বিমানবন্দর থেকে তুলে নিয়ে ৬ মাস নির্যাতন: ট্রাইব্যুনালে গুমের অভিযোগ দিলেন সাবেক যুবদল নেতা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৫৫
ট্রাইব্যুনালে যুবদলের সাবেক নেতা মশিউর রহমান মামুন

রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে তুলে নিয়ে টানা ৬ মাস গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছেন বরগুনা যুবদলের সাবেক নেতা মশিউর রহমান মামুন। এই গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়ী করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (৬ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি গাড়িতে করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসেন মশিউর রহমান মামুন।

অভিযোগ জানাতে এসে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন মশিউর রহমান মামুন। দুপুর সাড়ে ১২টায় বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে গত ১ ফেব্রুয়ারিও একইভাবে ডিবির গাড়িতে করে প্রসিকিউশন কার্যালয়ে এসে চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে দুই ঘণ্টার একটি বৈঠক করেছিলেন সাবেক এই যুবদল নেতা।

নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরে মশিউর রহমান মামুন বলেন, ‘আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমি ছাত্রদলের রাজনীতি শুরু করি সেই ১৯৮৫ সাল থেকে। তারপরে আমি যুবদলের রাজনীতি করেছি, আমি আব্বাস ভাই, গয়েশ্বর দার কমিটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলাম। আমি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ভাই, ভুনু ভাই তাদের কমিটিতে ছিলাম। আমি ২০০১-এর বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন মনিটরিং সেলের মেম্বার ছিলাম। আমি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। আমরা নিয়মতান্ত্রিক, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে আমরা মাঠে ছিলাম। তো এই ফ্যাসিস্ট সরকার আন্দোলনকে দমন করার জন্য আমরা যারা সক্রিয়ভাবে রাস্তায় নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেছি, তাদের ধ্বংস করে দেওয়ার জন্যই আমাদের গুম করেছিল, হয়তো ক্রসফায়ার দেওয়ার জন্যও নিয়ে গিয়েছিল, কেন দেয়নি জানি না।’

সাংবাদিকদের কাছে নিজের গুম হওয়ার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন মশিউর রহমান। তিনি জানান, ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ব্যাংকক যাওয়ার পথে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর টানা ছয় মাস তাকে চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে একটি গোপন স্থানে আটকে রাখা হয়।

মশিউর বলেন, ‘গুম অবস্থায় আমাকে টানা ছয় মাস অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। আমি আগে প্রতিদিন পাঁচ মাইল দৌড়াতাম, খেলাধুলা করতাম। আর এখন আমি ঠিকমতো হাঁটতেও পারি না, অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি।’

টানা ৬ মাস গুম রাখার পর ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট তাকে ডিবি হেফাজতে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান মশিউর। এরপর তাকে আদালতে উপস্থাপন করে রিমান্ড আবেদন করা হয়। দুই দফা রিমান্ড শেষে তাকে প্রায় দুই বছর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকতে হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

কাঠগড়ায় শেখ হাসিনা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনরা

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণেই তাঁকে গুম করা হয়েছিল দাবি করে মশিউর রহমান বলেন, ছাত্রদল থেকে শুরু করে তিনি দীর্ঘদিন বিএনপি ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যাদের নির্দেশে অন্যান্য গুম ও খুন হয়েছে, আমাকেও সেই নির্দেশেই গুম করা হয়েছে।’

তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তিনি অভিযুক্ত অন্যান্য কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘অনেকে ইতোমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, নাম প্রকাশ করলে অন্যরাও পালিয়ে যেতে পারে।’

গুম ও নির্যাতনের শিকার মশিউর রহমান মামুন বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনেই তাকে সেখানে থাকতে হচ্ছে। তার ওপর চালানো এই নির্যাতনের লোমহর্ষক বিবরণ ২০২৪ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মশিউর রহমান মামুন
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মশিউর রহমান মামুন

পূর্ব লন্ডনে বসবাসরত মশিউরের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গুম থাকা অবস্থায় তাকে কয়েকদিন চোখ বেঁধে রাখা হয়, হাত বেঁধে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা হয়, বারবার মারধর করা হয় এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ছয় মাস ধরে কোনো কথা না বলে তার সারা শরীরে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছিল। ওই সময় তার কেবলই মনে হতো, তার ছেলে-মেয়ে বা স্ত্রী কখনও জানতেও পারবে না যে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।

শারীরিক ও মানসিক এই নির্মম নির্যাতনের কারণে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ছাড়তে পারেননি। পরবর্তী সময়ে তাঁর স্ত্রী যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনে সফল হলে তিনি লন্ডনে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হন। মশিউরের ওপর চালানো নির্যাতনের মানসিক ও শারীরিক প্রভাবের বিবরণ যুক্তরাজ্যের স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ট্রাস্টের নথিতেও সংরক্ষিত আছে বলে বিবিসির ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। দীর্ঘ এক দশক পর দেশে ফিরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে সেই নির্মমতারই সুবিচার চেয়েছেন তিনি।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত