণিজ্যিক ব্যাংকের সমান করতে হাইকোর্টের রুল

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ১৯: ৪৫
গ্রামীণ ব্যাংকের লোগো।

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ওই রিট আবেদনে ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বিবাদী করে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর ফাঁকিসহ একাধিক অভিযোগও উপস্থাপন করা হয়েছে।

আজ সোমবার (১৮ মে) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাসুদ আর. সোবহান ও ফাতেমা চৌধুরী।

আইনজীবী ফাতেমা চৌধুরী জানান, রিটটি গত সপ্তাহে করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির কারণে তাঁদের বক্তব্য শুনতে হয়েছে। শুনানি শেষে আদালত আজ আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আদালত আমাদের দুটি আবেদনের ওপর রুল দিয়েছেন। প্রথমত, গ্রামীণ ব্যাংকের সুদের হার অনেক বেশি; তাই এই হার কমিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে কেন সমন্বয় করা হবে না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না—রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশে কেউ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১০০ টাকা ঋণ নিয়ে ৩০০ টাকা পরিশোধ করলে তাঁকে ঋণ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক আইনে এমন কোনো সুবিধা নেই। ফলে ভূমিহীনরা যাঁরা ঋণ নেন, তাঁরা বছরের পর বছর কেবল পরিশোধই করতে থাকেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রেও যেন ওই সুবিধা দেওয়া হয়, রুলে সেটাও জানতে চাওয়া হয়েছে।’

মামলায় কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়া হয়নি জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘আবেদনে থাকলেও আমরা শুনানিতে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চাইনি। তাই আদালত কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেননি।’

রিটে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক ভূমিহীন ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রবর্তিত ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির আওতায় যে সুদের হার আরোপ করে, তা নির্ধারিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের তুলনায় অত্যন্ত বেশি ও শোষণমূলক। এই সুদের হার কমানোর জন্য এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

রিট আবেদনে মোট চারজনকে বিবাদী করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রিটকারী আইনজীবী মাসুদ আর. সোবহান তাঁর আবেদনে মূল সুদের হার ইস্যুর পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগের কথা তুলে ধরেছেন।

রিটে পদের মেয়াদ লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বলা হয়েছে, অধ্যাদেশ অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়াদ ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানকে প্রভাবিত করে ড. ইউনূস বেআইনিভাবে আরও পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পান। তিনি ৬৫ বছরের বেশি বয়সেও আরেক মেয়াদের জন্য নিয়োগ দাবি করেছিলেন। অর্থ মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করলে তিনি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ে হেরে যান। এরপর থেকে তিনি ‘পরামর্শক’ হিসেবে ব্যাংকটির নীতি নির্ধারণ করছেন বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া কর ফাঁকির চেষ্টা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে এই রিটে। সেখানে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের বিপুল মুনাফা দিয়ে ড. ইউনূস একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেন, যার ট্রাস্টিরা তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তিনি এই ফান্ডের অর্থের ওপর আয়কর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তা আদায় করতে বাধ্য করে। রিটে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে গ্রামীণ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত ৬৭৭ কোটি টাকা (৫৫ মিলিয়ন ডলার) আয়কর হঠাৎ করে ২০২৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেয়, যার কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না। এটি ড. ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন আর্থিক লাভের জন্য ক্ষমতার স্পষ্ট অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।

একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক কর্মচারীকে তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ এনে বলা হয়েছে, শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রম আদালতে মামলা করে জয়লাভ করে এবং পরবর্তীতে ব্যাংক তাঁদের পাওনা মেটাতে বাধ্য হয়। রিটকারী তাঁর আবেদনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে আরও জানান, উচ্চ সুদের কারণে ঋণগ্রহীতারা নিঃস্ব হওয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে ড. ইউনূসকে ‘রক্তচোষা’ বলতেন।

পিটিশনে দাবি করা হয়, ড. ইউনূসকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ফৌজদারি আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। জামিন পাওয়ার পর তিনি দেশত্যাগ করে প্যারিসে যান এবং ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দেশে ফিরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সম্পর্কিত